‘আমি বিশাল কিছু’ ভাবার বিপদ

কে, কি বলছে এতে কিছু যায় আসছে না।

তোমার রেজাল্ট খারাপ কিংবা জিপিএ কম, এই জন্য তুমি হয়ত ভাবছ – তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না!

হয়ত নামী-দামী কোন স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছো না তুমি। এই জন্য তোমার মনে হচ্ছে – আমার তো কোনো ভবিষ্যৎ নেই!

তোমার কথা বলার ধরণে হয়ত আঞ্চলিকতা আছে। পুরোপুরি শুদ্ধ করে হয়ত কথা বলতে পারছ না। বন্ধু-বান্ধব’রা তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে। তুমি হয়ত ভাবছ – নাহ, আমাকে দিয়ে কিছু হবে না!

তুমি হয়ত ক্লাসের অন্য বন্ধু-বান্ধবরা যেভাবে ইংরেজদের মতো করে করে ইংরেজিতে কথা বলে, সেভাবে ইংরেজি বলতে পারছ না। তাই তোমার মনে হচ্ছে-আমি আসলে কোথাও মানানসই না!

অন্য বন্ধু-বান্ধবদের মতো তুমি হয়ত একেক দিন একেক ব্র্যান্ডের হাল ফ্যাশনের জামা-কাপড় পরতে পারছো না; তোমার হয়ত মনে হচ্ছে- আমি একটা ক্ষেত, আমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই!

এক ছেলে আমাকে টেক্সট করে লিখেছে – স্যার আমার রেজাল্ট খারাপ। জিপিএ কম, ক্লাসের কেউ আমার সঙ্গে ভালো ভাবে মিশে না! আমার আজকাল প্রায়’ই মনে হয়- আমার কোন ভবিষ্যৎ নেই! পড়াশোনা করে আর কি হবে!

এই ছেলেটা যেই কথা গুলো লিখেছে, আমি মোটামুটি নিশ্চিত স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে অনেক ছাত্র-ছাত্রী তাদের পড়াশোনার কোনো না কোনো পর্যায়ে হয়ত এমন চিন্তা ভাবনার মাঝ দিয়ে গিয়েছে। আর কেউ গিয়েছে কিনা জানি না, অন্তত আমি এমন চিন্তার মাঝ দিয়ে গিয়েছি।

আমি বরং আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলি।

স্কুলে থাকতে যেই ছেলে-পেলে গুলো ক্লাসে প্রথম দশ জনের মাঝে থাকতো, এদের মাঝে অন্তত চার জনের কথা আমি জানি! এদের কেউ ইন্টারমিডিয়েট অর্থাৎ এইচএসসি পাশ করতে পারেনি!

অথচ এসএসসিতে এরা সবাই অনেক ভালো নাম্বার পেয়ে ভালো ভালো কলেজেই ভর্তি হয়েছিল!

কিন্তু ভালো কলেজে ভর্তি হবার পর হয় এদের মাঝে – ‘আমি বিশাল কিছু’ এমন একটা ভাব চলে এসেছিল কিংবা এদের অনেকে’ই নানা সব বাজে অভ্যাসের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়াতে শেষমেশ আর পড়াশোনাটাই আর শেষ করতে পারেনি।

আমি যখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি, যেই ছেলে-পেলে গুলো ক্লাসে সব সময় প্রথম দিকে থাকতো, এদের অনেকে’ই ভালো কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই চান্স পায়নি! অথচ এদের রেজাল্ট কিন্তু ভালো ছিল।

কারন, এরা হয়ত ভেবে বসেছিল ভালো রেজাল্ট তো করেছিই, চান্স হয়ে যাবে! এমনকি দুই-এক জনকে জানি, যারা ইন্টারমিডিয়েটের পর আর পড়াশোনাই করেনি!

আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর, যেই ছেলে-পেলে গুলো রেজাল্ট প্রথম দিকে ছিল, যারা ক্লাসে নানান উপায়ে ভাব নেয়ার চেষ্টা করত, নিজেদের স্মার্ট দাবী করে! তাদের সবার স্মার্টনের পরবর্তী জীবনে আর দেখা যায়নি!

এই যেমন কেউ হয়ত ভালো ইংরেজি বলে, কারো হয়ত রেজাল্ট ভালো, কেউ হয়ত দেখতে শুনতে ভালো কিংবা একেক দিন একে জামা কাপড় পড়ে আসে; কারো হয়ত স্যারদের সঙ্গে বিশাল ভাব! উঠতে বসতে অমুক স্যার, তমুক স্যারের রেফারেন্স দিয়ে বেড়ায়!

দেখা গেলো এদের অনেকে’ই ঠিক সময়ে পড়াশোনা শেষ করতে পারেনি কিংবা শেষ করলেও চাকরী পাচ্ছে না কিংবা চাকরী পেলেও কোনোক্রমে একটা চাকরী জুটিয়ে এদের দিন চলছে!

আমি আমার কথা বলি, আমার ক্লাসে একটা গ্রুপ ছিল, এদেরকে দেখলে মনে হত – এদের মাটিতে পা পড়তে চায় না!

আমি মোটামুটি ভালোই বাস্কেটবল খেলতাম! এখনও খেলি এবং সেটা মোটামুটি বেশ ভালো লেভেলের! তো, ইউনিভার্সিটি’তে ইন্টার-ডিপার্টমেন্টাল বাস্কেটবল খেলা হচ্ছে। অর্থাৎ সব গুলো ডিপার্টমেন্ট একে-অপরের সঙ্গে বাস্কেটবল খেলবে।

স্বাভাবিক ভাবে আমার বিভাগ থেকে আমার খেলা নিশ্চিত হবার কথা। কারন সেই অর্থে আমাদের ডিপার্টমেন্টে কেউ বাস্কেট বল খেলা পারতোই না।

তো খেলার দিন হঠাৎ অবিস্কার করলাম, সেই স্মার্ট গ্রুপের সবাই খেলতে নেমে গেছে! এদের কেউ হয় রাজনীতি করে, কারো হয়ত স্যারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক কিংবা কেউ হয়ত গায়ের জোরেই নেমে গিয়েছে খেলতে!

অথচ অনেকেই হয়ত সেই অর্থে কোনো দিন বাস্কেটবলই খেলেনি!

তারা হয়ত অন্য খেলায় ভালো হতেই পারে, কিন্তু তাই বলে সব খেলায় তারা ভালো হবে, ব্যাপার টা তো এমন না! কিন্তু এরা গায়ের জোরে’ই খেলতে নেমে গেল! আর আমি থেকে গেলাম সাইড লাইনে! কি অবাক কাণ্ড!

এই উদাহরণটা এই কারণে দিলাম – এই স্মার্ট গ্রুপের এরা সবাই কিন্তু তাদের পরবর্তী জীবনে স্মার্ট হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি!

শুধু আমার ডিপার্টমেন্টে না, বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে আমি মোটামুটি সব ডিপার্টমেন্টে’র সব ছেলে-পেলের সঙ্গেই মেলামেশা করতাম। অন্তত আমার ব্যাচে সকল ডিপার্টমেন্টের এমন কোন ছেলে পেলে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাওয়া যাবে না, যারা আমাকে চিনবে না!

আমি নানান ক্লাব (টুরিস্ট ক্লাব, ডিবেট ক্লাব ইত্যাদি) করতাম, ঘুরে বেড়াতাম, খেলাধুলা করতাম, গান-বাজনা করতাম। অর্থাৎ, আমি নিজেও কিন্তু খানিকটা স্মার্ট গ্রুপেরই সদস্য ছিলাম!

আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, আমার ক্লাসে কিংবা অন্যান্য ডিপার্টমেন্টে’র যেই ছেলে-পেলে গুলো’র হয়ত খুব একটা ভালো রেজাল্ট ছিল না, ভালো করে হয়ত শুদ্ধ করে কথাও বলতে পারত না, স্মার্ট বলতে আমাদের যেই তথাকথিত সংজ্ঞা আছে, সেই সংজ্ঞা অনুযায়ী তারা হয়ত তেমন স্মার্টও ছিল না!

অথচ অবাক হয়ে আবিষ্কার করেছি বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করার পর এরাই কেউ বিসিএস পাশ করে বড় বড় ক্যাডার হয়েছে, কেউ নামী-দাবী ব্যাংকে চাকরী করছে কিংবা ভালো ভালো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের উঠবস এখন!

আমি নিজে ঢাকা শহরের নামী-দামী স্কুল কলেজে পড়াশোনা করেছি, রেজাল্টও হয়ত ভালোই ছিল, পারিবারিক ভাবেও হয়ত মোটামুটি বেশ প্রতিষ্ঠিত, চেনা-জানা পরিবার থেকেই উঠে এসছি; কিন্তু কখনো সেটা প্রকাশ করতে যাইনি কিংবা জাহির করে বেড়াইনি!

কারণ, আমার বাবা-মা ছোট বেলা থেকেই আমাদের ছয় ভাই-বোনকে একটা বিষয় খুব ভালো করে শিখিয়ে দিয়েছেন – দিন শেষে আমরা সবাই মানুষ! সবাইকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

তখন ক্লাস ফাইভ কি সিক্সে পড়ি, একদিন আমাদের বাসায় কাজের ছেলেটার সঙ্গে একটু উঁচু গলায় কথা বলেছিলাম, আমার বাবা সেটা শুনতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে এসে আমাকে বলেছেন -তুমি ওর সঙ্গে এভাবে কথা বলতে পারো না। এক্ষুনি ওর কাছে ক্ষমা চাও!

ওই বয়েসে কাজের ছেলের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে, ব্যাপারটা আমার কাছে ভালো লাগেনি। আমি ক্ষমা চাইনি!

আমার বাবা আমাকে কিছু না বলে দীর্ঘ এক মাস আমার সঙ্গে কোন কথা বলেননি!

আমার জন্মদিন কাছে চলে আসায়, এরপর আমি ভাবলাম এই জন্মদিনে তো তাহলে কোনো অনুষ্ঠান হবে না! বাবা তো আমার সঙ্গে কথাই বলছে না!

শেষমেশ আমি বাবাকে গিয়ে বলেছি -আমি এই ছেলের কাছে ক্ষমা চাইব!

আমি ক্ষমা চাইবার পরই কেবল আমার বাবা আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। সেদিন আমার বাবা আমাকে বলেছিলেন – এই ছেলের ভাগ্য খারাপ, এই জন্য তাকে বাসায় কাজ করতে হচ্ছে! ওর জায়গায় তোমার ভাগ্যও এমন হতে পারত! তাই কারো সঙ্গে খারাপ ব্যাবহার করা যাবে না!

সেই দিনের পর আজ পর্যন্ত আমার মনে হয় না, আমি খুব একটা কারো সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলেছি! কোন দিনও না।সেদিন যেই শিক্ষা আমি নিয়েছি, বাদ বাকী জীবনে সেটা মেনে চলেছি!

যার কারণে আমি কখনোই জীবনের কোনো পর্যায়ে নিজের আর্থিক, সামাজিক কিংবা অন্য যে কোন অবস্থানের জন্য আশপাশের অন্য মানুষ’কে ছোট করে দেখেছি বলে মনে হয় না! পারলে নিজেই ছোট হয়ে চলার চেষ্টা করি!

তবে সবাই তো আর এমন হবে না! সমাজে বেশির ভাগ মানুষ’ই নিজেদের স্মার্ট মনে করে অন্যদের ছোট করার কাজে মহা ব্যস্ত।

এইতো বিদেশেই আমি যেই শহরে থাকি, সেখানে সব মিলিয়ে চারটা ইউনিভার্সিটি আছে। এর মাঝে আমি যেই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পড়াই, সেটি অন্য আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাইতে ছোট এবং হয়ত কিছুটা কম পরিচিত!

তো বাংলাদেশ থেকে পড়তে আসা ছাত্র-ছাত্রীরা যারা ওই বড় বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পড়ে, তারা এই একই শহরে থাকা অন্য ছোট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ছাত্র-ছাত্রীদের উঠতে বসতে ছোট করে বেড়ায়! ভাবখানা এমন- এরা হচ্ছে জগতের সব চাইতে স্মার্ট!

মজার বিষয় হচ্ছে- আমি আবার ওই বড় বিশ্ববিদ্যালয়টিতেও পার্ট টাইম শিক্ষক হিসেবে পড়াই এবং আমার অভিজ্ঞতা আমাকে জানান দিচ্ছে এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে খুব একটা কোন তফাত নেই!

আমার তো ধারণা এরা সবাই দেশ-বিদেশের নানান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ারই যোগ্যতা রাখে!

কিন্তু আমারা বাংলাদেশি বলে কথা! ভাব নিতে হবে না! আমি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, এইটা বলে আলদা একটা ভাব না নিলে চলবে কেন!

এখন ব্যাপারটা হচ্ছে- এই যে আলাদা ভাব কিংবা স্মার্টনেস, বাস্তব জীবনে এই সবের কোন মূল্য নেই! আমার ক্লাসে যেই ছেলেটা ভালো করে ইংরেজি বলতে পারত না, সে এখন কোর্টের বিচারক হিসেবে উঠতে-বসতে ইংরেজি বলছে!

যে ছেলেটাকে দেখতাম রোজ এক কাপড় পড়ে কলেজে আসছে, সেই ছেলে’টা এখন নামী একটা পোশাক কোম্পানির বড় ম্যানেজার। একেক দিন একেক ড্রেস পড়ে ছবি তুলছে!

যেই ছেলেটার কথার মাঝে আঞ্চলিকতা ছিল, সব সময় চুপচাপ থাকতো- পাছে না বন্ধু-বান্ধবরা ওকে নিয়ে হাসাহাসি করে; সেই ছেলেটা এখন বড় একটা ব্যাংকের কর্তা হয়ে দিন রাত মানুষের সঙ্গে কথা বলছে!

যেই ছেলেটার জিপিএ খুব একটা ভালো ছিল না; সেই ছেলেটাই দেখছি এখন বিসিএস দিয়ে বড় ক্যাডার হয়ে গিয়েছে।

এই যে আমি, যেই আমাকে স্মার্ট ছেলের দল ডিপার্টমেন্টর হয়ে বাস্কেটবল খেলতে দেয়নি, সেই আমিই দেশে বিদেশে নানান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি ও পড়াচ্ছি এবং এইসব বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে বাস্কেটবলও খেলেছি!

এমন কি এই বিদেশে এসে যেই ছেলে-পেলে গুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে বা দেশের বড় কোন ইউনিভার্সিটি’তে পড়ে এসছে বলে ভাব নিত; এদের অনেকে’ই এখন দেখি হোটেল-রেস্টুরেন্টে কাজ করছে (কোন কাজ’ই খারাপ না, জাস্ট উদাহরণ দেয়ার জন্য বললাম!)

সুতরাং জীবনে কোন পর্যায়ে’ই এটা ভাবা যাবে না- আমাকে দিয়ে কিছু হবে না! মানুষ হিসেবে জন্মানোর সুবিধা হচ্ছে- আমরা যদি খুব করে চাই, তাহলে যে কোন কিছু অর্জন করা সম্ভব।

যেই ছেলেটাকে তোমার আজ স্মার্ট মনে হচ্ছে, পাঁচ বছর পর তাকে’ই হয়ত তোমার ব্যাক-ডেটেড মনে হবে। কারন এই পাঁচ বছরে তুমি যা অর্জন করেছে, সে হয়ত তার কিছু’ই অর্জন করেনি, স্রেফ নিজের স্মার্টনেসটা জাহির করে বেড়িয়েছে!

তাই নিজের কাজটা স্রেফ করে যেতে হবে! কে কি বলছে, তাতে কিছুই যায় আসছে না!

https://www.mega888cuci.com