উত্তম কুমার: সুপার স্টার নাকি আর্টিস্ট?

বাঙালির রোমান্টিসিজমের এক এবং অদ্বিতীয় স্রষ্টা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ। তাঁর অমর সৃষ্টি চিরপরিচিত সাহিত্যের গণ্ডি পেরিয়ে প্রভাব বিস্তার করেছিল সমাজ কাঠামোর প্রতিটি রন্ধ্রে, জনমানস দীক্ষিত হয়েছে প্রেমের নতুন ছন্দে, ব্যক্তিসত্ত্বায় নেমে এসেছে বিশ্বসত্ত্বার অনন্ত চেতনা।

ছায়াছবি জগতেও রবীন্দ্রসৃষ্টি নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, সে স্বর্ণযুগের সাদাকালো ছায়াছবিই হোক বা একালের রঙিন ছায়াছবির ক্ষেত্রেই হোক রবীন্দ্রসৃষ্টি বহুকাল আগে থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। তবে ছায়াছবিতে এমন ভাবনা বলবৎ করলেই যে তা দর্শকসমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে সেটি মনে করা একটি দিবাস্বপ্নের মতন।

ভাবনা গুলিকে ছায়াছবিতে বাস্তবে রূপদানের জন্য চাই সেই ভাবনার সাথে সামঞ্জস্য থাকা একজন যোগ্য অভিনেতা, যাঁর ব্যক্তিত্ব এবং সংলাপ বলার কায়দা ছায়াছবিতে তাঁর চরিত্রের পাশাপাশি চিত্রনাট্যেও প্রাণ প্রতিষ্ঠা করবে। আর এমন নায়কের কথা যদি বলা হয় তাহলে তিনি হলেন মহানায়ক উত্তম কুমার, রবীন্দ্রসৃষ্ট সংলাপ এবং গান তাঁর নিখুঁত ভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তোলবার মতন নিহিত প্রতিভা আর কারোর মধ্যে কি খুঁজে পাওয়া যাবে? রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজ আসনে অটল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের প্রেম ভাবনাকে পর্দায় অসামান্য অবদানে সার্থক রূপদানের মাধ্যমে কখন যে তিনি বাঙালির রোমান্টিসিজমের আইকনে পরিণত হয়েছেন যার ধারা আজও অবিচ্ছেদ্য।

দিকপাল অভিনেতা এবং একসময়ের উত্তম কুমারের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শ্রদ্ধেয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর প্রিয় উত্তম দাদার ছায়াছবিতে রোমান্টিসিজম নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন, ‘উত্তম কুমার ছবিতে যে প্রেমের দৃশ্যে অভিনয় করতেন, তার থেকে বলরাজ সাহানি বা দিলীপ কুমার অনেক বাস্তবসম্মত অভিনয় করতেন। কিন্তু ইচ্ছাপূরণ করতে পারতেন উত্তম । তিনি এক রোমান্টিক কল্পনার চিত্র রূপায়ণ করতেন।’

সুদর্শন পুরুষ উত্তম কুমার, তাই রমণীরা যে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হবেন এটাই স্বাভাবিক। তাঁরা নারীসঙ্গ প্রসঙ্গেও নানাবিধ মতবাদ উল্লেখ আছে কিন্তু সেগুলো সত্যি হওয়ার চেয়ে মিথ্যা হওয়াটাই বেশি স্বাভাবিক কারণ এই মানুষটির ছায়াসঙ্গী হিসেবে যাঁরা ছিলেন তাঁরা কখনই এই উল্লেখিত মতবাদের পক্ষে কথা বলেননি। মহানায়কের নারীসঙ্গ প্রসঙ্গে তাঁর ছায়াসঙ্গী স্নেহভাজন অধীর বাগচি নিজ মত প্রকাশ করেছেন।

প্রথমে অধীর বাবুর একটু সংক্ষিপ্ত পরিচয়টা এখানে দিয়ে নিই। অধীর বাগচীর পিতাও একজন বিখ্যাত সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। একদিন উত্তম কুমার অনিল বাগচীর (অধীর বাগচীর পিতা) বাড়িতে তাঁর লুনার ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে আসবার জন্য নিমন্ত্রণ করতে গিয়েছিলেন। ছোট্ট অধীরও তখন স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরেছিল, বাড়িতে ফিরে সে দেখে এক সুদর্শন পুরুষ তাঁর সম্মোহন করা এক গাল হাসি নিয়ে বাবার সাথে কথা বলছেন, অধীরকে দেখেই অনিল বাবু মহানায়কের সাথে অধীরের পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি বলেন এনার নাম উত্তম কুমার, খুব বড় অভিনেতা।

উত্তম কুমার ও সৌমিত্র

ছোট্ট অধীর তখন জানতো না উত্তম নামের সেই পাগলামি, বাঙালির সুখে থাকার অন্যতম ট্রিকস। পরবর্তীকালে ছায়াছবিতে গান তৈরির সূত্রেই মহানায়কের সাথে অধীর বাবুর পরিচয় ঘটে, ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে সখ্যতা। দরাজ হৃদয়ের অধিকারী উত্তম কুমার খুব শীঘ্রই এই সখ্যতাকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করলেন। মনের অনেক গোপন কথাই উত্তম কুমার তাঁর এই ছোট ভাইটিকে প্রাণ খুলে বলতেন।

একদিন অন্যান্য আম বাঙালির মতই অধীর বাবু মহানায়ককে নারীসঙ্গের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করে বসলেন, হ্যাঁ উত্তরও দিলেন মহানায়ক। উত্তম কুমার বুদ্ধিমত্তী নারীর সাথে বন্ধুত্ব করতে বেশি পছন্দ করতেন। কোনো নারী বুদ্ধিমতী হলে তিনি তাঁর সাথে দু তিন ঘণ্টা আড্ডা দিতেন। এই প্রসঙ্গে উত্তম কুমারের কাছ থেকে উঠে এসেছে শর্মিলা ঠাকুরের কথা।

সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘নায়ক’ ছায়াছবিতে তিনি শর্মিলা ঠাকুরের অভিনয় দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেছিলেন। তিনি এও বলেছেন যখনই ছায়াছবিতে শর্মিলা ঠাকুরের সাথে তাঁর কোনো সংলাপ আসছে তিনি মনে মনে ভেবে নিচ্ছেন শর্মিলা যেনো তাঁর নিজের প্রেমিকা। তাঁর এমনতর ভাবনাই নাকি সেই ছায়াছবিতে অরিন্দম রুপী চরিত্রকে আরও বেশি করে প্রাণবন্ত করে তুলেছিল।

কেরানি থেকে বাংলা ছায়াছবির নাম্বার ওয়ান নায়ক, সকলের মহানায়ক। তাঁর লড়াইয়ের কাহিনী রূপকথার গল্পকেও হার মানায় । উত্তম কুমার তাঁর নিজ স্মৃতিচারণায় যেমন উঠে এসেছে ওনার সফল হওয়ার গল্প তেমনই উঠে এসেছে তিলে তিলে জমতে থাকা অভিমানের একটি ব্যর্থ মানুষের কাহিনী। উচ্চশিক্ষায় তাঁর প্রবল ঝোঁক ছিল কিন্তু পারিবারিক কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

তাঁর সহকলাকুশলীদের মনের কথাও তিনি অবলীলায় পড়ে ফেলতে পারতেন, এ প্রসঙ্গেই তিনি দুঃখ করে বলতেন, ‘ওরা আমাকে কেউ শিল্পী মনে করতে পারে না কারণ আমি বুদ্ধিজীবী নই। আমি নাকি ব্যবসার জন্য কমার্শিয়াল ছবি করি । শিল্পের ব্যাপারী । ওরে বাবা বাংলা সিনেমা যদি ইন্ড্রাস্ট্রিই না হলো এবং সিনেমায় জনসাধারণের যদি ইনভলমেন্ট নাই থাকলো আর্ট ফ্লিম হবে কি করে ? তখন আর্ট ফ্লিম করে লাভটাই কি হবে ?’

মানুষ উত্তম কুমার নায়ক উত্তম কুমারের চেয়ে আরও বড়। সহশিল্পীদের বিপদে আপদে বড়ো দাদার মতন পাশে থাকতেন । খ্যাতির চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছেও পালন করে গেছেন নিজের দায়িত্ববোধ। মহানায়কের প্রিয় অভিনেতা ছিলেন মার্লিন ব্র্যান্ডো , পর্দায় রোমান্টিক অভিনয়গুলি তাঁর মতই করার চেষ্টা করতেন।

তাঁর স্বপ্ন ছিল, একদিন হলিউডে এমনই একজন বড়ো মাপের অভিনেতার সাথে অভিনয় করবেন। কিন্তু একদিন সব শেষ হয়ে গেলো, ২৪ জুলাইয়ে যে কারণ বশতই হোক না কেনো লেক গার্ডেন্সের একটি বন্ধুর বাড়িতে অতিরিক্ত মদ্যপান করেন এবং পরেরদিন ভোর রাতে বাড়ি ফেরেন। বাড়ি ফিরেই মেয়ে সোমার সাথে মর্নিং ওয়াক করতে বেরিয়ে পড়েন।

অস্বাভাবিক ভাবে ঘামা শুরু করেন তিনি। ঘটনার গুরুত্ব বুঝে সেইদিনই ভর্তি হোন বেলভিউতে , তাঁর চেকাপ করা মাত্রই ডাক্তারবাবুরা একমুহুর্ত দেরি না করে ভর্তি নিয়ে নেন এবং প্রয়োজনীয় ইনজেকশন পুশ করে হার্টটি বাঁচাতে সক্ষম হোন । মানুষটি বারংবার ডাক্তার বাবুকে বলেছিলেন ওনার বাঁচবার ইচ্ছার কথা কিন্তু অবশেষে কিডনি ফেইল করে তাঁর।

দেহের বিনাশ ঘটে কিন্তু কর্মের নয়, এটাই জগতের শাশ্বত সত্য। উত্তমকুমার এমনই একজন ব্যক্তিত্ব যাঁর কর্মকাণ্ড অভিনয় ছাড়িয়েও সমাজের আরও অন্যান্য গঠনমূলক কাজে নিজ প্রতিভার সাক্ষ্য বহন করেছে। তাঁর সৃষ্ট অমর শিল্প কর্মাদিই প্রতিটি ভারতবাসীর মননে ওনার স্নিগ্ধ প্রেমের ধারা অবিরাম গতিতে বয়ে যেতে সাহায্য করবে।

রাতের পার্টিতে

https://www.mega888cuci.com