বিজয় সেথুপাথি: রিটেইল স্টোরের সেলসম্যানের আকাশ ছোঁয়ার গল্প

‘ছোটবেলা থেকেই আমি নিম্ন সাধারণ মানের স্টুডেন্ট ছিলাম। এমনকি আমার না খেলাধুলাতে কিংবা এক্সট্রা-কারিকুলাম বলতে যা বোঝায় ঐসবের প্রতি কখনোই কোন প্রকার আগ্রহ ছিলো না।’

কথাটা আমার না, বিজয় সেথুপাথির। একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে যেমন হয় ঠিক তেমনই। এই ঘরের ছেলেদের যেমন বেশিরভাগ স্বপ্নের গণ্ডি থাকে পরিবারের সবার দায়িত্ব নিয়ে কিভাবে সেসব পালন করবে সে ব্যাপারে। দারিদ্র যখন চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে তখন নাকি ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়?

আর মধ্যবিত্ত ছেলেদের ভালোবাসা, স্বপ্ন আরো যা যা আছে সব জানালা, দরজা যেদিক দিয়ে ফুটো পায় ঐদিক দিয়েই জীবনের তরে পালিয়ে যায়। অনেক সময় ব্যাপারটা এমন যে এতোসব দায়িত্ব কর্তব্য চিন্তার মাঝে বাকি স্বপ্ন দেখার সময়ই থাকে না। সেথুপাথির গল্পটা সেরকম।

ধানরাজ বৈদ জৈন কলেজ থেকে ব্যাচেলর্স অব কমার্স ডিগ্রী নেয়ার সময় নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেকেই বহন করতে হতো। এটা করতে গিয়ে কখনো রিটেইল স্টোরে সেলসম্যান, ফাস্ট ফুডের ক্যাশিয়ার কিংবা ফোন বুথের অপারেটর হিসেবে কাজ করতে হয়েছে। কলেজ থেকে ডিগ্রী নেয়ার সপ্তাহখানেকের মধ্যে একটা হোল সেলস সিমেন্ট বিজনেসের অ্যাসিস্ট্যান্ট একাউন্ট্যান্ট হিসেবে যোগ দেন। কারণ, বাকি তিন ভাই-বোনের দেখভাল যে তাঁকেই করতে হতো তখন।

কিন্তু, যে বেতন পেতেন তা দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব হয়ে উঠছিল না। এমন অবস্থায় পরিবার ছেড়ে দুবাই পাড়ি দেন সেই একই একাউনট্যান্টের কাজ করতে। পার্থক্য শুধু দুবাইতে গিয়ে চারগুন বেশি বেতন পেতেন।

দুবাইয়ে কাজ করতে করতেই একটা অনলাইন ডেটিং সাইটে খুঁজে পান জেসি নামের এক মেয়েকে। দুবাইতে বছর দুই কাজ করার পর কাজের প্রতি আর মন টানতেছিলো না। এদিকে ভালোবাসার মানুষ জেসি নিজেও থাকে কেরালাতে, পরিবারও এই দেশে। সব কিছু মিলিয়ে ২০০৩ সালে ফিরে আসেন।

ফিরে এসে বিয়ে করেন জেসিকে। দেশে এসে আর চাকরির দিকে মন দেননি। এসে ছোটখাটো ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের ব্যবসা শুরু করলেন বন্ধুদের সাথে। সাথে একটা মার্কেটিং কোম্পানিতে জয়েন করেন যাদের কাজ ছিলো রেডিমেইড চিকেন প্রোডাক্ট। এই রেডি মেইড চিকেন সরবরাহ করতো ‘কুঠুপাত্তারাই’ নামের একটা থিয়েটার গ্রুপকে।

এখানেই পরিচালক বালু মহেন্দ্র সেথুপাতি কে দেখে বলেন, ‘তোমার ফেইস তো খুব ফটোজেনিক, তুমি সিনেমায় কাজ করো না কেনো?’ উত্তরে শুধু হাসি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরিচালক ছিলেন নাছোড়বান্দা। ওনার চাপেই বলেনম কিংবা মোটিভেশনেই আমরা আজকে বিজয় সেথুপাতির নামের একজন ন্যাচারাল অভিনেতাকে পেয়েছি।

শুরুর দিকে শুধুমাত্র ব্যাকগ্রাউন্ড অভিনেতা হিসেবেই কাজ পেতেন তিনি। আস্তে আস্তে খুবই ছোট ছোট সাপোর্টিং রোল (কোন দৃশ্যের মধ্যে একজন সাধারণ দর্শক, ফুটবল কিংবা কাবাডি দলের পেছনের সারির কেউ একজন) করে যাচ্ছিলেন। এভাবেই কেটে যায় বছর পাঁচ।

এভাবে করতে করতে নিজের প্রথম লিড রোলের সিনেমার করেন ২০১০ সালে ‘ঠেনমেরকু পারুভাকাত্রু’ নামের সিনেমাতে। কিন্তু নিজের অভিনয়ের জাত চেনান ২০১২ সালের সিনেমা ‘পিজ্জা’ দিয়ে। ওই পিজ্জা বয়ের চরিত্র দিয়ে রীতিমত ঝড় তোলেন তিনি। এরপর আর সেভাবে পিছিয়ে থাকতে হয়নি তাঁকে।

এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫ টির বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি যার মধ্যে নিজের নামের সিনেমাও করে ফেলেছেন। দর্শকের মনে এক আলাদা অবস্থা করে নিয়েছেন তিনি তার ন্যাচারাল অভিনয় দিয়ে। তার করা চরিত্রগুলোকে তিনি সহজেই দর্শকের মধ্যে জায়গা নিয়ে নেন। দর্শকরা খুব দ্রুত ও খুব সাবলীল ভাবেই রিলেট করতে পারে বিজয় সেথুপাতির অভিনয় দিয়ে।

একজন সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলের রিটেইল স্টোরে সেলসম্যান, ফাস্ট ফুডের ক্যাশিয়ার, ফোন বুথের অপারেটর, এসিস্ট্যান্ট একাউন্ট্যান্ট, বিদেশে পাড়ি, অনলাইন প্রেম, ঘরে ফেরা, আবার ব্যবসা কিংবা চাকুরিজিবী থেকে তামিল সিনেমার অন্যতম পপুলার অভিনেতা হওয়ার গল্প নিয়ে বায়োপিক সিনেমার যুগে বিজয় সেথুপাথির জীবন নিয়ে বায়োপিক হতেই পারে! আর হলে নাম হবে ‘সেথুপাথি দ্য রিলেটেড অ্যাক্টর’।

 

https://www.mega888cuci.com