অঞ্জলি লহ মোর

কলকাতায় একই দিনে মুক্তি পায় মেগাস্টার অমিতাভ বচ্চনের ‘হাম’ ও জনৈক বাংলাদেশি অভিনেত্রী অভিনীত এক বাংলা ছবি।বাংলাদেশি ছবির সেই ভারতীয় রিমেকটি ছাপিয়ে যায় ‘হাম’ ছবির ব্যবসায়িক সাফল্য। ছবিটি দেখে ছবির ফিমেইল প্রোটাগনিস্ট’র অভিনয়ের উচ্চকিত প্রশংসা করেন অমিতাভ বচ্চন।

অবাক হয়ে যান স্বয়ং সত্যজিৎ রায়। ‘যে ছবি এত লোক দেখছে, সে ছবিকে অস্বীকার করা যায় না’ – এই একটিমাত্র কমপ্লিমেন্ট ছবিটিকে দিয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এই স্বীকৃতি শুধু ছবির নয়, নায়িকারও। কারণ পুরো ছবি জুড়েই যে ছিল নায়িকা।

যে নায়িকার কথা বলছি তিনি দীর্ঘ ২২ বছরের অভিমান ভুলে এই বাংলায় আবার এসেছেন। ওয়েলকাম ব্যাক অঞ্জু ঘোষ।

১৯৮২ সালে এফ কবীর চৌধুরীর ‘সওদাগর’ ছবিতে অভিষেক হয় অঞ্জু ঘোষের।আসল নাম অঞ্জলি ঘোষ। অভিষেকেই বাজিমাত করেন অঞ্জু। ‘রাজমহল’ ছবির পর থেকে বাংলা ফোক ফ্যান্টাসি ছবির জগতে দীর্ঘ ৬ বছর একচ্ছত্র রাজত্ব ছিল নায়িকা রোজিনার।সেই রাজত্বে এক নিমিষেই হয়ে যায় রানীবদল।অঞ্জু হয়ে উঠেন ফোক ফ্যান্টাসি ছবির সুদর্শনা সুলতানা।

একের পর এক হিট-সুপারহিট-ঐতিহাসিক ‘বেদের মেয়ে জোসনা’- ব্যস্ততম নায়িকার তকমা-শিডিউলের খাতা কানায় কানায় পূর্ণ – আজ ঢাকা তো কাল কক্সবাজার। নাচ-গান-গ্ল্যামারের ঝলকানি। বাংলা চলচ্চিত্রের গৌরবময় ইতিহাসে অঞ্জু নিজেই এক খন্ড ইতিহাস।

অঞ্জু ঘোষ ইন্ডাস্ট্রিকে দিয়েছে কাড়ি কাড়ি টাকা কিন্তু ইন্ডাস্ট্রি অঞ্জুকে কতটুকু দিয়েছে? অপব্যবহার করেছে অঞ্জুর চোখ ধাধানো গ্ল্যামারের।অঞ্জুর অভিনয় প্রতিভা দেখানোর চেয়ে অঞ্জুর আবেদন দেখিয়ে পয়সা কামানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল প্রযোজক-পরিচালকের কাছে। তারপরেও অঞ্জু স্বীয় যোগ্যতায় প্রমাণ করেছে নিজের অভিনয় প্রতিভা। ফোক ছবির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে সোস্যাল ছবিতেও অঞ্জু অনবদ্য।

ঐতিহাসিক ‘আলেয়া’ চরিত্রে ‘পথ হারা পাখি’ গানে অঞ্জুর পারফেক্ট অভিব্যক্তি এখনো চোখে লেগে আছে। রঙিন নবাব সিরাজউদ্দৌলা ছবিতে অঞ্জুর অভিনয় ভুলে যাওয়া অসম্ভব।কাজী হায়াতের পলিটিক্যাল ড্রামা ‘যন্ত্রনা’ ছবিতে ধর্ষিতা মেয়ের আর্তনাদ অঞ্জু’র নিখুঁত অভিনয়ে মন ভারী করেছে সিনেপ্রেমীদের।

গাজী মাযহারুল আনোয়ারের ‘শর্ত’ ছবিতে অঞ্জুর সংলাপ প্রক্ষেপন বিশেষ বিশ্লেষণের দাবী রাখে।বাংলা ছবিতে শাবানার পরে এত বলিষ্ঠ সংলাপ প্রক্ষেপণ খুব কম অভিনেত্রীই করতে পেরেছে।সৈয়দ শামসুল হকের ‘আয়না বিবির পালা’য় তৃষার্ত নায়ক যখন নদীর জলে তৃপ্ত হতে যায় তখন তার আজলা ভরে উঠে আসে অঞ্জু ঘোষ। সব্যসাচী সৈয়দ হকের এই কাব্যিক চিত্রনাট্যে অনন্য অঞ্জু ঘোষ। ‘ছলনা’ ছবিতে অঞ্জুর ট্র‍্যাজিক অভিনয় এখনো মনে দাগ কেটে আছে। ‘চন্দনা ডাকু’ ছবির সেই প্রতিবাদী মেয়ের চরিত্রেও অঞ্জু অসাধারণ।

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ওপার বাংলায়ও অঞ্জু পেয়েছেন তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা। যৌথ প্রযোজনা ছাড়াও অনেক ভারতীয় ছবিতে আলো ছড়িয়েছেন তিনি।ইন্দ্রানী হালদার,ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, শতাব্দী রায়সহ কলকাতার প্রথম সারির নায়িকারা অঞ্জু’র সাথে একই ছবিতে সেকেন্ড লিড করেছে অনায়াসে।

অল্প সময়ে ঈর্ষনীয় নামযশ-টাকা অঞ্জুকে অনেকের চক্ষুশূল বানিয়ে দেয়। অনেক শত্রু তৈরি হয় তার ইন্ডাস্ট্রিতে। ফিল্মি পলিটিক্সের শিকার হন তিনি। ‘ছায়াছন্দ’ পত্রিকায় অঞ্জুর ঘুমন্ত অবস্থার ছবি ছাপিয়ে দেয়া হয়। ‘চিত্রালী’ পত্রিকায় হাটু’র উপরে শাড়ি পরা ছবি ছাপিয়ে অশ্লীলতার তকমা দেয়া হয়। অথচ তখন ফোক ছবিতে হাটু’র উপরে শাড়ি পরাই ছিল ট্রেন্ড।

এছাড়াও ছিল তার ব্যক্তিজীবনের কিছু হতাশা। জনৈক নায়ককে ভালবেসে প্রতারিত হন। প্রতারণার কষ্ট ভুলতে জিদ করে বিয়ে করেন। সেই বিয়েও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। মানসিকভাবে ভেঙে পড়া অঞ্জুকে নিয়ে নতুন ছবি নির্মাণের উদ্যোগ নেন কাজী হায়াৎ।

দুই নায়িকা’র সেই ছবিতে অন্য নায়িকা দিতির পাশাপাশি অঞ্জুর চরিত্রটিও ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রযোজক মান্না পরিচালককে চাপ দেন সেই চরিত্রে মৌসুমিকে নিতে। বাদ পড়েন অঞ্জু। আরো ভেঙে পড়েন তিনি। নির্মাণাধীন মাদক বিরোধী ‘নেশা’ ছবিটি অসমাপ্ত রেখেই কলকাতায় পাড়ি জমান অঞ্জু ঘোষ।

‘ক্ষুধা’ চলচ্চিত্রের একটি নাচের দৃশ্যে অঞ্জু ঘোষ, মৌসুমী ও নৃত্য পরিচালক আজিজ রেজা।

অঞ্জু ঘোষ কতদিন দেশে থাকবেন তা জানিনা। বাংলা চলচিত্রে শ্রেষ্ঠ বৃষ্টির গান ‘এই বৃষ্টি ভেজা রাতে চলে যেওনা’ অঞ্জুর লিপে ছিল। সেই গান থেকেই বলতে চাই – ‘এত দিন পরে তুমি এলে, ওগো কেন এখনি যাবে চলে?’

https://www.mega888cuci.com