পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ছবি: শীর্ষ ১০ নারীকেন্দ্রিক নির্মাণ

পশ্চিমবঙ্গের বাংলা চলচ্চিত্রের ইন্ডাস্ট্রিতে বাণিজ্যিক ধারার চেয়ে শৈল্পিক ধারার সিনেমা বেশ সমৃদ্ধ। অবশ্যই উপমহাদেশের ধারা মেনে সেখানে পুরুষকেন্দ্রীক সিনেমাই বেশি নির্মিত হয়। তবে, নারীরাও খুব বেশি পিছিয়ে নেই। বেশ কিছু সংখ্যক নারীকেন্দ্রিক সিনেমা সেখানে বেশ দর্শকনন্দিত ও পুরস্কৃত হয়েছে। এরই মধ্যে সেরা ১০ টি সিনেমা নিয়ে আমাদের এই বিশেষ আয়োজন।

  • মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০)

দেশবিভাগের পর কলকাতায় শরণার্থী হয়ে আশ্রয় নেয় একটি পরিবার। সেই পরিবারের বড় মেয়ে নীতা, সংসারের হাল ধরতে হয় তাঁকে চাকরি করে। নানান দু:খ কষ্টের মাঝেও সে স্বপ্ন দেখে। কিন্তু দিনদিন কাছের মানুষ গুলোই তাকে দূরে ঠেলে দেয়। একদিন বড় ভাই শংকর বোম্বে থেকে বড় গায়ক হয়ে ফিরে আসে, কিন্তু ততদিনে সে অসুস্থ হয়ে গেছে। পাহাড়ের ওপর হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় নীতাকে।

জীবন-মৃত্যুর দোলাচলে এসে, শংকরকে জানায়, সে বাঁচতে চায়। আকাশে, পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনি হয় নীতার সেই আকুতি। শক্তিপদ রাজগুরুর মূল কাহিনীতে প্রখ্যাত নির্মাতা ঋত্বিক ঘটকের বিখ্যাত সিনেমা ‘মেঘে ঢাকা তারা’য় এভাবেই নীতার গল্প ফুটে উঠেছিল। নীতা চরিত্রে সুপ্রিয়া সেনের অনবদ্য অভিনয়ে দর্শকরা এখনো অশ্রুসজল হন, এটাই তাঁর সেরা সিনেমা বলে স্বীকৃত। এছাড়া অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন অনিল চট্টোপাধ্যায়, গীতা দে-সহ আরো অনেকে। ঋত্বিক ঘটকের বাকি দুটি ছবি কোমলগান্ধার ও সুবর্ণরেখা সহ এই তিনটি সিনেমাকে ট্রিলজি বলা হয়।

  • উত্তর ফাল্গুনী (১৯৬৩)

ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে দেবযানীকে বেছে নিতে হয়েছে বাঈজীর জীবন। কিন্তু তাঁর মেয়ে সুপর্ণাকে এই দু:সহ জীবন থেকে মুক্তি দিতে পাঠিয়ে দেন কনভেন্টে। সেইখানেই সুশিক্ষায় বড় হয় সুপর্ণা,অন্যদিকে ততদিনে দেবযানী হয়ে উঠে বিখ্যাত বাঈজী পান্না বাই। ড.নীহাররঞ্জন গুপ্তের উপন্যাস অবলম্বনে এক মা ও মেয়ের গল্প তুলে ধরেন পরিচালক অসিত সেন।

এই সিনেমায় মা ও মেয়ের দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। দুটি চরিত্রেই শক্তিশালী অভিনয় করে উনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন কেন উনাকে মহানায়িকা বলা হয়। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই সিনেমাটি পরবর্তীতে বলিউডে রিমেক হয় ‘মমতা’ নামে, সেখানেও অভিনয় করেছিলেন সুচিত্রা সেন, পরিচালক যথারীতি অসিত সেন।

  • মহানগর (১৯৬৩)

১৯৫০ এর দশকে কলকাতা শহরের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি সুব্রত মজুমদার। তাঁর স্ত্রী আরতি মজুমদারের দিন কাটে সাংসারিক কাজকর্ম করেই। পরিবারের আরো স্বচ্ছলতা আসার জন্য সবার অমতে চাকরিতে যোগদান করেন। হঠাৎ করে সুব্রতর চাকরি চলে গেলে আরতিই হয়ে উঠে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ – এ যেন গৃহবধূ থেকে সেলসপারসন হয়ে উঠার এক নারীর জীবন সংগ্রাম।

নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ছোটগল্প অবলম্বনে ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রবাদ প্রতিম পুরুষ সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেন ‘মহানগর’। আরতি মজুমদার চরিত্রে মাধবী মুখোপাধ্যায়ের অতুলনীয় অভিনয় এই সিনেমাটির সেরা প্রাণ, এছাড়া অভিনয় করেছেন অনিল চট্টোপাধ্যায়, জয়া ভাদুড়ী সহ আরো অনেকে।

  • একদিন প্রতিদিন (১৯৮০)

নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র অর্থনৈতিক অবলমম্বন বড় মেয়ে ‘চিনু’। একদিন রাতে অফিস থেকে বাড়ি ফেরে না, উৎকন্ঠা, আশংকা শুরু হয় চিনুর মার। কি হবে তাঁর সংসারের! বাবা কিছুক্ষণ পর পর রাস্তায় আসেন মেয়ের খোঁজে। মায়ের এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক সীমাবদ্ধতার উৎকন্ঠার কারণ ছোট মেয়ে মিনু বুঝতে পারে। চিনু কি ফিরে আসবে তাঁর পরিবারে, নাকি অন্য কিছু!

পুরো ছবিটাই এক রাতের জীবনপঞ্জী। এমনই প্রেক্ষাপটে নির্মিত হয় জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত সিনেমা ‘একদিন প্রতিদিন’। অমলেন্দু চক্রবর্তীর উপন্যাস অবলম্বনে ছবিটি নির্মাণ করেন ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন। চিনু চরিত্রে মমতা শংকর, মিনু চরিত্রে শ্রীলা মজুমদারের পাশাপাশি তাদের মায়ের চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেন গীতা সেন। অন্যান্য চরিত্রের মধ্যে বাবা চরিত্রে সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ও খুব ভালো করেছিলেন।

  • পরমা (১৯৮৫)

যৌথ পরিবারের লক্ষ্মী বৌমা মধ্যবয়সী পরমা। একবার দূর্গাপূজায় ভাসুরের ছেলের বন্ধু আলোকচিত্রশিল্পী রাহুলের সঙ্গে পরিচয়। রাহুল তাঁর মুখশ্রীর মধ্যে অন্য একটি জিনিস খুঁজে পেয়েছিল। স্বামীর অনুমতিতেই সে রাহুলের ক্যামেরায় ফটোসেশনের জন্য ঘুরতে যায়। এই ফটোসেশনে সে নিজেকে অন্যরুপে খুঁজে পায়, নিজেকে সে আরো বিশদ ভাবে জানতে পারে। মিসেস ভাদুড়ীর আড়ালে পড়ে থাকা পরমা নামটি যেন আবার খুঁজে পায়। ঘটনাপ্রবাহে সে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে রাহুলের সাথে, জানাজানি হলে মুহুর্তেই বদলে যায় দৃশ্যপট।

এতদিনের চেনামুখ গুলো অচেনা হয়ে উঠে, সিদ্ধান্ত নেয় আত্মহত্যার জন্য। সে বেঁচে যায়, তবে নিজেকে আর পরিবারের বন্ধনে থাকতে চায় না, মুক্তি পেতে চায়। চল্লিশ বছর বয়সী এক নারীর সঙ্গে এক তরুণের নিছক প্রেমকাহিনি এই ছবির বিষয়বস্তু নয় বরং নারীর আত্ম অনুসন্ধান এবং নিজের পরিচয়ে জীবন যাপনের আত্মবিশ্বাস অর্জন করার গল্প ছিল এই ছবিটি। প্রথিতযশা অভিনেত্রী ও নির্মাতা অপর্ণা সেনের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই ছবিতে পরমা চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছিলেন রাখী গুলজার।

  • শ্বেত পাথরের থালা (১৯৯২)

যৌথ পরিবারের বড় ছেলে অভিজিৎ এর বউ হয়ে আসলেন শিক্ষিতা ও সুন্দরী বন্দনা। মা, বাবা নেই। কাকার কাছে বড় হয়েছে। বন্দনার কোল জুড়ে আসে সন্তান অভিরুপ, ভালো ভাবেই সংসার কাটছিল বন্দনার, একদিন দুর্ঘটনায় মারা যান স্বামী অভিজিৎ। দুর্যোগ নেমে আসে বন্দনার জীবনে,বিধবার নিয়ম নিষ্ঠায় সে স্বাভাবিক ভাবে থাকতে পারে না। এই বেড়াজাল থেকে একদিন ছেলেকে নিয়ে কাকার সংসারে উঠে,চাকরি পায় বন্দনা। কাকাও একদিন মারা যায়, একাকী সংগ্রাম নিয়ে বড় করেন ছেলেকে।

ততদিনে অভিরুপ বড় হয়ে গেছে, প্রেমিকাও আছে। অভিরুপের শিক্ষক বন্দনা কে ভালোবাসেন। বন্দনা বুঝতে পারেন,কিন্তু সাড়া দেন না। অভিরুপের আধুনিকা প্রেমিকার সাথে বন্দনার সাথে মিলে না। একদিব সব দু:খ কষ্ট ভুলে পরিবার থেকে বেরিয়ে যায় সে। প্রভাত রায়ের জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত সিনেমা ‘শ্বেত পাথরের থালা’-এ ফুটে উঠেছিল বন্দনা নামক এক নারীর সংগ্রামের গল্প। বন্দনা চরিত্রে অপর্ণা সেন ছিলেন দুর্দান্ত,এছাড়া অভিনয়ে ছিলেন ইন্দ্রাণী হালদার, দীপঙ্কর দে, ভাস্কর, সব্যসাচী চক্রবর্তী, ঋতুপর্ণা-সহ আরো অনেকে।

  • দহন (১৯৯৭)

কলকাতায় মেট্রোরেলের স্টেশনের পাশে বখাটে ছেলের কাছে শারীরিক ভাবে নিগৃহীত হয় রমিতা,তাঁর স্বামী পলাশ ও আহত হয়। এমন সময় তাদেরকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে আধুনিকা ঝিনুক। শেষ অবধি এই ঘটনা পৌঁছায় আদালত পর্যন্ত। বখাটেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে ঝিনুক, কিন্তু সে কাছের মানুষ থেকেই বাধা পায়।

অন্যদিকে এই ঘটনার পর ঝিনুকের কাছেও তাঁর আপনজনেরা অচেনা হয়ে উঠে। ঝিনুক ও রমিতার পাশাপাশি যোগ হয় স্বেচ্ছায় বৃদ্ধাশ্রমে থাকা ঝিনুকের ঠাকুরমার জীবনবোধের গল্প। সুচিত্রা ভট্টাচার্যের সত্য ঘটনা নিয়ে রচিত উপন্যাস অবলম্বনে অকাল প্রয়াত নির্মাতা ঋতুপর্ণ ঘোষ নির্মাণ করেন অন্যতম সেরা সিনেমা ‘দহন’। ঝিনুক ও রমিতার চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে নেন ইন্দ্রাণী হালদার ও ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তা, আর ঠাকুরমার চরিত্রে ছিলেন সুচিত্রা মিত্র।

  • পারমিতার একদিন (১৯৯৯)

শনকা ও পারমিতা সম্পর্কে শ্বাশুড়ী- পুত্রবধূ। বয়স, চিন্তাভাবনায় পার্থক্য থাকলেও দু’জনে নিজেদের একসূত্রে গেঁথে ফেলেছিলেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে দুই জনের মাঝে গড়ে উঠেছিল বন্ধুত্ব, এমনকি পারমিতার বিচ্ছেদ হবার পরেও। শনকার শ্রাদ্ধের দিন পারমিতার সামনে ভেসে উঠেছিল নিজেদের অতীত ও বর্তমান।

সিনেমাটিতে শনকা চরিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি নির্মাতা ছিলেন গুণী অপর্ণা সেন, আর পারমিতা চরিত্রে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তা। দু’জনেই নিজেদের সেরাটা দিয়ে ছিলেন, সঙ্গে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছিলেন সোহিনী সেনগুপ্তা,পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার। একাধিক শাখায় জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত এই ছবিতে আরো অভিনয় করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

  • বাড়িওয়ালী (১৯৯৯)

নিসঙ্গ মধ্যবয়সী নারী বনলতা। এক বিশাল বাড়ির মালিক। সঙ্গী হিসেবে থাকে কয়েকজন গৃহপরিচারক।বাড়িতে আসে সিনেমার লোকজন, শূটিং করতে্। তাঁর একাকীত্বের মাঝে ফিরে এলো চঞ্চলতা। পরিচালকের সাথে গড়ে উঠে অন্যরকম সম্পর্ক।

এইরকম গল্প নিয়ে ঋতুপর্ণ ঘোষ নির্মাণ করেন ‘বাড়িওয়ালী’। এই ছবিতে অভিনয় করে কিরন খের ও সুদীপ্তা চক্রবর্তী জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে নেন।

  • বিসর্জন (২০১৭)

বাংলাদেশ- ভারতের সীমান্তের নদীতে নাসের নাম এক ভারতীয় মুসলমানকে অচেতন অবস্থায় পান বাংলাদেশের হিন্দু অকাল বিধবা নারী পদ্মা। বাড়িতে নিয়ে এসে সুস্থ করে তোলেন, নাসের আর পদ্মার মাঝে গড়ে উঠে সম্পর্কভ অন্যদিকে গণেশ মণ্ডলের দৃষ্টি পদ্মার দিকে, সেও ভালোবাসা দিয়ে পদ্মাকে পেতে চায়।

এই সময়ের সবচেয়ে প্রশংসিত নির্মাতা কৌশিক গাঙ্গুলীর জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত সিনেমা ‘বিসর্জন’ এ ফুটিয়ে তুলেছিলেন পদ্মার কাহিনী। প্রধান ভূমিকায় জয়া আহসান অভিনয় করে অত্যন্ত সমাদৃত হয়েছেন। এছাড়া গনেশ মণ্ডল চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন স্বয়ং পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলী।

https://www.mega888cuci.com