ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, স্বদেশ (২০০৪) ও অক্ষয় কুমার

স্বদেশ দেখেসিলাম, হিন্দিতে – ‘সোয়াদেশ’, বাংলায় নিজের ভূমি, মানচিত্র দিয়ে যা আঁকা হয়। অন্য জাত, অন্য পাত, অন্য ভাষা, অন্য ফিনান্সিয়াল স্ট্রাকচারের মধ্যে ফেলার একটা প্রাতিষ্ঠানিক রুপ।

সোয়াদেশে একটা ডায়লগ আছে, ঠিক এমন – Main nahi manta hamara desh duniya ka sabse mahan desh hian, lekin yeh jaroor manta hoon, ki hum mein kabliat hai, takat hai, apne desh ko mahan banane ki!

মাত্র দেখসি আবারো, এর আগেও দেখসি, কিন্তু এবার দেখার কারণ একটা ফোন কল, আমার মনে হইসে এতো সুন্দর রিলেট আর কেউ করতে পারেনাই৷ দুর্জয় ফোন দিয়ে বললো সোয়াদেশের এই ডায়লগটা ঢাকা ভার্সিটির বর্তমান প্রেক্ষাপটের সাথে অনেক প্রাসঙ্গিক ব্যাপারের মধ্যে ঢুকে যায়।

তার আগে অন্য একটা প্রেক্ষাপট বুঝিয়ে আনি, আমরা সবাই জানি, আয়তন ও জনসংখ্যা এবং প্রাকৃতিক বৈচিত্র‍্যের দিক থেকে ভারত বড় একটা দেশ, পৃথিবীর অন্যতম বড়। সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হচ্ছে এর বৈচিত্র্য, বছরের একই মুহুর্তে দেশের নানা প্রান্তে নানা মানুষের কলতান, নানা বৃষ্টির রূপ, নানা ঝর্ণা, নানা অবয়ব আকাশের।

কিন্তু এর মাঝেও ফ্লস আছে, মানুষের অতি গর্ব, অতি অহমিকা, ধর্মের বড়াই, জাত্যাভিমানের কারণে ভারত ঠিক তার আয়তন আর জনসংখ্যার মতো করে মহান হতে পারে না।

যেমনটা অক্ষয় কুমার সিনেমায় দেখায়, ‘প্যাডম্যান’-এ দেখবেন একটা দিক আবার মিশন মাঙ্গালে একটা দিক, প্রতিটি দিকে প্রতিকূলতার মুখোমুখি করেও অক্ষয় আসলে এই ভয়াবহ জাতীয়তাবাদের পক্ষে একটা স্টেটমেন্ট আছেই।

এইটাই হয়তো চায় এখন জনগণ, ভারতের মানুষ।

কিন্তু ওদের মধ্যেও অনেক, মানে সংখ্যায় বিশাল সুন্দর চিন্তার মানুষ আছে। তারা ফ্রন্টিয়ারে নেই এই আর কি, তারা কারো গায়ে হাত তোলে না, ফ্রিজে গরুর মাংস রাখার অপরাধে হামলা চালায় না। তাই গণমাধ্যমে তাদের দেখা সাক্ষাৎ কম।

‘স্বদেশ’-এর ওই ডায়লগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় প্রাসঙ্গিক কারণ এখানে জাত্যাভিমান অনেক বেশি, যে কারণে আয়তনে, সৌন্দর্যে, কোথাও কোথাও বৈচিত্র‍্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সুন্দর। কিন্তু ছাত্ররা তা মানবে কেন! কেউ কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কোনো মজা সহ্য করে না, আবার কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কোনো ফোড়ন সহ্য করে না। এই নিয়ে হইলো গণ্ডগোল, তা হাজার বছরের ধর্মীয় অনুভবের সাথে এই অনুভূতির মিল হচ্ছে এরাও মামলার হুমকি দেয়, এটা কি ব্লাসফেমি?

না, তার চেয়ে বরং স্বীকার করা শিখি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ সবচেয়ে সুন্দর না, এখানে শিক্ষা অনেক উন্নত না, এখানে হলে থাকার পরিবেশ ঠিক বাসা সুলভ তো নাই, তার চেয়ে অনেক আরামপ্রিয় ছাত্ররা যারা টাকা দিতে পারে তারা ৬-৭ হাজার খরচ করে মেসেই থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ ঠিক নাই, গণরুম আছে, ঠিক সেই অর্থে অত্যাচার না থাকলেও একটা প্রসেসে জোম্বি ক্রিয়েট করা হয় যারা কোনো নেতা পোস্ট দেয়ার সাথে সাথে একই কমেন্ট ২০০০ টা দিতে পারে এক সিরিয়ালে, এইটা সুস্থ বা স্বাভাবিক মনে হয়?

তাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে মানুষ হাসলে আপনার লজ্জা পাওয়ার যেমনটা কিছু নাই, তার চেয়ে বরং স্বীকার করেন হ্যাঁ এর যোগ্যতা আছে বা সুযোগ আছে ভালো বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার, কিন্তু হচ্ছে না, হতে পারে, একটা নতুন প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে ওরা করতে পারে। তা না আপনি ফেসবুকে ঝগড়া করতেসেন, বলতেসেন ঢাবিকে কিছু বললে মামলা করবেন হ্যান ত্যান।

মলচত্বর, ফুলার রোডে কাপল বসলে যারা উত্যক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে বরং স্টেপ নেন, একজন একজন যারা আপনি মনে করেন যে আমার নিজের স্বকীয়তা থাকা উচিত তারা মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন আর জোর করে পলিটিকাল কিছু করবেন না, অন্যকে কষ্ট দেবেন না, গায়ে হাত তুলবেন না, মন যদি বলে ছাত্রলীগ করবেন, ছাত্রদল করবেন, ইউনিয়ন করবেন, যা মন বলবে। জোরে জোরে হাঁটতে কষ্ট হয় না এভাবে এক জনের পেছন কোনো ভাবনা ছাড়া?

এরপর ফেসবুকে দলা পাকায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে হম্বিতম্বি করে লাভ আছে? তার চেয়ে বরং সুন্দর ক্যাম্পাস নিজেরাই বানান। আপনারে নিয়া কথা বলেনাই কিন্তু কেউ, এই যে ‘আগে ঢুকে দেখান’ এটা আপনাকে নিয়ে বলেনাই, এটা আপনার জাত্যাভিমান নিয়ে বলসে ঠিক যেমনি ভারতের স্বদেশ সিনেমার প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক লোক ভাবেন, প্রযুক্তি, উন্নত জীবন ও নাগরিক সুবিধা না পেলেও ভারত মহান, কারণ ভারতের আছে সাংস্কার (মূল্যবোধ)! দিনশেষে মূল্যবোধ কিছুইনা, মোয়া। আসলে ভারত মহান হতে পারেনি, বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কেবল তৈরি হয়েছে, জাত পাত নিয়ে রেষারেষি কাটুক ভারত মহান হবে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।