ট্র্যাকিং, ওবামার প্রিয় খাবার ও ‘ভয়ংকর সুন্দর’ ইন্দোনেশিয়া

ইন্দোনেশিয়ার এয়ারপোর্টে নেমে মনে হল ভুল করে বুঝি বাংলাদেশেই চলে আসলাম। মানুষগুলোর মুখে একরকমের কৌতূহল আর সারল্য। দল পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর ইতিউতি চাইছে। ইন্দোনেশিয়ানরা ইংরেজিটা অত ভাল বোঝে না। তাদের সাথে কথা বলতে বা কোন খোঁজ নিতে কিছুটা ঝামেলাতেই পড়তে হয়েছিল। যদিও সেটুকু আমাদের কাছে একেবারেই গৌন মনে হয়েছিল তাদের অমায়িক আচরণের কারনে।

ইন্দোনেশিয়া বলতে বেশিরভাগ মানুষই বোঝে বালি। আমাদের মাথায় ছিল অন্য চিন্তা। সমুদ্র সৈকতের প্লবতায় ডুব না দিয়ে চোখে মাখতে চেয়েছিলাম আগ্নেয়গিরির লালাভ সৌন্দর্য্য। সেই উদ্দেশ্যেই রওনা দেওয়া সুরাবায়ার দিকে। রাতে সুরাবায়া এয়ারপোর্টে নেমে উবার ডেকে সোজা পৌঁছে গেলাম হোটেলে।

হোটেল বুক করার কাজটা করে রেখেছিলাম আগেই, অনলাইনে। রাতের মেন্যুতে রাখলাম ইন্দোনেশিয়ার বিখ্যাত ‘আইয়্যাম পেনিয়াত’। যার বাঙালি নাম বলা যেতে পারে ‘ঝাল মুরগি’। খেতে গিয়ে বুঝলাম নামের আগে ‘ঝাল’ বসানোর তাৎপর্য!

পরেরদিন থেকে আমাদের মূল ট্যুর শুরু। গাইড, এডওয়ার্ড চলে আসে সময়মত। এখানে একটু বলে রাখি, সুরাবায়ার প্রধান আকর্ষণ হল মাউন্ট ব্রোমো, জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। দ্বিতীয় আকর্ষণ ইজেনের জ্বালামুখ। ইজেন পাহাড়ে সালফারের খনি পুড়তে পুড়তে যে চমৎকার নীল আভা তৈরি করে তা দেখতেই ভিড় করে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার মানুষ। কিন্তু সেই জ্বালামুখ পর্যন্ত পৌঁছানো যেনতেন কথা না। রউনা দিতে হল রাত বারটা নাগাদ। জিপে করে যেতে বেশ লাগছিল এবড়োথেবড়ো রাস্তাটুকু।

জিপ থেকে নামতেই হকারের দল ঘিরে ধরল। উপরে ভীষন ঠান্ডা, আমরা যেন তাদের কাছ থেকে টুপি, মাফলার কিনে নিয়ে যাই, এমনটাই বলছিল। আমরা সাথে শুধু নিয়েছিলাম নিজেদের জ্যাকেট, তা দিয়েই পুষিয়ে নেব ভেবেছিলাম। পরে বুঝতে পারি, ঠিকই ভেবেছিলাম। যে ট্রেকিং করা লেগেছিল, ঘেমে নেয়ে ফিরেছিলাম নিচে, ঠাণ্ডাটা একেবারেই অনুভব করিনি। অবশ্য ব্রোমোর দিন ব্যাপারটা একেবারে উল্টো ছিল।

যাই হোক, আমরা লোকাল আরেকজন গাইড, যে কিনা একসময় এই খনিতেই কাজ করতেন – তাকে নিয়ে শুরু করলাম ওঠা-নামা মিলে মোটমাট সাত কিলোমিটারের ট্র্যাকিং। স্বীকার করতেই হবে, আমার আর আমার সহযাত্রীর ট্রেকিং এর খুব একটা অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রথমে কিছুটা হাঁপিয়ে উঠছিলাম অল্পতেই। কিন্তু মনের ভেতর জেদ ছিল, আজ যে করেই হোক, বিশাল অংশ জুড়ে বেরিয়ে আসা আগুনের নীল আভা দেখেই ছাড়ব!

কখনো সমতল, কখনো খাঁড়া- এভাবেই চলতে থাকলাম। সম্বল ছিল মাথার সাথে বেঁধে রাখা টর্চ আর এ পথে হাজারোবার যাতায়াত করা গাইডের দেখিয়ে দেওয়া পথ। সব কষ্টই নস্যি মনে হয় যখন প্রায় তিন ঘন্টার ট্রেকিং শেষে চোখ পুড়তে থাকে – কিছুটা সেই অভাবনীয় সৌন্দর্য অবলোকনে আর কিছুটা সালফারময় বাতাস চোখে ঢোকার কারনে।

দেখে মনে হতে থাকে যেন আকাশের ভেতর আরেক আকাশ। বড় আকাশে এখনো সূর্য ওঠেনি, কালচে রঙ ছেয়ে আছে। আর আমাদের সামনে যে আকাশ তা অন্য কোন পৃথিবীর। জাফর ইকবাল স্যারের বইতে যেমনটা লেখা থাকে, সেরকম কোন হলোগ্রাফিক স্ক্রিন বুঝি খেলা করছে আমাদের সামনে! এত অপার্থিব যে ক্যামেরাতেও ধরা পড়তে চায় না!

ইজেনের মুগ্ধতা মেখে ফিরে গেলাম হোটেলে। সকালের নাস্তা সেরেই আবার জায়গা পরিবর্তন। এবার উদ্দেশ্য ব্রোমো। সেখানকার হোটেলে যেতে সময় লাগল প্রায় পাঁচ ঘন্টা। রাস্তাটা দেখে বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল দেশের সাজেক যাওয়ার পথ। একদম যেন কপি-পেস্ট! অবশ্য মাঝে গাড়ি থামিয়ে ভুট্টা ক্ষেতে নেমে ভুট্টা পাড়ার অভিজ্ঞতাটাকে নতুনই বলব।

ব্রোমো এলাকা আমাদের স্বাগত জানাল তার ঠান্ডা পরশ দিয়ে। এইবেলা যে আর জ্যাকেটে পোষাবে না, বুঝতে পেরে আমরা হাতমোজা আর কানটুপি কিনে আনলাম হোটেলের পাশের এক দোকান থেকে। একটা ব্যাপার বেশ মজার ছিল পুরো ট্যুরে, তা হল টাকার হিসাব! বাংলাদেশি এক টাকা সেখানে প্রায় একশো ৬৫ রুপি। সেই হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার মাটিতে আমরা তিন দিনের জন্য মিলিয়নিয়ার হয়ে গিয়েছিলাম!

ব্রোমো পর্বতের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম এবারে ভোর তিনটায়। এবার আর ট্রেকিং এর প্রয়োজন পড়ল না। এডওয়ার্ড আমাদের নিয়ে গেল যেখান থেকে আমরা তিন পর্বতের (এদের মধ্যে সবচেয়ে বড়জনই হল ব্রোমো) মাথা থেকে ফুঁড়ে বের হওয়া সূর্যোদয় দেখব।

কিন্তু বিধিবাম, আমাদের কপালে আর সূয্যি মামার দেখা লেখা ছিল না। ভোর তিনটা থেকে দুই-আড়াই ঘন্টার অপেক্ষা আর ঠান্ডায় থরথর কাঁপা একেবারে মাটি হয়ে গেল কুয়াশার কারনে। কি আর করা, অগত্যা আবারো জিপে করে ব্রোমোর তলদেশে পৌঁছালাম।

এবার আমি আর আমার সহযাত্রী বেছে নিলাম ঘোড়া। যতদূর পর্যন্ত ঘোড়া নিতে পারে, সেটুকু গিয়ে এরপর আবারো সিঁড়ি বাওয়া লাগল শ খানেক। শেষমেশ আগ্নেয়গিরির দেখা মিলল। ‘ভয়ংকর সুন্দর’ বুঝি একেই বলে! একদিকে জ্বলন্ত ধোঁয়া দেখে ভয় লাগছে অন্যদিকে এমন দৃশ্য চোখের সামনে ভেবে এক অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছে!

ব্রোমোর মাথা থেকে নেমে এর নিচে বসেই এডওয়ার্ড আমাদের পরিচয় করিয়ে দিল ইন্দোনেশিয়ান খাবার ‘বাকসো’র সাথে। বলা হয়ে থাকে, আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নাকি প্রিয় খাদ্য ছিল এই বাকসো!

এই সেই বাকসো

এডওয়ার্ড জানাল আরেক মজার তথ্য। এই এলাকার মানুষেরা প্রায়ই ঘটা করে আগ্নেয়গিরির মুখে তাদের পোষা গরু, ছাগল, মুরগি বিসর্জন দেয়। তাদের ভাষায়, আগ্নেয়গিরিকে খাওয়ায়! এই সরল লোকেদের বিশ্বাস এতে নাকি যেকোন সময় লাভা উদগিরন থেকে বিরত থাকবে শক্তিধর ব্রোমো!

ফেরার সময় হয়ে আসল। শেষের দিনটা কাটিয়ে দিলাম সুরাবায়া শহরে। এয়ারপোর্টের দিকে যখন যাচ্ছিলাম, বৃষ্টি পড়ছিল বাহিরে আর ভিজে যাচ্ছিল আমাদের হৃদয়।

ছবি: মেহেদী হাসান

https://www.mega888cuci.com