ভাগ্যে থাকলে কি না হয়!

দরজায় কড়া নাড়ছে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। পর্দা নামতে শুধু যেন আর সময়ের অপেক্ষা। বাংলাদেশের ফুটবল প্রেমীদের চোখেও যেন বিন্দুমাত্র ঘুম নেই। সারাদিন ব্যস্ত পাড়ার দর্জির দোকানে, প্রিয় টিমের পতাকা বানাতে, ছাদে উড়াতে, প্রতিপক্ষ দলের পতাকা তার তুলনায় বড় হলে আবার বানাতে। ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ কে এমনই ভালোবাসে বাংলাদেশের মানুষ। সেই ভালোবাসার বিশ্ব ফুটবলের এমন পাঁচজন খেলোয়াড় নিয়ে আজ আলোচনা করব; যারা কিনা নানা অনুকূলতা-প্রতিকূলতার মাধ্যম্যে নাম লেখিয়েছেন বিশ্বকাপ স্কোয়াডে এবং করেছেন বাজিমাত।

  • জিওফ হার্স্ট (১৯৬৬ বিশ্বকাপ)

জিওফ হার্স্ট, যিনি এমন একজন ফুটবল খেলোয়াড় যার কীর্তির কোনো অংশীদার নেই। হ্যাঁ, ১৯৬৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে হ্যাট্রিক করা হার্স্টের আসলেই কোনো অংশীদার নাই কারণ ১৯৩০ থেকে আজ অবধি তিনি বাদে ফাইনালে কেউ হ্যাটট্রিক করতে পারে নি।

১৯৬৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড স্কোয়াডে অন্তর্ভূক্তি তার জন্য সহজ ছিল না। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের আগে মাত্র একম্যাচ তিন সিংহের প্রতিনিধি হয়ে মাঠে নেমেছিলেন। সেটা ছিল বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার চার মাস আগে। তাই এই ওয়েস্টহাম স্ট্রাইকারের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে থাকা নিয়ে ছিল সংশয়। কিন্তু চূড়ান্ত স্কোয়াড তিনি তার নাম দেখে যেন একটু খুশিই হয়েছিলেন।

ইংল্যান্ড বস আলফ্রেড রামসি তাকে হয়তবা রেখেছিলেন জিমি গ্রেবসের বদলি হিসাবে। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে জিমির ইঞ্জুরি হার্স্টের জন্য যেন সুসংবাদ বয়ে নিয়ে এসেছিল। এরপর থেকে দলে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করে নিয়েছিলেন। তার প্রতি কোচের আস্থায় প্রতিদান তিনি দেয় কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে জয়সূচক গোল করে। কোচের সুনজর আকৃষ্ট করে হার্স্ট। তাইতো ফাইনালে জিমি গ্রেবস ইঞ্জুরি মুক্ত থাকলেও পুরো ১২০ মিনিট তাকে বসিয়ে রাখেন। কোচের সেই অাস্থার প্রতিদান আবারো দেয় হ্যাট্রিক করে। জিতে নেন ১৯৬৬ বিশ্বকাপ ফুটবল। আবারো বিশ্বকাপ যায় আয়োজকদের ঘরে।

  • আন্টোনিও কাবরিনি (১৯৭৮ বিশ্বকাপ)

আন্তর্জাতিক অভিষেক না হয়েই সরাসরি বিশ্বকাপ স্কোয়াডে কারো নাম। শুনে আপনি হয়ত অবাকই হবেন। এমন কীর্তি গড়ে ১৯৭৮ বিশ্বকাপে যে সরাসরি জায়গা করে নিয়েছিল তিনি হলে আন্টোনিও কাবরিনি।

আপনার মনে হয়ও প্রশ্ন থাকতে পারে এমন কোন ক্ষেত্রে তার বিশেষত্ব ছিল যে কোচের নজরে আটকে গিয়েছিল। যুভেন্টাসের এই লেফট ব্যাক খেলার মাঠের কৌশল, উপস্থিত বুদ্ধি, রক্ষণ দক্ষতা, শারীরিক ক্ষমতা। সর্বোপরি তার খেলোয়ারী দক্ষতা মুগ্ধ করেছিল ইতালিয়ান বসকে। তাইতো সরাসরি বিশ্বকাপ স্কোয়াডে। বিশ্বকাপে নাম লেখিয়েই তিনি শান্ত হয় নি। প্রতিটি ম্যাচে শুরু থেকে মাঠে থেকে এবং আসরের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের খেতাব তুলে নিয়ে প্রমাণ করেছিল কোচের সিদ্ধান্তে ভুল ছিল না।

১৯৭৮ বিশ্বকাপে চতুর্থ অবস্থানে থেকে আসর শেষ করতে হয়। কিন্তু পরের আসর ১৯৮২ স্পেন বিশ্বকাপে ঠিকই দেশের হয়ে বিশ্বকাপ জিতে নেন। শারীরিক সুঠাম গড়ন আর সৌন্দর্য্যের জন্য ইতালির মানুষের কাছে খ্যাত ‘বেল আন্টোনিও’ কে ইতালির ফুটবল ইতিহাসের সেরা ডিফেন্ডার আর বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের সেরা ফুলব্যাক হিসাবে ধরা হয়।

  • পাওলো রসি (১৯৮২ বিশ্বকাপ)

একজন ফুটবলারের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি কি জানেন? দেশের হয়ে বিশ্বকাপ জেতা। তাইতো লিওলেন মেসি একবার বলেছিলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত সব ট্রফি নিয়ে নাও। তার বিনিময়ে আমি একটা বিশ্বকাপ ট্রফি চাই।’ ক্রইফ, জর্জ বেস্ট, ইউসিবিও এর মতো অনেক লিজেন্ড আছেন যারা বহু চেষ্টা করেও বিশ্বকাপ জিততে পারেননি। সামর্থ্যের সবটুকু দিয়েও যেখানে স্বপ্নপূরণে ব্যর্থ হয়েছে সেখানে কিভাবে একজন খেলোয়ার দুই বছরের আন্তর্জাতিক ব্যান থেকে ফিরেই বিশ্বকাপ জেতে। ইতালির ১৯৮২ বিশ্বকাপ জয়ী তারকা পাওলো রসিই এমন কীর্তি গড়েছিলেন।

১৯৮০ এর দিকে ফুটবল ইতিহাসে বহুল আলোচিত ‘টোটোনেরো কেলেঙ্কারি’তে দোষী প্রমাণিত হলে তাকে তিন বছরের জন্য সব ধরনের ফুটবল থেকে বহিস্কার করা হয়। যদিও রসি তার জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে। কিন্তু আসন্ন ১৯৮২ বিশ্বকাপে রসির প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে শাস্তি একবছর কমানো হয়। ১৯৮২ স্পেন বিশ্বকাপের মূল একাদশে নাম লেখান। ১৯৮২ বিশ্বকাপে তিনি যেন এক চ্যাতা বাঘ। দলকে আসরের সর্বোচ্চ ছয় গোল করে এনে দিলেন তৃতীয় বিশ্বকাপ।

ব্যক্তিগতভাবে জিতলেন আসরে সেরা খেলোয়ার ‘গোল্ডন বল’ আর সর্বোচ্চ গোলদাতার ‘গোল্ডন শু’। কে ভেবেছিল ব্যান থেকে ফিরে একজন খেলোয়ার এতো অমানুষিক খেলা প্রদর্শন করতে পারে। হয়ত দুই বছর ধরে তিনি এটাই জিইয়ে রেখেছিলেন।

  • রজার মিলা (১৯৯০ বিশ্বকাপ)

অবসরে চলে যাওয়া একজন খেলোয়াড়, দেশের প্রেসিডেন্টের ফোন কলে সাড়া দিয়ে, বিশ্বকাপ একাদশে নাম লেখিয়ে, বেঞ্চে থেকে মাঠে নেমে দলকে জিতিয়ে ফিরলেন। এমন দৃশ্য ফুটবল ইতিহাসে নায় বললেই চলে। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। বলছি ১৯৯০ বিশ্বকাপে ক্যামেরুন জাতীয় ফুটবল দলের রজার মিলার কথা।

বিশ্বকাপ দল নির্বাচনের আগে তখন রিইউনিয়ন দ্বীপে শান্তিতে অবসর কাটাচ্ছেন সম্প্রতি জাতীয় দল থেকে অবসর নেয়া রজার মিলা। হঠাৎ প্রেসিডেন্টের ফোন কল। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ১৯৯০ বিশ্বকাপে অবসরে থাকে মিলাকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে দেখতে চান। কি আর করা প্রেসিডেন্টের অনুরোধ। না করা অভদ্রতা।

বিশ্বকাপের মাঠে যেন নতুন করে নিজেকে ফিরে পেল রজার। নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে তাঁকে মাঠে নামানো হলে দুই গোল করে নিজেদের পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ করে নিল এবং তার কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময়ের জোড়া গোল দলকে নিয়ে গিয়েছিল কোয়ার্টার ফাইনালে।

কিন্তু, কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে ৩-২ গোলে হেরে বাড়ি ফিরতে হয়। সেবার টুর্নামেন্ট জুড়েই নজর কেড়েছিলেন রজার। বিশেষ করে গোল করার পর মাঠের কোণায় গিয়ে নাচ ছিল বেশি আকর্ষণীয়।

  • কেভিন প্রিন্স বোয়েটাং (২০০৬ বিশ্বকাপ)

বাবা ঘানার নাগরিক, মা জার্মানির। জন্মস্থান জার্মানি। ছোট ভাই জার্মানির হয়েই বিশ্ব মাতাবেন তা বড় ভাইকে বলেছেন অনেকবারই। ২০০৬ বিশ্বকাপ ঘানার বিশ্বকাপ একাদশে যোগদানের আমন্ত্রণ। আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিলেন। ২০১০ বিশ্বকাপ আবারো ঘানার বিশ্বকাপ একাদশে যোগদানের আমন্ত্রণ। এবার আর না নয়। যোগ দিলেন ঘানার বিশ্বকাপ একাদশে। এমনি পরিস্থিতির মধ্যে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তটি নিতে হয়েছিল কেভিন প্রিন্স বোয়েটাংকে।

২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে বোয়েটাং এর অন্তর্ভূক্তি যেন পুরা ঘানা দলকে চাঙ্গা করেছিল। ঘানার মিডফিল্ডের প্রাণভোমরা যেন ২৭ বছর বয়সী বোয়েটাং। গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে করেছেন দৃষ্টিনন্দন একক প্রচেষ্টার গোল। দলকে নিয়েছিলেন কোয়ার্টার ফাইনালে; যেখানে উরুগুয়ের কাছে ট্রাইবেকারে হেরে যায় তারা। হেরে গেলেও পুরা টুর্নামেন্ট জুড়ো বিশ্বের নজর কেড়েছিল সেই বিশ্বকাপের আন্ডারডগ ব্লাকস্টার্সরা। যার মূল কেন্দ্র বিন্দু ছিল কেভিন প্রিন্স বোয়েটাং।

বাংলায় একটা কথা প্রচলিত আছে, ‘ভাগ্যে থাকলে সব সম্ভব।’ আসলেই তাই। ফুটবল বিধাতা যদি আপনার কপালে ঠুকে দেন আপনি বিশ্বকাপ জিতবেন বা দেশকে ভালো কিছু উপহার দিবেন । পৃথিবীর শত প্রতিকূলতাও যেন তার কাছে হার মানবে। জিতবেন কোটি কোটি ভক্ত সমর্থকের ভালবাসা।

– ফোরফোরটু অবলম্বনে

https://www.mega888cuci.com