‘বোহেমিয়ান র‌্যাপসোডি’ জিনিসটা কি?

বোহেমিয়ান র‍্যাপসোডি কি শুধুই একটা গান? একটা মানুষকে খুন করে ফেলার পরে মায়ের কাছে এক অসহায় তরুণের চিঠি? নাকি এটা ফ্রেডি মার্কারী অথবা ফারুক বুলসেরার জীবনের হতাশাগুলোর একটা বহি:প্রকাশ? কেন একটা ১৯৭৫ সালের একটা রক গানের মধ্যে অপেরার মত একটা ‘অস্পৃশ্য’ জিনিস থাকবে? কেন মানুষ দিনের পর দিন এই গানটা শুনবে, আনন্দে, দু:খে, ভালোবাসায়? আর কেনইবা মিশরের ছেলে রামি মালেক বিশ্বের সামনে মাইক্রোফোনের মত তুলে ধরবে দ্য অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড – অস্কার ?

প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা প্রয়োজন। তাহলে গল্পটা শুরু করা যাক।

ফারুক বুলসেরার জন্ম হয় ১৯৪৬ সালে, জাঞ্জিবারে। আর দশটা অভিবাসী ইংরেজ ছেলের মতই হতে পারতো ফারুক, কিন্তু সে হতে চেয়েছিলো অন্য কিছু। সামনের দিকে বাড়ানো অদ্ভুত দাতের জন্য তাকে নিয়ে যখন মানুষ হাসাহাসি করতো, অদ্ভুত এক কণ্ঠ দিয়ে সে থামিয়ে দিতো মানুষকে। ফ্রেডি মার্কারী নামটি সে নিজেকে দিয়েছিলো, নিজে। এবং চার অক্টাভ ভোকাল রেঞ্জ নিয়ে, উদ্ভট এবং উদ্ধত পোশাক নিয়ে , কালজয়ী সব গান নিয়ে – ফারুক বুলসেরা হতে পেরেছিল যা সে হতে চেয়েছিল – একজন কিংবদন্তী।

১৯৭০ সাল। সেই সময়ে ফারুক বুলসেরা নামের এক অভিবাসী তরুণ নিজেকে খুজছিলো। নিজের গান, নিজের ব্যান্ড, নিজের পরিচয়। ‘স্মাইল’ ব্যান্ডের ভোকালের দলত্যাগ করা নিয়ে হতাশায় বসে ছিলে গিটারিস্ট ব্রায়ান মে আর ড্রামার রজার টেলর। এক অদ্ভুত পার্সী তরুন এসে তাদের প্রস্তাব দেয় দলে যোগদান করার। অদ্ভুত বেশভূষা আর উচু দাত দেখে প্রথমে হাসাহাসি করলেও তরুণের কন্ঠ শুনে চমকে ওঠে ব্রায়ান আর রজার। অনেক পরিকল্পণার পরে, প্র্যাকটিসের পরে তৈরি হয় পৃথিবীর মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির সফলতম একটি নাম – কুইন।

তারপর?

বাকিটা ইতিহাস। ইতিহাস গড়ার, ইতিহাস বদলে দেয়ার ইতিহাস। ভাঙা মাইক্রোফোন স্ট্যান্ড হাতে রক এন রোলের মাঝে অপেরার অনুপ্রবেশের ইতিহাস। এক বোহেমিয়ান অভিবাসী সমকামী যুবকের কিংবদন্তী হয়ে ওঠার ইতিহাস।

Nothing really matters, anyone can see

Nothing really matters

Nothing really matters to me

ফ্রেডি মার্কারীর জীবনে জনপ্রিয়তা এসেছিলো নদীর স্রোতের মত, কিন্তু ফ্রেডি যতোই বিখ্যাত হয়েছে, ততোই সে নি:ঙ্গ হয়ে পড়েছিলো। তার জীবনে প্রেম এসেছিলো মেরি অস্টিনের সাথে, সে প্রেম বন্ধুত্ব হয়ে সারাজীবন ছিলো পাশে কিন্তু তাও তাকে পূর্ণতা দেয়নি। রক ব্যান্ডের সেই মহাযুগে, ফ্রেডি ঘোষণা করে সে কোন জানরে নিজেকে বেধে রাখতে চায়না।

সে চায় অন্যরকম কিছু, অপেরার বিশুদ্ধতাকে নিয়ে আসতে রক এন রোলের মাঝে। সে সারাজীবন খুজে গেছে নিজেকে, আর একটি উদ্ভট ট্র্যাক, যেটা সে পিয়ানোতে বাজিয়ে চলেছিলো ১৯৬০ সাল থেকে – পূর্ণতা পায় ১৯৭৫ সালে। প্রোডিউসার নামটাও ঠিকমতো পড়তে পারেনা – বোহেমিয়ান র‍্যাপসোডি। সে ঝুকি নিতে চায়নি এই প্রথাভাঙা গান নিয়ে। ফ্রেডি তাঁর টেবিলে ঝুকে বলে – ‘দিস ইজ আ মাস্টারপিস’।

পৃথিবীর সকল বোহেমিয়ান মানুষদের গান, ফ্রেডি মার্কারীর নিজের জীবনের গান, কোন জানরে যে গানকে বেধে রাখা যায়না। কেউই জানতোনা, যে গানটিতে অতিরিক্ত দীর্ঘ হবার কারণে রেডিও বাজাতে চাইবে না, সেটিই একসময় হয়ে উঠবে পৃথিবীর সর্বকালের সর্বসেরা গানগুলোর একটি।

ফ্রেডি ছিলো প্রথাবিরোধী। আজন্ম বিদ্রোহী এই মানুষটি তাই কখনো লজ্জায় পায়নি নিজের উচু দাত নিয়ে হাজার হাজার মানুষের সামনে গাইতে। ‘প্রথাবিরোধী’ এবং প্রায় ‘অশালীন’ পোশাকে ব্রিটিশ সমাজে একের পর এক কনসার্ট করতে। নিজের ভালোবাসার মানুষের কাছে নিজের সমকামীতা স্বীকার করতে এবং সর্বোপরি, কোন ধাচে নিজের গানকে আটকে না রেখে অসাধারণ সব ট্র্যাকের জন্ম দিতে। I want to break free – শুরু একটা গানের লিরিকই ছিলো না, ছিলো ফ্রেডি মার্কারীর জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য।

কিন্তু, এরই মাঝে ফ্রেডি যতোটা বিখ্যাত হয়েছে, ততোটাই নি:সঙ্গ হয়েছে । সে তার পরিবারকে সাথে পায়নি, যে মেয়েটিকে ভালোবেসেছিলো, তাকে ভুলতে পারেনি সে, অস্বীকার করতে পারেনি নিজের সমকামীতাকে, মদ আর নেশায় নিজের ব্যান্ডের সদস্যদের সাথে তৈরি দূরত্বকে। কুইন একটা ব্যান্ড ছিলো না শুধু, ছিলো তার একমাত্র ঠিকানা, যেখানে গেলে ফ্রেডি নিজেকে খুজে পেত। কনসার্টের স্টেজ ছিলো ফ্রেডির একাত্নতার একটা জায়গা, যেখানে হাজার হাজার মানুষ তার কন্ঠে কন্ঠ মেলাতো – We will We will rock you

কুইন জানতে পারে ১৯৮৫ সালের ১৩ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে স্মরণকালের সেরা এক শো, লাইভ এইড কনসার্ট, আফ্রিকার অনাহারী মানুষদের জন্য চ্যারিটি শো হিসেবে। তার বন্ধুরা তৈরি হয়, এবং ফ্রেডি মার্কারী পৃথিবীর মিউজিক ইতিহাস আবার নতুন করে লেখায় সেই কনসার্টে, অনেকের বিচারেই যেটি পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রক কনসার্ট। সেই সময়ে, প্রায় ২ বিলিয়ন মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে ফ্রেডি একের পর এক গাইতে থাকে কুইনের এক একটা ট্র্যাক। এক হাত মুঠো করে ফ্রেডি যখন গাইতে থাকে ‘ We are the Champions’, খুব কম মানুষই আছে যারা নিজেকে সামলাতে পেরেছিলো। বোহেমিয়ার র‍্যাপসোডির সাথে সুর মেলায় লক্ষ কন্ঠ –

Is this the real life? Is this just fantasy?

Caught in a landslide, no escape from reality

এই বাস্তবতা থেকে রেহাই মিলেনি ফ্রেডির। কনসার্টের পরপরই অসুস্থ হয়ে পড়ে সে, জানতে পারে ঘাতকব্যাধি এইডস তাকে শেষ করে দিয়েছে, হাতে সময় বাকী নেই বেশি। মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে একটা পাবলিক স্টেটমেন্ট দিয়ে যায় সে, সেখানে স্বীকার করে নেয় সারা বিশ্বের কাছে যে সে এইডসে আক্রান্ত। নিজের দেহভস্মের মালিকানা ফ্রেডি দিযে যায় প্রেমিকা ও সারা জীবনের প্রিয়তম বন্ধু মেরি অস্টিনকে। ২৪ নভেম্বর ১৯৯১, মৃত্যু ঘটে পৃথিবীর অন্যতম প্রতিভাবান এই বোহেমিয়ান মানুষটির।

Too late, my time has come

Sends shivers down my spine, body’s aching all the time

Goodbye, everybody, I’ve got to go

Gotta leave you all behind and face the truth

Mama…

I don’t wanna die

I sometimes wish I’d never been born at all

কৃতজ্ঞতা: শামীম শরীফ সুষম

https://www.mega888cuci.com