ইয়াসির আলী কিন্তু বিপিএলের আবিস্কার নন!

ইয়াসির আলী রাব্বি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলছেন, তিনটি হাফ সেঞ্চুরি করেছেন, হয়তো সামনে জাতীয় দলেও খেলবেন। তবে, একটা কথা সবার উদ্দেশ্যে বারবার বলি, লক্ষবার বলি – ইয়াসির কিন্তু বিপিএলের আবিস্কার নন।

বাংলাদেশের দর্শকদের একটা বাতিক আছে। উঠতে বসতে ক্রিকেটারদের নামের আগে তারা বিপিএলের আবিস্কার শব্দযুগল লাগিয়ে দিতে পছন্দ করেন। এটা মুমিনুল হক, এনামুল হক বিজয়, তাসকিন আহমেদ, সৌম্য সরকার বা সাব্বির রহমানদের ক্ষেত্রে যেমন হয়েছে – তেমনি বাদ পড়েননি হালের আবু জায়েদ রাহি, নাজমুল ইসলাম অপু, জাকির হাসান বা আরিফুল হকরা। ব্যাপারটা এমন যে, ভাল করলে সমস্যা নেই, খারাপ করলেই তখন বিপিএলকে বাড়তি কিছু কটু কথা হজম করে ফেলতে হবে।

কি হাস্যকর এবং অযৌক্তিক কথা! নিশ্চয়ই স্যাটেলাইটের এই যুগে বিপিএলের সুবাদেই এদের অনেককে প্রথমবারের মত আমরা ব্যাটে-বলের লড়াইয়ে অংশ নিতে দেখেছি। তাই বলে, এদের সবাইকে বিপিএলের আবিষ্কার বানিয়ে ফেলা বাড়াবাড়ি পর্যায়ের বিরক্তিকর ব্যাপার। এর ফলে, বিপিএল পর্যন্ত আসার আগে ঘরোয়া ক্রিকেটে এদের যে পরিশ্রম তাকে অসম্মান করা হয়।

এমনকি নির্বাচক বা কোচরা যখন ক্রিকেটার বাছাই করেন তখনও বিপিএলের ভূমিকা থাকে ঘরোয়া ক্রিকেটের বাকি আসরগুলোর মতই। এর চেয়েও বড় ব্যাপার হল ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামোতে ঢুকে যাওয়া যেকোনো ক্রিকেটারের পেছনে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বড় অংকের বিনিয়োগ আছে। হ্যা, সেই বিনিয়োগের পরিমান হয়তো অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড বা প্রতিবেশ ভারতের মত নয়, তবে সেটা নেহায়েৎ কমও নয়।

শুধু ঘরোয়া ক্রিকেট নয়, বিসিবির বিনিয়োগের বড় একটা অংশ যায় বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে। এই বিনিয়োগটা হল একটা প্রক্রিয়ার সূচনা, যার মধ্য দিয়ে ক্রিকেটাররা একটা পর্যায়ে এসে বিপিএল খেলেন, কেউ বা জাতীয় দলে চলে আসেন। ফলে, আপনি যখন কাউকে বিপিএলের আবিস্কার বলেন, তখন তার ঘরোয়া ক্রিকেটে, বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে করে আসা পরিশ্রমগুলো অসম্মানিত হয়।

বিপিএলে খেলার সামর্থ্য আছে কি নেই, সেটা জাতীয় লিগ (এনসিএল), ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগ, বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ (বিসিএল), অথবা অনূর্ধ্ব ১৯ দল, ‘এ’ দল বা ইমার্জিং দলে প্রমাণ করে এসেছেন। সেজন্যই ফ্র্যাঞ্চাইগুলো তাঁদের পেছনে টাকা ঢালতে কার্পণ্য করছে না।

মনে রাখতে হবে, ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো এখানে ক্রিকেটের কোনো প্রসার ঘটাতে আসেনি, এসেছে স্রেফ ব্যবসা করতে হবে। ‍শুনতে একটু খারাপ শোনালেও এটাই সত্যি। ফলে, যে ক্রিকেটারকে দিয়ে ব্যবসা করা যাবে বলে মনে হয়, তাঁদের পেছনেই কেবল টাকা খরচ করে তাঁরা।

ইয়াসির আলী রাব্বি হলেন তেমন একজন ক্রিকেটার। তাঁর ক্ষেত্রে অনেককেই দেখলেন ‘বিপিএলের আবিস্কার’ কিংবা ‘অপরিচিত ক্রিকেটার’-এর ট্যাগ লাগিয়ে দিতে। যারা এমন লিখছেন তারা কি জানেন, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ইয়াসিরের গড় কত? প্রায় ৫০ ছুঁইছুই। সেটাও ৪৬ টি ম্যাচ খেলার পর।

এরপরও যখন কেউ তাঁকে অপরিচিত বলবেন, বোঝা যায় তিনি ঘরোয়া ক্রিকেটের খোঁজ একদমই রাখেন না। রাখেন না মানে পত্রিকার খবরও পড়েন না। কারণ, জাতীয় লিগে তামিম ইকবাল বা মুমিনুল হকরা যখন প্রায় অনুপস্থিত থাকেন, তখন চট্টগ্রাম বিভাগের ব্যাটিংয়ের নেতৃত্বটা এই ইয়াসিরই দেন।  মনে করা হয়, এই ২৩ বছর বয়সী ব্যাটসম্যানই হলেন এক কালের প্রতাপশালী চট্টগ্রামের অলস ব্যাটিং কারিশমার শেষ ধারক, মানে আকরাম খান-নান্নু-নোবেলদের উত্তরসুরী।

হাই পারফরম্যান্স ইউনিটের হয়ে গত দেড় বছরে ইয়াসির দেশে বিদেশে ম্যাচও খেলেছেন! ‘এ’ দলের হয়ে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে একটা প্রথম শ্রেণির সেঞ্চুরি করে ম্যাচ জিতিয়েছেন। নির্বাচকরা এতে আরও সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে আয়ারল্যান্ড সফরের দলেও রেখে দেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সিএনজি দুর্ঘটনায় চার মাস বিছানায় পড়ে থাকতে হয় ইয়াসিরকে এজন্য ওর ওই সফরটা মিস হয়! কিন্তু, ফিরে এসেই বিসিএলে ৮২ আর ১০০! নির্বাচকরা তাঁকে ইমার্জিং এশিয়া কাপে স্কোয়াডে পাঠান। সেখানে ৪৫, ৫৫, আর ৬৫! পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ জেতানো ইনিংস!

ইয়াসির আলীর পরিশ্রমটা তখনই বুঝবেন, যখন আপনি ২০১৫ বিপিএলে তাঁর কোনো ছবি দেখবেন। তখনকার নাদুসনুদুস রাব্বি এখন অনেকটাই ফিট। এই যে মেদ কমাতে নেটে, জিমে ঘাম ঝরিয়েছেন, সেই সংগ্রামকে কৃতিত্ব দিতে আমাদের এত আপত্তি কেন!

আয়ারল্যান্ডের সেই সফরে ভাল করাদের প্রায় সবাই সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দলে খেলে ফেলেছেন। এবারই রাব্বির সুযোগ হয়নি, নিশ্চয়ই শিগগিরই হয়ে যাবে। এই সুযোগ পাওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় বিপিএলের অবদান কিন্তু খুবই সামান্য। তাই, ইয়াসিরের সামর্থ্যের পরিচয় তিনি যেন অযথা বিপিএলকে ‘গ্লোরিফাই’ করা না হয়, কিংবা কখনো তিনি ব্যর্থ হলে সেটাকে ঢাকতে যেন বিপিএলকে খামোখা ছোটও করা না হয়!

২০১৫ বিপিএলের ইয়াসির

https://www.mega888cuci.com