৩ নং ময়রা স্ট্রিট: উত্তম-সুপ্রিয়ার প্রেমের তীর্থ

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

কেমন আছে উত্তম-সুপ্রিয়ার সংসার? কেমন আছে উত্তম-সুপ্রিয়ার বাড়ি?

তিন নং ময়রা স্ট্রিট, কলকাতা। রাস্তাটার সামনে দাড়ালে মনে হয় এই রাস্তা দিয়েই কতবার গেছেন উত্তম কুমার সুপ্রিয়া দেবী। কখনও এই পথে এসছেন সুচিত্রা সেন থেকে রাজেশ খান্না, কিশোর কুমার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র নাম বলে শেষ হবেনা।

উত্তম-সুপ্রিয়ার তীর্থক্ষেত্র। প্রেম-বিরহের সাক্ষী।

ইসকন মন্দির পার হয়ে যে রাস্তা বিড়লা স্কুলের পাশ দিয়ে ঢুকে গেলেই এই ময়রা স্ট্রীট। খুঁজতে থাকলাম কোথায় সেই বাড়ি উত্তম কুমারের বাড়ি। যারা নতুন জানছেন তাদের জানিয়ে রাখি গিরিশ মুখার্জ্জী রোডে উত্তমের মূল বাড়ি। ময়রা স্ট্রিটের বাড়ি উত্তম সুপ্রিয়ার ভালোবাসার বাড়ি। ভালোবাসার এক নম্বর দু নম্বর হয় কি!

উত্তম ও সুপ্রিয়া

একটু হাঁটতেই ডান হাতে পড়ল তিন নং ময়রা স্ট্রিট। উত্তম কুমারের বাড়ি। সবুজ গাছগাছালির দেওয়াল। এখানেই একসময় ১৯৮০ সাল অবধি প্রযোজক পরিচালকদের ভিড় লেগে থাকত। সাংবাদিকদের মূল আকর্ষন ছিল এই বাড়ি। কাঠের সিড়ি দিয়ে উঠে গেলে পড়ত উত্তম সুপ্রিয়ার ফ্ল্যাট।

সেখানে ময়ূরপুচ্ছ ধুতি পাঞ্জাবী পরে সুগন্ধী গায়ে উত্তম কুমার ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আড্ডা দিচ্ছেন। আর সুপ্রিয়া দেবী জামদানীতে স্লিভলেস ব্লাউজে সাহায্যকারিনী তারা কে বলছেন রান্নার রেসিপি। ভেসে আসছে সুপ্রিয়ার রান্নার গন্ধ। সঙ্গে সুপ্রিয়া দেবী ঘাড়ের কাছে একটা সেন্ট মাখতেন। সেই মিশ্রিত গন্ধ।

অঞ্জনা ভৌমিক থেকে ললিতা চ্যাটার্জ্জী, প্রযোজিকা রত্না চ্যাটার্জ্জী সবার আড্ডাস্থল এই বাড়ি। বড় হল ঘরে চলত পার্টি পাহাড়ি সান্যাল থেকে সুপ্রিয়ার দিদিরাও আসতেন।

একটা বড় হল ঘরে পার্টির পর ছোটো রুমে চলত খুব কাছের লোকদের নিয়ে গানের আসর। সেখানে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতেন উত্তম। আবার মাথায় রুমাল দিয়ে নাচতেন খেমটা নাচ।

স্মৃতিবিজরিত সেই বাড়ির বর্তমান চিত্র

অনেকেই হয়তো জানেন নাহ নায়িকা আলপনা গোস্বামীও এই বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। সদ্য কলকাতায় আলপনা তখন। বিশ্বরূপায় নাটক করেন। প্রথমদিনই উত্তম কুমার তাঁকে লিফট দেন৷ সেইদিন থেকেই দাদা-বোনের সম্পর্ক তাঁদের৷ সুপ্রিয়া দেবীই প্রথম টালিগঞ্জ পাড়ায় তোলেন সুন্দর মতো মেয়ে আলপনার নাম।

লক্ষী পুজোর ভোগ থেকে রাত পার্টির খাওয়া দাওয়া যা যা হত এ বাড়িতেই সবটাই বেনুদির হেঁশেলের। সুপ্রিয়া যেন এ বাড়ির অন্নপূর্ণা। কেউ শুধু মুখে ফিরে গেছেন এমন হয়নি।

উত্তম পুত্র গৌতম, তরুণ কুমার, সুব্রতা সবাই আসতেন এই বাড়িতে। সুপ্রিয়া দেবীর কথায় সুচিত্রা সেন এসছেন কয়েকবার।

ঢুকলাম গেট খুলে বাড়ির ভিতর। ভাবলাম এই গেট দিয়েই ঢুকতেন উত্তম কুমার। সামনে বসেছিল কয়েকজন দাড়োয়ান, কেয়ারটেকার। তাদের জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটাই তো উত্তম কুমারের বাড়ি!’ একজন হিন্দিতে বলল ‘থা…’! সাথে একটা দীর্ঘশ্বাস।

রাতের পার্টিতে

এবার আসল গল্প বলি, ওদের থেকে যা জানলাম। এ বাড়ি আর নেই উত্তমের বাড়ি। এখন ‘পাতোদিয়া হাউজ’ নাম। থাকার এলাহী হোটেল এখন। শুধু ঠিকানাটা রয়ে গেছে – তিন নং ময়রা স্ট্রিট, গেটের সামনে।

ওরাই বললো, আগের বাড়ি যেটা উত্তমের বাড়ি ছিল পুরো ধুলিসাৎ করে ভেঙে ফেলে এই হোটেল তৈরী হয়েছে। কোনো স্মৃতিচিহ্নই নেই। অনেকে এ পথ দিয়ে হেঁটে গেলে ভাবেন এই বাড়িটাই সেই বাড়ি। নাহ এটা নতুন। কিছু আদলে মিল থাকতে পারে। কিন্তু সেই ইঁট কাঠ চুন সুরকি যা উত্তম সুপ্রিয়ার স্পর্শ পাওয়া সেসব আর নেই।

ঐ পাতোদিয়ার লোকরাই বললো, ‘সেসব আর কেউ রাখে নাকি। আমাদের মালিক রাখেননি। ছবিও নেই এখানে। এ যা দেখছেন নতুন। মাঠ করে দিয়ে নতুন করে হয়েছে। উত্তম কুমার বাড়ি বলেই যদিও বিখ্যাত। কিন্ত সেসব স্মৃতি আর নেই।’

শুধু জমিটাই রয়ে গেছে। ওখানকার কিছু বয়স্ক চা ওয়ালা, ধোপাওয়ালা এরা কজন উত্তমকুমার সুপ্রিয়াকে দেখতেন এ বাড়িতে কিন্তু নতুন রা বেশীর ভাগই মাড়োয়ারী তাদের কোনো উন্মাদনা নেই। কলকাতা হারাচ্ছে তার বাঙালিয়ানা।

আলো আঁধারী প্রেম গাথা উত্তম-সুপ্রিয়ার সাথে সাথেই হারিয়ে গেছে। তবু জায়গাটায় দাড়ালে রাস্তাটায় দাড়ালে কিরকম মনে হয় উত্তম-সুপ্রিয়া দের স্পর্শ করা হয়।

https://www.mega888cuci.com