থমাস সানকারা: আফ্রিকার চে গুয়েভারা

দেশের প্রেসিডেন্টকে সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলো, ‘কোথাও আপনার কোন ছবি টাঙানো নেই, মূর্তি নেই, ভাস্কর্য নেই, কেন?’

প্রেসিডেন্ট উত্তর দিলেন, ‘আমার দেশের ৭০ লক্ষ থমাস সানকারা, তাদের সবাই প্রেসিডেন্ট।’

তিনি হচ্ছেন থমাস সানকারা।

পুঁজিবাদ আর সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের হাতিয়ার প্রোপাগান্ডা মিডিয়া আর ইতিহাসবেত্তাদের বস্তাপচা মনগড়া কাহিনীর স্তুপে ধামাচাপা পরা সংগ্রাম আর অধিকার আদায়ের বিপ্লবের ইতিহাসের এক সাহসী বীর, এক অকুতোভয় বিপ্লবী কমিউনিস্ট চেতনা বাস্তবায়নে এক আইকনিক ক্যারিসমাটিক কমরেড!

চে গুয়েভারার নাম কালেভদ্রে শোনা গেলেও খুব একটা চেনাজানা নেই থমাস সানকারা নামটার সাথে, অথচ তাকেই বলা হয় ‘আফ্রিকান চে গুয়েভারা’। তাঁর এই নামের কারণ তাঁর বিপ্লবী চেতনা, কমিউনিস্ট মতাদর্শ আর সাম্যবাদী নীতি প্রতিষ্ঠায় অনুকরণীয় সংগ্রামী মনোভাব।

বুরকিনা ফাসোর সাবেক প্রেসিডেন্ট যিনি মাত্র ৩৩ বছর বয়সে ক্ষমতা লাভ করেন এবং শুধুমাত্র ৪ বছর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কিন্তু এই সময়েই শুধু নিজের দেশের জনগণের কাছেই না, গোটা আফ্রিকার সীমা ছাড়িয়ে সারা বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের কাছে হয়ে ওঠেন সংগ্রাম আর বিপ্লবের প্রতীক!

পৃথিবীর একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি একটি স্বাধীন দেশের নতুন নামকরণ করেন এবং একইসাথে সেই দেশের জাতীয় সংগীত রচনা ও সুরারোপ করেন।

থমাস ইসোডোর নোইয়েল সানকারা (২১ ডিসেম্বর, ১৯৪৯ – ১৫ অক্টোবর, ১৯৮৭) ছিলেন বুরকিনাবে মিলিটারি ক্যাপ্টেন, মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট বিপ্লবী, প্যান-আফ্রিকান মতবাদী এবং ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত বুরকিনো ফাসোর পঞ্চম প্রেসিডেন্ট। যিনি ছিলেন তার অনুসারীদের কাছে ক্যারিসমাটিক আইডল এবং আইকনিক ক্যারেকটার।

দেশের নতুন নাম বুরকিনা ফাসো রাখার পর মাত্র চার বছর (১৯৮৩-৮৭) ক্ষমতায় থাকাকালীন থমাস সানকারার অবদান অসামান্য। তিনি প্রায় ২৫ লক্ষ শিশুকে ম্যানিনজাইটিস, ইয়োলো ফিভার (পীতজ্বর/কালাজ্বর) ও হামের টীকা দেয়ার প্রকল্পের সাফল্য নিশ্চিত করেন।

তিনি দেশব্যাপী স্বাক্ষরতা কর্মসূচি শুরু করেন এবং মাত্র ৪ বছরেই স্বাক্ষরতার হার ১৩% থেকে ৭৩% এ উন্নীত করেন।রুক্ষ ও শুষ্ক জলবায়ু ভূতাত্ত্বিক গঠনের দেশটির মরুকরণ রোধে ১০ মিলিয়নেরও বেশি বৃক্ষরোপণ করে মোট বনভূমির পরিমাণ বাড়ান।

ভাল গিটার বাজাতে জানতেন তিনি

কোন প্রকার বৈদেশিক বিনিয়োগ ও ঋণসহায়তা ছাড়াই সারাদেশে সড়ক, মহাসড়ক ও রেললাইন স্থাপন করে দেশের বিভিন্ন অংশের সাথে যোগাযোগব্যবস্থা ত্বরান্বিত করেন। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত ও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষে তিনি নারীদের উচ্চশিক্ষিত করার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি তাদের উচ্চ পর্যায়ের সরকারী পদে চাকরিতে বহাল করেন, সেনাবাহিনীতে রিক্রুটিং শুরু করেন এবং শিক্ষা ও চাকুরিকালীন সময়ে গর্ভকালীন/মাতৃত্বকালীন ছুটির নিয়ম করেন।

তিনি সামাজিক ও ধর্মীয় ভাবে প্রচলিত নানা কুপ্রথার দূর করার পাশাপাশি নারীদের যৌনাঙ্গ ছেদ, জোরপূর্বক বিয়ে, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ প্রথা রোধ করতে আইন প্রণয়ন করেন।

তিনি ক্ষমতা গ্রহণের অব্যাহতি পরেই রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহৃত সরকারী অর্থে কেনা বিলাসবহুল মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়িটি বিক্রি করে নিজের জন্য একটি রেনল্ট-৫ মডেলের গাড়ি কেনেন যা ছিল সে সময়ে বুরকিনো ফাসোর সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও সস্তাদামের গাড়ি।

তিনি নিজের বেতনসহ অন্যান্য সরকারী কর্মকর্তাদের মাত্রাতিরিক্ত বেতন কর্তন করেন, ব্যক্তিগত দেহরক্ষী, সোফার(গাড়িচালক) এবং বিমান ভ্রমণে প্রথম শ্রেণী, বিজনেস ক্লাস বাতিল করেন। তিনি সামান্তবাদী জমিদার ও ফেডারেল ল্যান্ডলর্ডদের কাছ থেকে ভূমি অধিগ্রহণ করে তা চাষী-কৃষকদের মাঝে বিলি-বন্টন করে দেন।

ফিদেল কাস্ত্রোর সাথে

তাঁর দূরদর্শী চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্তের কারণে প্রধান ফসল গমের উৎপাদন হেক্টর প্রতি ১৭০০ কেজি থেকে ৩৮০০ কেজিতে উন্নীত হয় এবং দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। তিনি বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণ সহায়তার ঘোরবিরোধী ছিলেন। তার ভাষ্য ছিল, ‘তোমাদের যারা ভরণপোষণ করবে তারাই তোমাদের নিয়ন্ত্রণ করবে।’

তিনি অর্গানাইজেশন অফ আফ্রিকান ইউনিটির মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফরমে পশ্চিমাবিশ্বের ক্রমাগত পুঁজিবাদী অর্থনীতি, সাম্রাজ্যবাদ ও বুর্জোয়াতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠে সোচ্চার আওয়াজ তোলেন। তিনি আফ্রিকান জাতিগুলোর একটি ঐক্যের ডাক দেন যাতে তারা মাথার ওপর চাপানো ঋণের বোঝা লাঘবে সবাই একসাথে কাজ করতে পারে।

তিনি মত দেন যে, ‘দরিদ্র, শোষিত ও বঞ্চিতদের ঋণ পরিশোধের কোন বাধ্যবাধকতা থাকতে পারেনা।’ তিনি রাজধানী উয়াগাদুগুউতে সেনাবাহিনীর রশদ মজুদগারকে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সুপার মার্কেট হিসেবে গড়ে তোলেন যা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল এবং এটিই ছিল দেশের প্রথম সুপার মার্কেট।

তিনি ব্যবসায়ী ও বেসরকারি ব্যক্তিমালিকানাধীন চাকুরীজীবীদের এক মাসের বেতন সরকারী উন্নয়ন প্রকল্পে দিতে আহবান ও কিছুক্ষেত্রে বাধ্য করেন। তিনি তার সরকারী বাসভবন ও অফিসে এয়ারকন্ডিশন ব্যবহার করতে অস্বীকৃতি জানান কেননা এটা তাঁর চোখে জনগণকে তীব্র তাপদাহে রেখে অত্যাধিক বিলাসিতা মনে হয়েছিল।

তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার মাসিক বেতন কমিয়ে ৪৫০ ডলারে নামিয়ে আনেন, তার ব্যক্তিগত সম্পদ বলতে ছিল একটি গাড়ি, চারটি বাইক, তিনটি গিটার, একটি ফ্রিজ ও একটি ভাঙা ফ্রিজার। তিনি নিজেও একজন সুদক্ষ মোটরসাইক্লিস্ট/বাইকার ছিলেন, পাশাপাশি সুপারদর্শী নারী বাইকার নিয়ে তার প্রেসিডেন্সিয়াল প্রোটোকল গার্ড তৈরী করেন।

তিনি বুরকিনাবে সুতোয় বোনা সাধারণ টেইলার্সে সেলাই করা ট্রেডিসনাল একটি টিউনিক পরে অফিস করতেন। যা ছিল মূলত পশ্চিমা ফ্যাশনবর্জিত দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক! তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় থাকার চার বছরে দেশের কোথাও, কোন অফিসে নিজের আবক্ষমূর্তি, ভাস্কর্য কিংবা প্রতিকৃতি টাঙাতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেন।

রাষ্ট্র পরিচালানার বাইরে তিনি চমৎকার একজন গিটারিস্ট ছিলেন। শুধু তাই-ই না, তিনি সদ্য নাম দেয়া বুরকিনো ফাসোর জাতীয় সংগীত রচনা এবং সুরারোপ করেন। থমাস সাংকারা পশ্চিমা সমর্থিত শাষকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষকে উদ্ধার ও দেশে বিদ্যমান কল্পনাতীত দূর্নীতি ও সাম্রাজ্যবাদী ফ্রান্সের আগ্রাসনের মূলোৎপাটন করতে ১৯৮৩ সালে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে এক জনপ্রিয় ও বিপুল জনসম্পৃক্ত সেনা অভ্যুত্থানে দেশের ক্ষমতা দখল করেন।

ক্ষমতা লাভের পরপরই তিনি সুদূরপ্রসারী সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন প্রকল্প হাতে নেন যা তৎকালিন সময়ে আফ্রিকায় ছিল নজিরবিহীন। তিনি সাম্রাজ্যবাদ মুক্ত বিপ্লবী স্বপ্নে পুনর্জন্মে অর্জিত দেশকে সংগ্রামী প্রতীকে পরিবর্তন করতে ফ্রান্সের কলোনি হিসেবে দেয়া ‘আপার ভোল্টা’ পাল্টে নতুন নাম রাখেন ‘বুরকিনা ফাসো’।

তার গৃহীত পররাষ্ট্রনীতি ছিল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী যেখানে সকল বৈদেশিক ঋণ ও অর্থ সহায়তা হ্রাস করতে দেশের সকল ভূমি জাতীয়করণ করে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ বিমুখী হওয়া! তার হাতে নেয়া অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রনীতি ছিল দেশের দূর্ভিক্ষ মোকাবেলা, খাদ্যাভাব হ্রাস, খাদ্যশষ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, ভূমিব্যবস্থা পুনর্গঠন, দেশব্যাপী স্বাক্ষরতা অভিযান সহ শিক্ষায় গুরুত্বারোপ এবং জনস্বাস্থ্য অবস্থার উন্নয়ন।

তিনি তৃণমূল চাষী ও দরিদ্র কৃষকদের মাঝে জমি প্রদান, সামান্তবাদীদের জমি পুণর্বন্টন করেন, গ্রামীণ জনপদের সকল ট্যাক্স, টোল ও সরকারি কর বিলোপ করেন। ‘একসূত্রে গাঁথা দেশ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে তিনি দেশের সড়ক, রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগান্তকারী উন্নতিসাধন করেন।

তিনি প্রতিটি গ্রামে একটি করে মেডিক্যাল ডিসপেনসারি গড়ে তোলেন, পাশাপাশি নিজেদের স্বেচ্ছাশ্রমে একটি করে স্কুলঘর নির্মাণ করেন। তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী গেরিলা সন্ত্রাসী ও প্রতিবেশি রাষ্ট্রের মদদপুষ্ট সিআইএ সাহায্যপুষ্ট বিদ্রোহী গেরিলাদের কঠোর হাতে দমন করেন।

তিনি সরকারবিরোধীদের বিদ্রোহী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে উপজাতি ও প্রত্যন্তপ্রদেশ গুলোতে ‘প্রতিপক্ষ বিপ্লবী’ ও ‘ছদ্মবেশী বিদ্রোহী’, সরকারী প্রতিষ্টানে কিছু ‘অলস কর্মচারী’ ক্যাটাগরিতে গুপ্তচর নিয়োগ করেন। এরই সাথে তিনি কিউবান বিপ্লবী ‘ফিডেল ক্যাস্ট্রোর মস্তিষ্ক’ নামে পরিচিত চে গুয়েভারার সামরিক পরিকল্পনা অনুসরণ করে কমিটিস ফর দ্য ডিফেন্স অব দ্য রেভলিউশন (সিডিআর) গঠন করেন।

থমাস সানকারা তাঁর ন্যায়পরায়ণতা, সততা, কঠোর নীতিবোধ এবং সর্বোপরি তার বৈপ্লবিক সব উন্নয়নভাবনার জন্য আফ্রিকার দারিদ্রপীড়িত মানুষের কাছে হয়ে ওঠেন আদর্শের মূর্তপ্রতীক। তিনি দেশের সিংহভাগ জনগণের কাছে ছিলেন তুমুল জনপ্রিয়।

যদিও তার অর্থনৈতিক পুনর্গঠনমূলক প্রকল্প ও ভূমিব্যবস্থার সংস্কার একটি ক্ষুদ্র কিন্তু আপেক্ষিকভাবে শক্তিশালী জনগোষ্ঠীকে ক্ষুব্ধ করে তোলে বিশেষ করে বুরকিনাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণী, জোতদার, সামান্তবাদী জমিদার, উপজাতি নেতা যারা সানকারার গৃহীত পদক্ষেপের ফলে দীর্ঘদিনের দাসব্যবসা, বাধ্যশ্রম, কম মুজুরিতে শ্রমিক প্রথার বিলোপ হওয়ায় অসন্তুষ্ট হয়।

কেউ কেউ বলেন, এরসাথে যুক্ত হয় প্রতিবেশী কলোনিয়াল দেশগুলোর সাম্রাজ্যবাদী মদদপুষ্ট পশ্চিমা প্ররোচনা, উস্কানি, স্বার্থে আঘাত লাগা বিশ্বব্যাংক আইএমএফ’র প্রভাব খর্ব হওয়ায়, সাবেক অধিকারী রাষ্ট্র ফ্রান্সের ষড়যন্ত্র, আইভরি কোস্টের অব্যাহত সরকার পতন পরিকল্পনা, লিবিয়ার সাথে একটি বোয়িং-৭৪৭ কিডন্যাপ নিয়ে সম্পর্কের অবনতি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতির পৃষ্টপোষক মার্কিনীদের সিআইএ’র মদদে বিদ্রোহী সামরিক অফিসার গ্রুপের অভ্যুত্থানে ব্লেইসে কম্পোওরের নেতৃত্বে ১৯৮৭ সালের ১৫ অক্টোবর সানকারা নিহত হন।

তাঁর বুকে আনুমানিক ১৪ টি গুলি করা হয়। মৃত্যুর মাত্র এক সপ্তাহ আগে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া এক ভাষণে তিনি দীপ্তকন্ঠে বলেন, ‘বিপ্লবীরা প্রত্যেকেই আলাদা স্বত্তা। তাদের চাইলে হত্যা করা যায়, কিন্তু তাঁদের আদর্শকে হত্যা করা যায় না।’

বুর্জোয়াতন্ত্র আর পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদ পশ্চিমা মিডিয়ার আধিপত্যে আমরা জানতে পারিনা মহাকালের ইতিহাসের অনিকেত প্রান্তরে আবছা ধূসর এক সাহসী বিপ্লবী যোদ্ধার নাম। তবুও থমাস সানকারা বেঁচে থাকবেন, বেঁচে থাকবেন আফ্রিকাসহ সারাবিশ্বের মেহনতী আর শোষণে নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের স্পন্দনে স্পন্দনে।

https://www.mega888cuci.com