এখনো বেঁচে আছি, এটাই আমাদের সৌভাগ্য!

জাফর ইকবাল স্যার সপ্তাহ খানেক আগে আমাকে একটা পত্র (ই-মেইল) লিখেছেন। সেই মেইলে তিনি লিখেছেন

-আমিনুল, আমাদের সমস্যাটা এতোটাই প্রকট হয়ে গিয়েছে, আমার আজকাল মনে হচ্ছে- আমরা খুবই সৌভাগ্যবান এই অর্থে, আমাদের (আমার, উনার কিংবা আমাদের) মতো মানুষকে অন্তত প্রতি সপ্তাহে একজন করে মরতে হচ্ছে না!

আমি স্যারকে একটা ই-মেইল করেছিলাম, এর জবাবে স্যার এই কথা লিখেছেন। ওই মেইলে আমি লিখেছিলাম

-স্যার, আপনাকে যখন আঘাত করা হলো, আপনি যখন হাসপাতালে ছিলেন; আমি তখন একটা লেখা লিখেছিলাম। সেখানে আমি লিখেছিলাম- আমি যতটুকু স্যারকে চিনি; স্যার হয়ত হাসপাতাল থেকে বের হয়েই, যেই ছেলেটা তাকে হত্যা করতে চেয়েছে, তার সঙ্গে দেখা করতে চাইবেন, কথা বলতে চাইবেন। অবাক করা ব্যাপার, আপনি হাসপাতাল থেকে বের হয়ে সেই দিন’ই বলেছেন- আপনি সেই ছেলের সঙ্গে দেখা করতে চান।

আমি অবশ্য আরও অনেক কিছু লিখেছি। সব কিছু এই পরিসরে লেখা সম্ভব নয়। তো, ওই মেইলের জবাবে তিনি লিখেছেন

-আমি ওই ছেলের সঙ্গে সত্যিই দেখা করতে চাই। জানি না ছেলের সঙ্গে দেখা করতে হলে নিয়ম গুলো কি; তবে আমি সত্যিই দেখা করতে চাই। সেই সঙ্গে তিনি এও লিখেছেন- আমিনুল, সমাজে সমস্যাটা এতোটাই প্রবল হয়ে গিয়েছে, আমার-তোমার মতো মানুষরা যে এখনো বেঁচে আছি, এটাই আমাদের সৌভাগ্য!

আমি স্যার’কে এর উত্তর এখনও দেইনি। তবে সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্র এবং শিক্ষক হিসেবে আমার কিছুটা হলেও ধারণা আছে- কেন আমাদের এই সমস্যা।

আমাদের পাঠ্য বই, আমাদের পরিবার, আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র আমাদের শিক্ষা দেয়- জগতের সমুদয় কিছুতে আমাদের সেরা হতে হবে কিংবা আমরাই সেরা! তবে শ্রেষ্ঠ কিংবা সেরা হতে গিয়ে, কোন ভাবেই যে অন্যকে ছোট কর যাবে না, অন্যের ক্ষতি করা যাবে না, সেটা আমাদের শেখানো হয় না।

একটা উদাহরণ দেই। এইতো গত পরশু বাংলা নববর্ষ উদযাপন করেছি আমরা বিদেশের এই ছোট শহরে। অনেক বাংলাদেশি একত্র হয়েছিলাম নতুন বছর’টাকে বরণ করে নেয়ার জন্য।

একটা অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। আমি সময়মত অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে একদম পেছনের সারি’র একটা চেয়ারে গিয়ে বসলাম। তো, আমাকে অনেকেই এসে জিজ্ঞেস করেছে

-আপনি পেছনে বসে আছেন কেন, আপনি তো সামনে বসবেন। এটা কেমন দেখাচ্ছে!

আমি ভাবলাম, ব্যাপারটা কি! পেছনে বসা আর সামনে বসার মাঝে পার্থক্য কোথায়! এরপর মনে হলো, আমাদের সমাজে এই ধরনের অনুষ্ঠানে সামনে বসা মানেই হচ্ছে- আপনি একটা বিশাল কিছু, আপনার একটা অবস্থান আছে, সেটা প্রকাশ পাচ্ছে!

অথচ আমার পেছনে বসতে ভালো লাগে। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে সব সময় আমি পেছনের সারিতে বসতাম। পেছনে বসে সবাইকে সহজে দেখা যায়, এর মাঝে অন্য রকম একটা আনন্দ আছে।

আমি কোথায় বসব, সেটা তো একান্ত’ই আমার ইচ্ছে। আমার যেহেতু একটা সামাজিক অবস্থান আছে, কেন আমি সামনে বসছি না, সেটাও নিয়েও লোকজন কথা বলছে! অথচ এই দেশে, অর্থাৎ এস্তনিয়াতে আমি ওদের একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেই অনুষ্ঠানে ওদের প্রেসিডেন্টও এসছিল। তিনি এসে চুপচাপ একদম পেছনের দিকের একটা সিটে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করে আবার নিজে নিজেই চলে গেলেন।

আমি এই দৃশ্য দেখে ভাবলাম, কি চমৎকার এক দৃশ্য। প্রেসিডেন্ট যে এসছেন-গেছেন, কেউ হয়ত ভালো করে জানেও না। তিনি তার মতো এসে, আবার চলেও গিয়েছেন। অনুষ্ঠান’টা কেবল’ই একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল। সেখানে তো প্রেসিডেন্টের কোন ফাংশন নিয়ে। তাকে তো আলাদা ভাবে ট্রিট করার কিছু নেই! সে তার মতো করে অনুষ্ঠানে এসছে, উপভোগ করেছেন, আবার চলেও গিয়েছেন।

আর বাংলাদেশে তো এই ধরনের অনুষ্ঠানে সামনে বসা নিয়ে পারলে মারামারিও হয়ে যায়! ব্যাপারটা এমন- সামনে না বসতে পারলে আপনি ছোট হয়ে যাচ্ছেন! অর্থাৎ জোর করে হলেও বড় হতে হবে।

এইতো কিছুদিন আগে একজন ম্যাজিস্ট্রেট এক ভদ্রলোককে চড় মেরে বসেছেন- কারণ ওই ভদ্রলোক তাকে স্যার কিংবা ম্যাডাম ডেকে সম্বোধন করেন’নি! চিন্তা করে দেখুন অবস্থা! জোর করে হলেও সম্মান আদায় করে নিতে হবে। আমি যে অন্যদের চাইতে আলাদা কিছু সেটা বুঝিয়ে দিতে হবে!

আমাদের পরিবার, সমাজ আমাদের এইসবই শেখায়। যে করেই হোক বড় হতে হবে! আর সেই বড় হবার জন্য যত ইচ্ছে অন্যকে ছোট করার মাঝেও কোন ক্ষতি নেই। বড় হতে পারলেই চলছে!

আমরা ছয় ভাই-বোন যখন আমাদের ঢাকার বাসায় বড় হচ্ছিলাম; আমাদের নিরক্ষর মা, আমাদের সব সময় বলতেন- তোমাদের ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, জজ-ব্যারিস্টার হবার দরকার নেই। মানুষ হতে পারলেই হবে। স্রেফ মনে রাখবে- একজন খেঁটে খাওয়া ব্যক্তিও মানুষ, তাকে যেন তোমরা কখনো অবহেলা না করো।

আমার মনে আছে, আমার বাবা দীর্ঘ এক মাস আমার সঙ্গে একটা শব্দ পর্যন্ত বিনিময় করেননি। তখন কতো হবে আমার বয়েস, ক্লাস ফাইভ কিংবা সিক্স এ পড়ি। ওই সময় আমাদের বাসায় কাজ করার জন্য একটা ছেলে থাকতো। একদিন সন্ধ্যে বেলায় আমি ওই ছেলে’কে বেশ জোরে একটা ধমক দিয়েছিলাম। ছেলেটা পানি আনতে বোধকরি দেরি করেছিল কিংবা এই ধরনের কিছু!

আমার বাবা আমার জোর গলার আওয়াজ শুনে, আমাকে এসে বললেন- তুমি এক্ষুনি ছেলেটার কাছে ক্ষমা চাইবে। নইলে আমি তোমার এই জন্মদিনে তোমার জন্য কোন গিফট কিনব না।

আমি যেহেতু ছোট ছিলাম, তাই আমার মনে হচ্ছিলো- বাসার কাজের ছেলের কাছে ক্ষমা চাইবো! এটা আবার কেমন কথা! তাই আমি ক্ষমা চাইনি। আর এর জন্য আমার বাবা আমার সঙ্গে একমাস কথা বলেননি। যেহেতু ছোট ছিলাম, জন্মদিন খুব কাছে চলে আসছিল, ভাবছিলাম বাবা যদি এখনো আমার সঙ্গে কথা না বলে, তাহলে তো জন্মদিন’টাই মাটি হয়ে যাবে।

তাই আমি শেষমেশ ছেলেটার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইলাম। ক্ষমা চাইবার পরেই আমার বাবা আমার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং বলেছিলেন

-এই ছেলের জায়গায় তুমিও হয়ত থাকতে পারতে। এই ছেলের বাবার সামর্থ্য নেই, তাই তাকে আমাদের বাসায় কাজ করতে হচ্ছে। আমার যদি সামর্থ্য না থাকতো, তোমাকেও হয়ত মানুষের বাসায় কাজ করতে হতো। সেও তোমার মতোই মানুষ, তার সঙ্গে তুমি খারাপ ব্যাবহার করতে পারো না।

কতো হবে আমার বয়েস তখন- এগারো কিংবা বারো বছর! সেই যে জোর গলায় কথা বলা ছেড়েছি, এই জীবনে আর কোন দিন কারো সঙ্গে জোর গলায় কথা বলেছি বলে আমার মনে পড়ে না। আমার ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, এমনকি আমার যদি কোন শত্রুও থেকে থাকে, সেও কোন দিন বলতে পারবে না; আমি তার সঙ্গে জোর গলায় কথা বলেছি; কিংবা খারাপ ব্যবহার করেছি।

জগতের সমুদয় সকল মানুষের সঙ্গে হাসি মুখে কথা বলতে হবে, সবার সঙ্গে ভালো ব্যাবহার করতে হবে, তা সে কাজের মানুষ হোক কিংবা রিকশাওয়ালা হোক। আমাদের বাবা-মা আমদের ছয় ভাই-বোন’কে সব সময় এই শিক্ষা দিয়েছেন। আমরা ছয় ভাই-বোন দেশ-বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় ডিগ্রী নিয়েছি; হয়ত ভালো-মন্দ চাকরীও করি; কিন্তু কখনো কোন দিন সেটা কাউকে বুঝতে দিয়েছি বলে মনে হয় না।

অথচ আমাদের সমাজ’টা এমন- আপনি অমায়িক হবেন, ছোট হয়ে কথা বলার চেষ্টা করবেন; লোকজন সেটা নিয়েও সন্দেহ করবে, পারলে সেটা ব্যাবহার করার চেষ্টা করবে।

আমাদেরকে শিক্ষা দেয়া হয়- ভালো রাষ্ট্র এবং সমাজ পাওয়ার জন্য শিক্ষিত মা দরকার।

আমি জানি না এই “শিক্ষা’র” সংজ্ঞা’টা কি!

তবে আমার আক্ষর জ্ঞানহীন মা আমাকে যেই শিক্ষা দিয়েছেন- মানুষকে মানুষ ভাবতে শিখিয়েছেন; ছোট থেকে কিংবা বিনয়ী হয়েও কিভাবে বড় হওয়া যায়; সেই শিক্ষা উপরে লেখা ওই ম্যাজিস্ট্রেট যিনি কিনা তাকে স্রেফ ম্যাডাম না বলার জন্য একজনকে চড় মেরে বসেছেন, কিংবা যারা আমাকে বলেছে- আপনি সামনের চেয়ারে কেন বসছেন না; তাদের কাছ থেকে শিখতে পেরেছি বলে মনে হয় না। অথচ এরা সবাই উচ্চ শিক্ষিত!

এই উচ্চ শিক্ষিত মানুষ গুলো বরং কিভাবে অন্যকে ছোট করে হলেও বড় হওয়া যায় সেই নিয়ে ব্যস্ত! আমাদের পুরো সমাজের চিত্র’টাই আসলে এমন!

এই যে জাফর স্যার, আমাকে লিখেছেন – ‘আমার-তোমার মতো মানুষ যে এই সমাজে এখনও বেঁচে আছি, এটাই আমদের সৌভাগ্য!’ তিনি ঠিক’ই বলেছেন। কারন আমরা কিছু মানুষ এখনও নিজেদের মতামত জানাচ্ছি, লেখালেখি করছি। সেই মতামত আর লেখালেখি যখন যার বিরুদ্ধে যাচ্ছে, আমরা হয়ে যাচ্ছি তাদের অপছন্দের মানুষ।

অপছন্দের মানুষ থাকতেই পারে। এটা অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু অপছন্দ হলেই তাকে অপমান করতে হবে; যা ইচ্ছে তাই বলে বেড়াতে হবে কিংবা তাকে মেরে ফেলতে হবে; সেই শিক্ষা আমাদের সমাজ আমাদের এখন দিয়ে বেড়াচ্ছে!

কারন আমরা ‘সফল’ হতে শিখেছি ‘বড়’ কিংবা ‘প্রতিস্থিত’ হতে শিখেছি; ‘ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার’, ‘জজ- ব্যারিস্টার’, শিক্ষক, সাংবাদিক হতে শিখেছি; কিন্তু মানুষ হতে কেউ আমাদের শেখায়নি।

https://www.mega888cuci.com