রবির রমণী কিংবা রবিমোহন রমণী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাংলা সাহিত্যের একজন অসম্ভব প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব৷ সাহিত্যের এমন কোন শাখা নেই যেখানে তাঁর লেখার ছাপ পাওয়া যায় না৷ বাংলা সাহিত্যের সত্যিকার কাণ্ডারী বললেও অত্যুক্তি হয় না৷ অসংখ্য প্রেমের গান, কবিতা লিখে গেছেন যেগুলোর আবেদন চিরন্তণ, শ্বাশত৷ তিনি নিজেও ছিলেন প্রেমিক পুরুষ৷স্ত্রী মৃণালিনী ছাড়াও তিনি সম্পর্কে জড়িয়েছেন বহু নারীর সাথে৷ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে তার সাহিত্যের একটা বিশাল অংশ প্রভাবিত হয়েছে এসব নারীদের দ্বারা৷ রবীন্দ্রনাথের তেমনি কিছু নারী সম্পর্কের কথা জানানোর চেষ্টায় এ লেখা৷

১.

পুরো নাম অন্নপূর্ণ দেবী৷ ডাকনাম আন্না৷ বয়স একুশ৷ প্রতীচ্যের শিক্ষা ও আচার আচরণে অভ্যস্থ ৷ রবিঠাকুরের বয়স মাত্র সতের৷কবি কবি ভাব৷ পড়ালেখায় মন নেই৷ বংশের মান রক্ষার জন্য বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছেলেকে বিলেত পাঠিয়ে দিতে চান৷ আশাএকটু শিক্ষিত হয়ে আসবে৷সময়টা ১৮৭৯৷ বিলেতে গিয়ে যাতে সমস্যা না হয় সে জন্য ভাষা আর কায়দা কানুন শেখার জন্য পাঠিয়ে দিলেন দাদা সত্যেন্দ্রনাথের কাছে ,বোম্বেতে৷

আধুনিক মানসিকতার দাদা এই ভার তুলে দিলেন আন্নার হাতে ৷ দেখা হলো আন্নার সাথে৷ বয়সে বড় হলেও তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয় অন্য সম্পর্ক৷ আন্না ভীষণভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন রবিঠাকুরের প্রতি,সাথে রবিঠাকুরও৷আদর করে নলিনী বলে ডাকেতেন কবি তাকে ৷ নলিনীকে নিয়েই লিখেন ‘কবি কাহিনী’ বইটি ৷ উৎসর্গও করতে চেয়েছিলেন আন্নাকে৷ কিন্তু তা আর হয়ে উঠে নি৷ ততোদিনে কবি চলে আসেন কলকাতায়৷ তাদের প্রেমেরও ইতি সেখানেই৷

পরে আন্নার বিয়ে হয়ে যায় এক আইরিস যুবক হ্যারল্ড লিটলডেলের সাথে ৷ মারাঠি মেয়ে আন্নাই হলো রবি ঠাকুরের প্রথম ও কিশোর বয়সের প্রেম৷ কিন্তু ছত্রিশ বছর বয়সে যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান আন্না৷ ততোদিনে তার বিয়ে ভেঙে গেছে৷ কে বলবে, হয়তো রবিঠাকুরকে মন থেকে সরাতে পারেন নি বলেই বিচ্ছেদ৷ শেষ বয়সে এসেও কি কবি ভুলতে পেরেছেন তাকে? কবি লেখেন –

শোন নলিনী, খোল আঁখি

ঘুম এখনো ভাঙিল নাকি

দেখ তোমারই দুয়ার পরে

সখি এসেছে তোমারি রবি

২.

১৮৭৯ এর শেষ দিক৷ কবি তখন বিলেতে ৷ আন্নার কাছ থেকে শিক্ষায় শিক্ষিত৷ গিয়ে উঠলেন মিস্টার স্কটের পরিবারে৷ মিস্টার স্কটের চার মেয়ে৷ সবচেয়ে ছোট লুসি৷যৌবনে পদার্পন করা সুন্দরি লুসি রবিঠাকুরের প্রেমে হাবুডুবু খেতে থাকে৷ লুসি পিয়ানো বাজায় আর গান গান কবি, প্রেমের গান৷ গান ভাসিয়ে নেয় দুজনকে৷ কবি গাইতে থাকেন-

ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে বয়ে কিবা মৃদু বায়

তটিনী হিল্লোল তুলে কল্লোলে চলিয়া যায়

কিংবা,

আমি তোমায় শুনিয়েছিলাম যতো গান

তার বদলে আমি চাইনি কোন দান

বিলেত বলে কেউ এটাকে বাজে চোখে দেখে নি৷ বসন্ত চলে গেল ৷শীত এলো কবি চলে আসবেন কলকাতা৷ ক্রন্দন চোখে লুসি জানতে চায়-

‘You are really going? Are you?’

কবি চলে আসেন৷ ভুলতে পারেন না লুসিকে৷ ১৯৯১ সালে প্রায় দশ বছর পর আবার যান লুসিকে দেখতে৷ লুসি তখন কোথায় আছে কেউ জানে না৷ ব্যর্থ মনোরথে ফিরে আসেন ৷ অনেক দিন পর ১৯২৯ সালে কবি তখন কানাডাতে৷হঠাৎ একদিন শান্তিনিকেতন হতে একটি চিঠি পেলেন৷ লিখেছেন এক ইংরেজ ভদ্রলোক, সম্পর্কে লুসি তার পিসি মা৷ শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথকে না পেয়ে তিনি চিঠিখানা লিখেছেন৷ চিঠিতে লেখা লুসির কঠিন ব্যাধি, সারানোর জন্য অনেক টাকা দরকার, টাকা চাই৷ রবীন্দ্রনাথ টাকা দিয়েছেন কিনা জানা যায় নি ৷ কিন্তু তার অপেক্ষায় লুসি আর বিয়েই করেননি৷

৩.

১৮৮২ সাল৷ কবি ফিরেছেন বিলেত হতে৷ এসেই জড়িয়ে পরেন এক নিষিদ্ধ ও উত্তেজনাকর সম্পর্কে৷ এক শ্রদ্ধেয়া মহিলার সাথে জড়িয়ে গেছেন মন ও শরীর নিয়ে ৷ কাদম্বরী দেবী৷ কবি জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়৷ দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী৷ সম্পর্কে বৌদি৷ প্রায় সমবয়সী কাদম্বরী দেবী কিশোরী বয়সেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে আসেন৷

বিলেত যাবার আগে রবি ছিলো খেলার সাথী আর বিলেত থেকে ফিরে যৌবনে উদ্দীপ্ত রবি হলো ভালোবাসার সাথী৷ সন্ধ্যায় বাড়ির ছাদে বসতো গানের আসর ৷ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ছিল পিয়ানো বাদক আর রবি গলাছেড়ে ধরতো গান ৷ এই গানের সুরেই হারিয়ে যেতেন কাদম্বরী৷ কখনো মধুমাখা অহংকারে করতেন লেখার সমালোচনা-

যতোই লেখ না কেন বিহারীলালের মতো লিখতে পারবে না

রবি রেগে যেতেন, চেষ্টা করতেন বিহারীলালের মতো লিখতে৷ কিন্তু কে জানতো, লেখার ইতিহাসটা বদলে দেয়ার জন্যই তাঁর জন্ম ৷

তারপর কতো মধ্যদুপুর পার হয়ে যেতো ৷ দুজন মিশে যেতে লাগলো আত্মার সঙ্গে৷ রবিঠাকুরের ভাষায় –

‘দুপুরবেলা জ্যোতিদাদা নিচলায় কাচারীতে যায়৷ বউডাকুরুন ফলের খোসা ছাড়িয়ে কেটে কেটে যত্ন করে রুপার ব্যাকারিতে সাঁজিয়ে রাখতেন, সাথে কিছু মিষ্টান্নও থাকতো ৷আর তার উপর ছড়ানো হতো গোলাপের পাপড়ি ৷ গ্লাসে থাকতো ডাবের জল,ফলের রস কিংবা তালশাঁস৷সমস্তটার উপর একটা রেশমি রুমালদিয়ে ঢেকে রওয়ানা দিতেন কাছাড়িতে জলখাবার দিতে ৷ অার দাদা ফিরতেন বিকালে”৷

আর মধ্যবর্তী সময়টা একান্তে কাটাতেন রবি আর কাদম্বরী৷অন্তরঙ্গ মুহুর্তে রবি তাকে ডাকতেন হেকেটি বলে ৷ গ্রীক পৌরীণিক দেবী হে এর চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় কাদম্বরী দেবীর সাথে মিল বেশি৷, ‘এমন কর্ম আর করবো না’ নাটকে অভিনয় করলেন একে অন্যের বিপরীতে ৷ প্রেম নিয়ে ভারী মজার গল্প৷ দুজন অভিনয় করলেন প্রাণ দিয়ে৷জ্যোতিরিন্দ্রাথ সবই বুঝতেন কিন্তু কিছুই করার ছিল না হয়তো৷ কিন্তু তাদের এ সুখ আর বেশিদিন রইলো না৷

১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর কবি বিয়ে করলেন খুলনা প্রবাসী মৃণালিনী৷ দশবছর বয়েসি মৃণালিনী, ছোট বউ বলে সবাই ডাকতো ছুটি নামে৷ তখন কাদম্বরী ভাবতে লাগল রবির উপর তার অধিকার হারিয়ে গেছে৷এতোদিনের সঙ্গীকে হারিয়ে অতিরিক্ত আফিম খেয়ে আত্মহত্যা করেন কাদম্বরী৷

আত্মহত্যাজনিত রহস্য উৎঘাটন করার জন্য কর্তৃপক্ষ তৎপর হয়ে উঠে৷ কিন্তু ঠাকুর পরিবার উৎকোচের মাধ্যমে রফা করে ফেলে ৷ লাশ আর মর্গে যায় নি ৷ নিমতলার শ্মশানে আগুনের বিষন্ন উৎসবে ছাই হয়ে উড়ে গেলেন কাদম্বরী দেবী ৷ কিন্তু রবির মন থেকে কি উড়ে যেতে পেরেছিলেন তিনি? মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত বউঠাকরুনের মুখটা দেখার জন্য আকুল হয়ে ছিলেন৷ ১৯২৯ সালে শুধু একবার মুখটা দেখার জন্য প্ল্যানচেটে বসেছিলেন ৷ কামম্বরীর মৃত্যুর পঁচিশ বছর পর “লিপিকা”য় কবি স্বীকার করলেন, কাদম্বরীকে হারিয়ে কতটা শোকাচ্ছন্ন ছিলেন –

‘বনের ছায়ায় যে পথটা ছিলো,আজ তা ঘাসে ঢাকা৷ পেছন থেকে একজন ডেকে বলল- ‘আমায় চিনতে পারো?’ আমি বললুম – ‘মুখটা চিনতে পারছি ,নামটা মনে করতে পারছি না৷’ বলল – ‘আমি তোমার পঁচিশ বছর বয়সের শোক।’

রবিঠাকুর কাদম্বরী দেবীকেই সবচেয়ে বেশি বই উৎসর্গ করেছেন৷

৪.

ইন্দিরা৷ কবির আপন ভাইঝি ৷ সত্যেন্দ্রাথ ঠাকুরের সুন্দরী মেয়ে৷ বয়সে মৃণালিনীর সমান ৷ প্রতীচ্যের শিক্ষায় আধুনিকা৷ কাদম্বরীকে হারিয়ে রবি ঠাকুরের ভগ্নহৃদয়৷ শিলাইদহের বোটেই কাটে দিন ৷ মনের কথা খুলে বলবার কেই নেই ৷তখনই ইন্দিরাকে চিঠি লিখা শুরু করেন৷ ইন্দিরা যেন মনের শুন্যস্থান পূরণ করলো ৷ইন্দিরার কাছেই অকপটে স্বীকার করতেন সব মনের গহীনের কথা৷

মৃণালিনীর সাথে তাঁর ঠিক খাপ খাচ্ছে না৷ দাম্পত্যজীবনের অসুখী হওয়ার কথা লিখতে থাকেন অবলীলায়৷শুরু হলো এক অন্য সম্পর্ক৷ ভাবতে অবাক লাগে ১৮৮৭ থেকে ১৮৯৫ সাল পর্যন্ত রবিঠাকুর ইন্দিরাকে চিঠি লিখেন ২৯২ টা আর মৃণালিনীকে দেন পাঁচটি সন্তান আর পনেরটি চিঠি কারণ বিলেত ফেরত ইন্দিরা যতটুকু কবি হৃদয় দখল করতে পেরেছিল গ্রাম্য, কমশিক্ষিত মৃণালিনী তা পারেন নি৷ কবি শেষে হয়তো ভেবেছিলেন নিজের ভাইয়ের মেয়ের সাথে এই সম্পর্ক মেনে নেয়ার মতো নয়৷

তাই নিজেই সতর্ক হয়ে গেলেন৷ এই ইন্দিরা দেবীই ছিল চলিত ভাষারীতি প্রবর্তনের অন্যতম পুরোধা প্রমথ চৌধুরীর স্ত্রী৷ রবি ঠাকুরের সাথে ইন্দিরার চিঠি চালাচালি অবশ্য বিয়ের আগে হয়েছিল৷

৫.

কবির তখন মধ্যগগণ৷ নোবেল পেয়েছেন, সারাবিশ্বে অগণিত ভক্ত,অনুরাগী৷ এদেরই একজন এক কলেজ ছাত্রী, জাপানী৷ নাম তোমিকো৷ ‘গীতাঞ্জলী’র জাপানি অনুবাদ পড়ে কবির প্রতি মুগ্ধ৷ কিভাবে দেখা করা যায় কবির সাথে সে চেষ্টা করতে থাকে৷ ১৯১৬ সালে জাপানের এক কলেজের পিকনিকে আমন্ত্রণ জানানো হয় রবীন্দ্রনাথকে৷ রবীন্দ্রনাথও চলে যান৷ জাড়াইজা পাহাড়েপের রোমান্টিক পরিবেশে দেখা হয় তাদের ৷ কবিকে তোমিকা অনুরোধ করে তিনি যেন তার কবিতা ইংরেজীতে অনুবাদ করেন আর তোমিকো তা জাপানী ভাষায় শ্রোতাদের শুনাবে৷ কবি তাই করলেন৷ শুরু হলো এক নতুন অধ্যায় ৷ কবি লেখেন –

‘তুমি হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা ধন

তাই হঠাৎ হাওয়ায় চমকে উঠা মন’

১৯১৯ সাল, আমেরিকায় আবার দেখা হল দুজনের ৷ কবিকে আবার জাপান যেতে অনুরোধ করেন ৷ ১৯২৫ সালে জাপান গেলেন কবি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ৷ প্রাণভরে কবির সেবা করলো তোপি ৷ ফিরে এলেন কবি ৷ ১৯৩৪ সালে বিয়ে করল তোপি কিন্তু সুখী হতে পারলো না ৷ ১৯৩৮ সালে শান্তিনিকেতনে কবির সাথে শেষ দেখা ৷ ততোদিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে৷

৬.

নাম রানু ৷ ১৯০৬ সালে জন্ম ৷ বাবা ফনিভুষম বেনারস কলেজের দর্শনের অধ্যাপক৷ রবীন্দ্রনাথ তখন পঁয়তাল্লিশে ৷ বারো বছরের রানু রবীন্দ্র গল্পগুচ্ছ পড়ে মুগ্ধ ৷ চিঠি লেখেন কবির কাছে ৷ কবিও উত্তর দেন ৷ শুরু হয় আরেক প্রেম কাহিনী ৷ চিঠিতে লিখে রানু –

‘আপনাকে দেখার আমার খুউউউউউব ইচ্ছে’

কবি সবই বুঝতে পারেন ৷ ১৯১৮ সাল৷ রানুর বাবা অসুস্থ৷ চিকিৎসার জন্য পুরো পরিবার তখন কলকাতা৷ দেখা করার জন্য পাগল রানু ৷ দেখা হয়ে গেলো জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে৷কবির ভাষায়-

‘আমি ছ’ফুট লম্বা মানুষ, দাড়িগোফ ওয়ালা কিম্ভুতকিমাকার, আমায় দেখে একটু ভ্রু কুঁচকালে না৷ পাশে বসেই হাতে ধরে কথা বলা শুরু করলে৷’

যেন কতোদিনের চেনা! ১৮ মে ৷ কবির মেয়ে মাধুবিলতা মারা গেল৷কবি সহ্য করতে পারলেন না৷ শেষকৃত্যে না গিয়ে চলে গেলেন রানুর কাছে৷ মনের দু:খ কমানোর জন্য৷ ক’দিন পরেই রানু কলকাতা ত্যাগ করলো৷কিন্তু চিঠি চালাচালি চলতে থাকল৷ ১৯২৪ সাল৷ রানু অষ্টাদশি৷ বিয়ে দিয়ে দিতে হবে রানুকে৷ রবীন্দ্রনাথ চাইছিলেন তার পরিচিত কারো সাথে বিয়ে হোক যাতে বিয়ের পরও সম্পর্ক রাখা যায়৷ কিন্তু বিধি বাম৷রানুর বিয়ে হয় যায় রাজেন্দ্রলাল রায়ের ছেলে বীরোনের সাথে৷ বিয়ের আগে রানুর আকুতি-

‘ভানুদা, আমায় বিয়ে করতে বলো না৷ আমি বিয়েই করবো না’

বিয়ের পর সব যোগাযোগ শেষ হয় শ্বশুড়ের কড়া নির্দেশে৷ শ্বশুড়ের মৃত্যুর পর আবার যোগাযোগ হয়,

কবি তখন মৃত্যু পথযাত্রী, স্বাস্থ্যভেঙে গেছে ৷ রানু বলে-

‘ভানুদা তোমার একি অবস্থা!’

রানুর দিকে কবি তাকায়, দুফোটা জল পড়ে যায় চোখ থেকে, হয়তো মনে পড়ে যায় অতীতের রোমান্টিক দিনগুলোর কথা৷

৭.

ভিক্টোরিয়া ওক্যাম্পো, এক আর্জেন্টাইন নারীবাদী লেখিকা ও সাংবাদিক ৷ নারী অধিকার নিয়ে কাজকরা বিখ্যাত ‘সুর’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা এবং এর সম্পাদিকা ৷ নোবেল পুরষ্কার পাওয়া গীতাঞ্জলী কাব্যগ্রন্থ পড়ে রবি ঠাকুরের কঠিন ভক্ত হয়ে যান তিনি ৷১৯২৩ সালে পেরুর স্বাধীণতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্টানে যোগ দিতে রবি ঠাকুর যখন আর্জেন্টিনার কাছাকাছি পৌছেন তখন অসুস্থ হয়ে যান এবং জাহাজ হতে নেমে আর্জেন্টিনাতে অবস্থান নেন ৷

সেখানে একটি হোটেলে থাকতেন কবি ৷ খবর পেয়েই ভিক্টোরিয়া কবিকে দেখতে হোটেলে যান এবং হোটেল থেকে কবিকে একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে রাখেন ৷ কবি প্রায় তিন মাস আর্জেন্টিনাতে ছিলেন ৷ এই তিনমাসে রচনা করেন ‘পুরবী’ কাব্যগ্রন্থটি ৷ নিটোল প্রেমের কবিতায় পরিপুর্ণ কাব্যগ্রন্থটি কবি ভিক্টোরিয়াকে উৎসর্গ করেন৷ পুরবীর অধিকাংশ কবিতা যখন লেখেন তাঁর মাথায় ছিল ভিক্টোরিয়ার কল্পনা অর্থাৎ কবি ভিক্টোব়িয়ার প্রেমে পড়ে যান ৷

ধারণা করা হয় এই অসমবয়সী প্রেম (যেখানে ভিক্টোরিয়ার বয়স চৌত্রিশ আর কবিগুরুর তেষট্টি) যতটা না কবিগুরুর ইচ্ছায়, তারচেয়ে বেশি ভিক্টোরিয়ার ইচ্ছায়৷ এটা ছিল কবিগুরুর শেষ বয়সের প্রেম ৷ ভিক্টোরিয়ার স্পর্শে কবিগুরুর নারী সম্পর্কে চিন্তা ভাবনার ব্যাপক পরিবর্তন আসে ৷ আগে যেখানে কবির উপন্যাসের নায়িকারা শুধু ঘরে বসে ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতো, ওক্যাম্পোর স্পর্শে কবি সৃষ্টি করেন ‘চিত্রাঙ্গদা’ সেখানে নায়িকা ঘর হতে বের হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নামে, পুরুষের পাশাপাশি ৷ অর্থাৎ নারীকে পুরুষের পাশাপাশি অবস্থানের বানীই বিবৃত হয়েছে চিত্রাঙ্গদায়৷

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কবির সাথে ওক্যাম্পোর প্রায় সারে চারশোরও বেশি চিঠি চালাচালি হয়েছে৷ কবি ওক্যাম্পোকে চিঠিতে অনেকবারই ভারতবর্ষে এসে ঘুরে যেতে বলেছেন , কিন্তু ওক্যাম্পো কখনোই আসতে পারেননি৷ ভিক্টোরিয়াই হয়তো ছিল কবির বিদেশীনী ,যাকে কেন্দ্র করে কবি লিখেছিলেন ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশীনী’৷

যদিও গানটি ভিক্টোরিয়ার সাথে দেখা হওয়ার অনেক আগে লিখেছিলেন তথাপি কবি গানটির ইংরেজী অনুবাদ করে ভিক্টোরিয়াকে দিয়েছিলেন৷ কবির জীবনে আরো কয়েকজন বিদেশীনীর সংস্পর্শ এসেছে, একমাত্র ভিক্টোরিয়া ওক্যাম্পোই কবিকে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন সবচেয়ে বেশি৷

ভিক্টোরিয়া কবি জীবনের আরেকটি অধ্যায়ের সুচনা করেন৷ আর এর বিকাশই আমাদের অন্য এক রবীন্দ্রনাথের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় ৷ চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথ৷ কবি যখন ভিক্টোরিয়ার আপ্যায়নে আর্জেন্টিনা ছিলেন তখনই তাঁর এ চিত্রশিল্পী প্রতিভার বিকাশ ঘটে৷ আর্জেন্টিনাতে থাকাকালীন কবি যে পুরবী কাব্যগ্রন্থ লিখেন বাংলায়, ভিক্টোরিয়া তার কিছুই বুঝতো না৷

কবি প্রায়ই ওইসব কবিতা ইংরেজীতে অনুবাদ করতেন ভিক্টোরিয়ার জন্য৷ কবিতাগুলো লিখার সময় যে কাটাকাটি হতো, যেসব লাইন কবি বাদ দিয়ে দিতেন ওসব লাইন আর কাটা অংশগুলো মিলিয়ে কবি বিভিন্ন পাখি, জীবজন্তু, দৈত্য দানব আঁকতেন৷ ভিক্টোরিয়া ওসব ছবি দেখতেন আর হাসতেন ৷ কবিকে উৎসাহ দিতেন ছবি আঁকার জন্য৷

কবি ওই সময় আঁকার কথা কানেই নেননি৷তবে দেশে ফিরে এসে কবি ছবি আঁকার দিকে ঝোঁকে যান এবং নিয়মিতই ছবি আঁকা শুরু করেন৷ ১৯৩০ সালে কবি যখন প্যারিস ভ্রমণ করেন, যাওয়ার সময় তাঁর আকা অনেকগুলো ছবি নিয়ে যান৷ আশা ছিল প্যারিসে ছবিগুলোর একটি প্রদর্শনী করবেন ৷ প্যারিসে পৌছার পর অনেক চেষ্টা করেও কবি কোন গ্যালারি ভাড়া করতে করতে পারলেন না প্রদর্শনীর জন্য৷ কারণ সবগুলো গ্যালারিই বুক করা ছিল৷

বুকিং করার জন্য একবছর আগেই চেষ্টা করতে হয়৷ তখন কবি খবর পেলেন যে ভিক্টোরিয়া প্যারিসে আছে, তাকে টেলিগ্রাম করে দিলেন৷ টেলিগ্রাম পেয়েই ভিক্টোরিয়া ছুটে এলো কবির কাছে৷ আর এসেই একটি গ্যালারী ভাড়া করে দিলেন কবিকে৷ ভিক্টোরিয়া ঐসময় না থাকলে কবির চিত্রপ্রদর্শনীই হতো না৷ প্রদর্শনী শেষে কবি ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ড রওয়ানা দেন৷ প্যারিসেই এই দেখাই তাদের জীবনের শেষ দেখা৷ কবির সাথে ইংল্যান্ড যাওয়ার জন্য কবি ভিক্টোরিয়াকে অনুরোধ করেন হয়তো ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ভিক্টোরিয়া যেতে পারেননি৷

https://www.mega888cuci.com