উত্তম-সুচিত্রার মাঝে কি প্রেম ছিল!

সুচিত্রা সেন বাংলা চলচ্চিত্রের সেই চিরসবুজ নায়িকা, যার বয়স ঐ পর্দার ছবিতেই আজো স্থির হয়ে আছে। তাঁর বাঁকা ঠোঁটের হাসিতে যে কত তরুণের হৃদস্পন্দন বাড়িয়েছেন, তা এতো দিন পরও বাঙালির মুখে মুখে ফেরে। তাঁর মুগ্ধতাকে আকণ্ঠ গ্রহণ করেছে দর্শকসমাজ।

২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি ভারতীয় সময় সকাল ৮টা ২৫ মিনিট নাগাদ কলকাতার বেল ভিউ হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সুচিত্রা সেনের মৃত্যু হয়। আজো আলোচনার বিষয় হয়ে আছেন সুচিত্রা।

বিশেষণ প্রিয় বাঙালির কাছে বরাবরই মহানায়ক উত্তম কুমার। আর মহানায়িকার আসনটা সুচিত্রা সেনের দখলে। কি কি গুনের জন্য একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রীর নামের পাশে মহানায়ক বা মহানায়িকার তকমা লেগে যায় সেই প্রশ্ন নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ তো দূরের কথা, সামান্য তর্কেও সামিল হতে বাঙালীর প্রচন্ড অনীহা। আর উত্তম-সুচিত্রা জুটি? এ তো চিরন্তন প্রেমের প্রতীক। রোমান্টিসিজমের একেবারে শেষকথা।

১৯৮০ সালেন ২৪ জুলাই ইহলোক ত্যাগ করেন উত্তম কুমার। আর তখনই লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান সুচিত্রা সেন। জনপ্রিয়তার ব্যারোমিটারে আজো এই জুটিকে ছুঁতে পারেনি অন্যকোন নায়ক নায়িকা। তাহলে কী ছিলো উত্তম-সুচিত্রার রোমান্টিক রসায়নে? সত্যি জীবনের ভালোবাসা নাকি রোমান্টিসিজমের ম্যাজিক?

উত্তম কুমার আর সুচিত্রা সেনের প্রসঙ্গ এলেই বাঙালি ভক্তরা এই দুই তারকার ব্যক্তি জীবনের ভালোবাসার খোঁজে জাল ফেলেন রহস্যের পুকুরে। সত্যিই কি তেমন কিছু ছিলো তাদের জীবনে? মিসেস সেন কী ভালোবাসতেন উত্তম কুমারকে? নাকি উত্তম বাবুর ভালোবাসা কখনো আশ্রয় খুঁজতে চেয়েছিল তাঁর কাছে?

উত্তম কুমারের মতো বহুমুখী চরিত্রে অভিনয় করেননি সুচিত্রা সেন। মূলত রোমান্টিক চরিত্রেই তাঁকে অভিনয় করতে দেখেছে বাঙালি। ২৯টি ছবিতে সুচিত্রা সেন হয়েছেন উত্তম কুমারের নায়িকা। ‘সপ্তপদী’ ছবিতে অভিনয় করেই বাংলা সিনেমার সর্বকালের সেরা জুটি হয়ে এগিয়ে গেছেন উত্তম-সুচিত্রা। এতটাই সফল জুটি যে আজও ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গানের দৃশ্যায়ন বাংলা সিনেমার সেরা রোমান্টিক দৃশ্য হিসেবে স্বীকৃত।

বসুশ্রী সিনেমা হলের মালিক মন্টু বসুর কথায়, এই জুটির হাত ধরেই অগ্রিম টিকিট কাটার চল শুরু হয়। আমরা তিনদিনের অগ্রিম টিকিট দিতাম। তাতেও দর্শকদের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতাম।আর আজও এই জুটি নিয়ে উন্মাদনা এতটুকুও কমেনি। এটা কিন্তু একটা গবেষণার বিষয়।

এই জুটির রোমান্টিক রসায়নে কার অবদান বেশি এ নিয়েও তর্ক হতে পারে।তবে উত্তম কুমার নিজেই স্বীকার করেছেন, ‘সুচিত্রা সেন না থাকলে উত্তম কুমারের জন্মই হতো না।’

সপ্তপদী সিনেমার একটি দৃশ্য
  • উত্তমের সাফল্যের চাবি ছিলেন সুচিত্রা

প্রযোজকরা একসময় উত্তম বাবুকে ফ্লপ মাষ্টার জেনারেল বলতেন। তবে কোন প্রতিবাদ করেননি উত্তম। ক্যারিয়ারের বারোটা প্রায় বেজেই যাচ্ছিলো। উত্তম তখন বলেছিলেন, বারোটা তো বাজছিলোই, কিন্তু রমা এসে আমাকে বাঁচিয়ে দিলো। সুচিত্রার সঙ্গে নিজের রসায়নের ব্যাখ্যায় উত্তম বলতেন,তাঁর আগে অন্যকোন নায়িকার সঙ্গে প্রেমের ডায়লগ বলতে গিয়ে মনের মধ্যে কোন উত্তাপবোধ করতাম না। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে সুচিত্রা সেন নামে এক নায়িকার সঙ্গে অভিনয় করতে গিয়ে বুঝতে পারলাম আমার নায়িকা এসে গিয়েছে।

  • পারিশ্রমিক নিয়ে ইগো ছিল

একসময় কোন একটা বিষয় নিয়ে উত্তমের সঙ্গে মনোমালিন্য হয়েছিলো সুচিত্রার। আর সে কারণেই তাঁদের জুটি তুঙ্গে থাকা অবস্থাতেই জুটি ভেঙে বেরিয়ে আসেন সুচিত্রা। উত্তম কুমার ছাড়াও যে তার একটা আলাদা দর্শকপ্রিয়তা আছে, এটাই প্রমান করতে চেয়েছেন তখন। ‘দীপ জ্বেলে যাই” ও ‘হসপিটাল’ ছবিতে অভিনয় করেন বসন্ত চৌধুরী ও অশোক কুমারের সঙ্গে।

বানিজ্যিক দিক দিয়ে সেখানেও সফল হন তিনি। ইন্ডাস্ট্রিতে এভাবেই সুচিত্রা সেন হয়ে উঠেছিলেন অনন্য। তখন ‘সপ্তপদী’ ছবিতে রিনা ব্রাউন চরিত্রে সুচিত্রা ছাড়া আর কারো কথাই মাথায় আসছিলো না পরিচালক অজয় কর এবং সহ- প্রযোজক উত্তম কুমারের। অগত্যা উত্তম স্বয়ং ফোন করেন সুচিত্রা সেনকে।সুচিত্রাও যেন উত্তমের এই ফোনটার অপেক্ষাতেই ছিলেন।

উত্তম-সুচিত্রা

তাই ফোন পেয়ে রিনা ব্রাউন চরিত্রে এক কথাতেই রাজি হয়ে যান সুচিত্রা সেন। চিত্রনাট্যও পড়ে দেখতে চাননি। এমনি ছিলো তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক। আর তারকাসুলভ ইগো তো ছিলোই। সেই ইগোর জায়গা থেকেই হয়তো সুচিত্রা বরাবর তার পারিশ্রমিক রাখতেন উত্তমের চাইতে বেশি।

  • প্রেম নাকি স্রেফ বন্ধুত্ব?

সমস্ত বাঙালি মনে বিরাট কৌতুহল, সুচিত্রা সেন কি উত্তম কুমারকে ভালোবাসতেন? সুচিত্রার সঙ্গে ব্যাক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে কোনো একবার মহানায়ক বলেছিলেন, ‘রমার (সুচিত্রা সেন) সঙ্গে একটা ইমোশনাল এটাচমেন্ট তো আমার চিরকালই আছে।’ আর সুচিত্রা সেন বলেছিলেন, ‘উত্তমের উপর নানা ব্যাপারে আমি নির্ভর করি।’

সে নির্ভরতা অবশ্য সুচিত্রার উপরও উত্তমের নেহাৎ কম ছিলো না। তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে সুচিত্রার অন্তরঙ্গ বন্ধু ও সাংবাদিক গোপাল কৃষ্ণ রায় তাঁর বইতে লিখেছেন, ‘২৯ টি ছবি করার পর একে অপরের প্রতি অনুরাগ তৈরী হওয়াটা তো খুবই স্বাভাবিক। সুচিত্রা উত্তমকে উতু বলে ডাকতো। ওদের মধ্যে প্রায়শই গভীর রাত পর্যন্ত ফোনালাপ চলতো। একদিন তো দেখলাম সুচিত্রা উত্তমকে ফোনেই কিস করে বসলো। তবে এটাও ঠিক উত্তম যখন বাড়ি ছেড়ে চলে এলেন তখন কিন্তু সুচিত্রার বাড়ি যাননি। গিয়েছিলেন সুপ্রিয়ার বাড়ি। তবে একটা কথা রমা প্রায়ই বলতো, আমি সারাজীবন অনেকের সঙ্গেই কাজ করেছি কিন্তু উত্তমের মতো নায়ক আর একটিও পেলাম না।’

ব্যক্তিজীবনে উত্তম সুচিত্রার সম্পর্ক কেমন ছিল। এ ব্যাপারে উত্তম কুমারের ছেলে গৌতমকে জিজ্ঞেশ করা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘তাদের সম্পর্ক আসলে কেমন ছিল তা বলে বোঝানো যাবে না, তাদের সম্পর্ককে বলা যেতে পারে প্রেম ভালবাসার সীমার বাইরের কোন কিছু আবার নিছক বন্ধুতাপূর্ণ তাও হয়ত নয়।’

একবার তার ছোট বেলায় তার বাবা ড্রিংস করছিলেন আর তাকে বলেছিলেন শুটিং প্যাক আপ হয়ে গেলে একদিন তিনি আর সুচিত্রা লং ড্রাইভে শহর ছাড়িয়ে অনেক দূরে চলে যান। এক স্থানে গাড়ি থামিয়ে দুই জনে নীরব কিছু সময় কাটান তারপর আবার ফিরে আসেন।

এরকমই ছিল তাদের সম্পর্ক। এটা কারও কাছে মনে হতে পারে রোমান্টিক সম্পর্ক, কে মনে করতে পারে ভালো বন্ধুত্তের সম্পর্ক, কিংবা পরস্পরের প্রতি মানবিক ভালবাসা, শ্রদ্ধাবোধ বলতে যা বোঝায় সেটা, যে যেমনটা ভেবে নিতে পারে আবার নাও পারে – যা আসলেই অনেকের কাছে ধোঁয়াশা।

  • সুচিত্রার দুষ্টুমি

দুষ্টুমিতেও সুচিত্রা কম যেতেন না। উত্তম-সুচিত্রা জুটির শেষ ছবি ‘প্রিয় বান্ধবী’র সেটে একদিন আচমকাই হাজির সুপ্রিয়া দেবী। মাত্র সুচিত্রা-উত্তমের একটা দৃশ্য টেক করা হবে। পরিচালক অ্যাকশন বলতে যাবেন এমন সময় কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে সুচিত্রা আচমকা জড়িয়ে ধরেন উত্তমকে। প্রগাঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করেন তাঁর নায়ককে। তারপর মৃদু হেসে সুপ্রিয়া দেবীকে বলেন, ‘কিরে বেনু তোর হিংসা হচ্ছে না?’

ইউনিটের সবাই হতবাক। এরকম একটা ব্যাপার ঘটবে তা কেউ আন্দাজও করতে পারেনি। উত্তম কুমার থতমত খেয়ে গেলেন। সুপ্রিয়া দেবীরও তেমনি অবস্থা। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন, ‘হিংসে কেন হবে রমাদি? আমরা তো ছোটবেলা থেকেই দেখছি উত্তম-সুচিত্রা।এরকম রোমান্টিক সিন দেখে আমরা অভ্যস্ত।’

তবে কি এই কারিশমা ধরে রাখতেই উত্তম কুমারের অকাল মৃত্যুর পর সুচিত্রা সেন রূপালী পর্দার জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন? এমন প্রশ্নের উত্তর কখনও মিসেস সেনের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি।

উত্তম কুমারের মৃত্যু সুচিত্রার মনোজগতে এক আলোড়ন তুলেছিলো। যেদিন উত্তম কুমার মারা যান সেদিন ফোন পেয়ে চুপ করে রিসিভার ধরে বসেছিলেন সুচিত্রা সেন।রাত দু’টা অবধি কোন কথা বলেননি। সারাদিন ঘরেই ছিলেন। গভীর রাতে শহর যখন নীরব, সবাই যখন প্রিয় মহানায়ককে শেষ বিদায় জানিয়ে ঘরে ফিরে এসেছে, তখন নিভৃতে দেখা করতে গেলেন সুচিত্রা। ভবানীপুরে উত্তম কুমারের পৈতৃক বাড়িতে গিয়ে ছবিতে মালা পরিয়ে শেষ সাক্ষাৎটুকু করলেন। কেউ কেউ উত্তমের মৃত্যুকেও সুচিত্রার অন্তরালের কারণ বলে দাবি করেন।

উত্তম কুমারের মৃত্যু পর তরুণ কুমার সুচিত্রা সেনকে নিয়ে একটা ছবির পরিকল্পনা করেছিলেন। প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন সুচিত্রা সেনের কাছে। সব শুনে সুচিত্রা বলেছিলেন,বুড়ো, উতু যেখানে চলে গিয়েছে সেখান থেকে কি ওকে ফিরিয়ে আনতে পারবি? যদি পারিস সেভাবেই চিত্রনাট্য কর, আমি কাজ করবো।

মান-অভিমান,রাগ-অনুরাগ, ইগো যত কিছুই এই উত্তম-সুচিত্রা জুটির ভিতর কাজ করুক না কেন তাঁদের সম্পর্ক ছিলো যতটা ভালোবাসার ঠিক ততোটাই শ্রদ্ধার। তাইতো একটা সময় স্বয়ং উত্তম কুমারই বলতেন, তাদের জুটির নাম উত্তম-সুচিত্রা নয় সুচিত্রা-উত্তম।

কৃতজ্ঞতা: আবিদা নাসরীন কলি

 

https://www.mega888cuci.com