সুপ্রিম: পেইড মার্কেটিং ছাড়াই বিশ্ব কাঁপানো ব্র্যান্ড

আমি রাস্তার পাশে ভ্যান থেকে কাপড় কেনা মানুষ, ব্র্যান্ডের পোশাক কখনো গায়ে দেইনি। ব্র্যান্ডের ড্রেস গায়ে না দিলেও আমি প্রতিটি ব্র্যান্ড নিয়ে পড়াশোনা করতে ভালবাসি। কেন আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা ইন্টারন্যাশনাল ব্র্যান্ড হতে পারে না? অথচ আমাদের কাছ থেকে কাপড় বানিয়ে অনেক বিদেশিরা কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছে।

রাস্তার পাশ থেকে কাপড় কেনার সময় সুপ্রিম ব্র্যান্ডের কপি কাপড় দেখেননি এমন মানুষ খুব কমই আছে। কপি ড্রেস কিনলেও আমাদের মোটামুটি সবার মনেই অরিজিনাল ড্রেস পরার ইচ্ছা থাকে, থাকাটা স্বাভাবিক। সবার ইচ্ছা পূরণের শুভ কামনা রইল।

প্রতি বছর ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি বিজ্ঞাপনের পিছনে ৫০০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে থাকে। সুপ্রিমের মধ্যে এক টাকাও খরচ করে না। আপনি সুপ্রিম ব্র্যান্ডের মার্কেটিং খুব কমই দেখে থাকবেন।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতে সুপ্রিমের নেট সম্পদের পরিমাণ ছিল এক বিলিয়ন ডলার। ৫০০ মিলিয়নে কার্লাইলের কাছে বিক্রি হবার পরেও সুপ্রিমের ব্র্যান্ড ভ্যালু, হাইপ একটুও কমে নি।

সুপ্রিমের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯৪ সালে একটি স্কেটবোর্ড দোকান হিসেবে। জেমস জেবিয়া, যার মোট সম্পদের পরিমান ৪০০ মিলিয়ন ডলার, ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা।

শুরুর দিকে সুপ্রিম স্কেটবোর্ড কমিউনিটির জন্য পোশাক বানাত, যা ছিল সোয়েটার ও হুডি। ২০০০ সাল পর্যন্ত সুপ্রিম স্কেটবোর্ড কমিউনিটির পোশাক নির্মাতা হিসেবে বেশি পরিচিত ছিল। ছোট পরিসরে ব্যবসা করলেও সুপ্রিম তাঁদের পণ্যের কঠিন মান নিয়ন্ত্রনের জন্য জনপ্রিয় ছিল। এতে তাদের পণ্য মোটামুটি সবসময় আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে চলত।

সুপ্রিম প্রথমবারের মত নজরে আসে ত্যাদের প্রিমিয়াম কোয়ালিটির টি শার্ট বানানোর পর, তাদের ডিজাইন এতটাই নজরকাড়া হয়, যে সেলিব্রেটিরা তাদের টি-শার্ট নেয়ার জন্য কাড়াকাড়ি শুরু করে।

২০১৯ সালে গ্যাপ ও ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের মত ব্র্যান্ডগুলো যখন পৃথিবীর অনেক জায়গায় তাদের স্টোর বন্ধ করে দিচ্ছিল, সেখানে সুপ্রিম তাদের ব্র্যান্ড গ্লোবালি লঞ্চ করে।

সুপ্রিম পোশাক হিসেবে মাঠ কাঁপিয়ে যাত্রা শুরু করলেও, পোশাকের বাইরে তারা এমন সব পণ্য বিক্রি করত যা মূহুর্তেই স্টোর থেকে খালি হয়ে যেত। মানুষের কাজে লাগুক আর না লাগুক, তারা কোন কারণ ছাড়াই সুপ্রিমের পণ্য কিনত। কারো কাছে সুপ্রিমের কোন একটা পণ্য থাকাই মানে সে অন্যদের চেয়ে আলাদা।

সুপ্রিম নিয়ে আপনার সামান্যতম ধারণা থাকলেও আপনি জানবেন যে তারা সবসময় তাদের চাহিদার চেয়ে পণ্য কম বের করত। এতে দোকানে সবসময় আগে আসলে আগে পাবেন স্টাইলে বিক্রি চলত। চাহিদার চেয়ে কম পণ্য বের করে তা দিয়ে হাইপ সৃষ্টি করে পণ্য বিক্রির কৌশল তাদের ক্ষেত্রে বেশ ভালই কাজে দিয়েছল।

তবে জেমস জেবিয়ার মতে এটি কোন কৌশল ছিল না। তিনি বলেছিলেন, প্রথম দিকে তাদের তেমন কোন ফান্ডিং ছিল না, তাই তারা বাল্ক এমাউন্টে পণ্য বানিয়ে ‘ফতুর’ হয়ে যেতে চান নি।

তারা প্রথমে পণ্য কম পরিমাণে বের করত, তবে কম হলেও মানের ব্যপারে কোন ছাড় দিত না, এবং এই পণ্যের অসাধারণ মানই তাদের অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এসবের বাই প্রোডাক্টই হল তাদের দোকানের সামনে লম্বা লাইন ও সোশ্যাল হাইপ।

এই সোশ্যাল হাইপটাই সুপ্রিমের পোয়াবারো হয়। সমাজে তৈরি হয় ‘হাইপ বিস্ট’ যারা ফ্যাশন আর স্টাইল বলতে অজ্ঞান। আর বলাই বাহুল্য, তারা সবাই সুপ্রিমের হাইপ বিস্টে পরিণত হয়। এরা নিজেদের কমিউনিটি তৈরি করে ফেলে, এরাই ছিল সুপ্রিমের সবচেয়ে লয়্যাল কাস্টোমার ও এডভোকেট, সেলস ফানেলের সর্বশেষ পর্যায়।

হাইপ বিস্টর সুপ্রিমের একটি কালচার গড়ে তুলে, আর সুপ্রিমের একেকটি পণ্য মানেই তাদের কাছে স্যুভেনির পর্যায়ে। এমনিই এক হাইপ হল জো মিগরেইন। ইন্সটাগ্রামে সার্চ করে দেখলে দেখতে পাবেন এই লোক সুপ্রিমের সুপ্রিম লেভেলের ভক্ত, তাঁর সংগ্রহে এক লাখ ডলারের বেশি সুপ্রিম পণ্য রয়েছে।

আর্টিস্ট কোলাবোরেশন ও ব্র্যান্ডিং- প্লেইন টি-শার্টের উপরে সুপ্রিমের লোগো দিয়ে বানানো পণ্য সুপ্রিমের এভারগ্রিন প্রোডাক্ট। প্লেইন টি-শার্টের উপর তাদের লোগোর অনেক আগে নজর কাড়ে বিভিন্ন বিখ্যাত আর্টিস্টদের ছবি ছাপানো টি শার্ট। মূলত এই জিনিসটি তাদের অন্যান্য ব্র্যান্ড থেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

তাঁদের প্রথম আর্টিস্ট ছিল রবার্ট ডি নিরো, সাথে ছিল তাদের আইকনিক বক্স লোগো। পরে তারা আরো আর্টিস্টের ছবি যোগ করে, ২০০০ সালের আগ পর্যন্ত তারাই একমাত্র ব্র্যান্ড ছিল যারা এই কাজ করে।

তাদের একাদশে বৃহস্পতি শুরু হয় যখন বিখ্যাত আর্টিস্টরা তাদের টি-শার্ট পরিধান করে বিভিন্ন মিডিয়ার সামনে হাজির হয়।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কেইন ওয়েস্ট একবার সুপ্রিমের জুতা পরে মিডিয়ার সামনে হাজির হন যা ছিল নাইকির যৌথ প্রযোজনা। এই জুতাটি অনেক বেশি জনপ্রিয় হয় ও নাইকি ও সুপ্রিমের অনেক বিক্রি বাড়িয়ে দেয়

পরের বছরগুলোতে জাস্টিন বিবার-সহ টাইলার দ্য ক্রিয়েটরের মত নামীদামী সেলিব্রেটিরা সুপ্রিমের পণ্য ব্যবহার করে মিডিয়ার সামনে হাজির হয়। এরপরে কি হয়, তা আর না বললেই চলে।

২০২০ সালে এসেও সুপ্রিম তাদের মার্কেটিং কৌশলের কোন পরিবর্তন আনে নি। ২০২০ সালেও তাঁদের উইন্টার কালেকশনগুলোও ছিল নাইকির সাথে। সুপ্রিমের রিসেল ভ্যালু তাঁদের অরিজিনাল ভ্যালুর চেয়ে ২-৩ গুন বেশি।

জেনে অবাক হবেন সুপ্রিমের ব্যবহৃত শপিং ব্যাগও রিসেল মার্কেটে বিক্রি হয়। অনেকেই শুধু সুপ্রিমের এর পণ্য পুন: বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে।

সুপ্রিমের কাছ থেকে আমাদের শিক্ষা তাহলে কী?

  • ব্র্যান্ডিং করতে সময় লাগে

এক লাফে যেমন গাছে ওঠা যায় না, তেমনি এক দিনে ব্র্যান্ডিং ও হয় না। দুই দশক সময় নিয়ে 𝙎𝙪𝙥𝙧𝙚𝙢𝙚 তাদের এই জায়গায় পৌছেছে।

  • সত্যিকারের বিশ্বস্ত ক্রেতা-ভক্ত

সেলস ফানেলের সর্বশেষে আমরা বিক্রি বুঝে থাকি মূলত। আসলে তা না, বিক্রির পরেও আপনার দরকার লয়্যাল কাস্টোমার যারা আপনার কাছ থেকেই পণ্য কিনবে ও আপনার হয়ে সবার সাথে কথা বলবে।

  • পরিমানের চেয়ে গুণগত মান জরুরী

তাদের পণ্য বানাতে প্রচুর সময় ব্যয় করত, ও কম পরিমাণে বানাত। তারা তাদের পণ্যর ব্যপারে এতটাই আস্থাবান ছিল যে, তারা জানত তীর্থের কাকের মত বাইরে অপেক্ষা করা ক্রেতারা যত দেরি হোক তাদের পণ্য কিনবেই।

 

https://www.mega888cuci.com