যে ট্রফির জন্য এত আয়োজন

এক ট্রফি, ৩২ দেশ, শিগগিরই এই দেশের সংখ্যাটা বেড়ে যাবে। চার-চারটা বছর জুড়ে চলে বিস্তর পরিকল্পনা।  স্রেফ একটা কাপ জয়ের জন্য আকাশচুম্বি বোনাস, পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। ফুটবলাররা রাতারাতি তারকা বনে যান। বড় বড় ক্লাবের হাতছানি থেকে শুরু করে অর্থবিত্ত সব হয় তাঁদের। কি আছে এই বিশ্বকাপে? কি আছে এই ধাতব টুকরায়?

উচ্চতা ৩৬.৮ সেন্টিমিটার, ওজন ৬.১৭৫ কেজি। ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের এই বস্তুর জন্যই এত আয়োজন। সেই ১৯৩০ সাল থেকে কত রথী-মহারথীরা কত ঝড়-ঝঞ্ঝা পেরিয়ে এই ট্রফি জয়ের জন্য করেছেন কত সাধনা। শুধু একবার ট্রফিতে চুমু খাওয়ার জন্য লড়াই করেছেন জীবন বাজি রেখে।

কত প্রতাপশালী ফুটবলার এই ট্রফি হারিয়ে রাজ্যের হতাশা নিয়ে মাঠেই বইয়ে দিয়েছেন অশ্রুর সাগর। এই সেই বিশ্বকাপ। ডিজাইন বদলেছে। সামনে আবারও বদলাবে। বদলাবে না শুধু এর গৌরব, বদলাবে না এর পিছনের গল্প।

বিশ্বকাপের ট্রফির আদলটা একসময় বর্তমান রূপে ছিল না। আগে এর নাম ছিল ‘ভিক্টোরি’ বা ‘কোউপ ডু মোন্ডে’। ১৯৪৬ সালে ফিফার সাবেক সভাপতি জুলে রিমের স্মরণে এর নাম হয়ে যায় জুলে রিমে ট্রফি। ১৯৩৮ সালে বিশ্বযুদ্ধের সময় ট্রফিটা ছিল বিজয়ী দল ইতালির কাছে।

নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে রক্ষার জন্য ফিফার সহ-সভাপতি অট্টোরিনো বারাসিস এটি ব্যাংক থেকে তুলে রোমে নিয়ে যান। লুকিয়ে রাখেন একটা জুতার বাক্সে। আবার ১৯৬৬ বিশ্বকাপের মাত্র চার মাস আগে লন্ডনে এক উন্মুক্ত প্রদর্শনী অনুষ্ঠান থেকে চুরি হয়ে যায় এই বিশ্বকাপ।

ব্লেচলি নামে এক সাবেক সৈনিক এটি চুরি করে। পুলিশ তাকে ধরতে পারলেও ট্রফিটি পায়নি। সাত দিন পর খবরের কাগজে মোড়ানো অবস্থায় লন্ডনের নরউড অঞ্চলের সাবারবেন বাগান থেকে একে উদ্ধার করে পিকেলস নামের একটি কুকুর, কুকুরটি ছিল ডেভ করবেট নামের এক ভদ্রলোকের। কুকুরটির মালিক ডেভিড করবার্টকে অবশ্য এর জন্য ছয় হাজার পাউন্ড পুরস্কৃত করা হয়।

আর ট্রফিটির বিনিময়ে ১৫ হাজার পাউন্ড দাবি করা চোরকে দেওয়া হয় দু’বছরের জেল। ১৯৭০ সালে তিনবার বিশ্বকাপ জয়ের পর এটা চিরতরে পেয়ে যায় ব্রাজিল। কিন্তু ১৯৮৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর আবারও চুরি হওয়ার পর আর কোনো হদিস মিলেনি ট্রফিটির। ধারণা করা হয় চোরেরা কাপটি গলিয়ে সোনা হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছে। তবে এর ভিত্তিটি সংরক্ষিত আছে জুরিখের ফুটবল মিউজিয়ামে।

এর আগেই, ১৯৭৪ সালে এসে বিশ্বকাপের ট্রফি বদলের সিদ্ধান্ত নেয় ফিফা। ডিজাইন আহবান করা হয়, সাতটি দেশ থেকে ৫৩ টি ডিজাইন এসে জমা পড়ে। তবে সবাইকে পাশ কাটিয়ে বিজয়ী হয়ে যান ইতালির শিল্পী সিলভিও গাজ্জানিগা। প্রথমে এর পুরোটা স্বর্ণ দিয়ে তৈরির পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রির অধ্যাপক মার্টিন পোলিয়াকফ মত দেন এত স্বর্ণ দিলে এর ওজন হবে প্রায় ৭০ কেজি।

এত ভারী ট্রফি তুলতে তো ফুটবলার নয়, লাগবে ভারোত্তোলক। তাই ট্রফির উপরের গোল অংশটি ফাঁপা করে বানানোর সিদ্ধান্ত নেয় ফিফা। আগের ট্রফি ‘চুরি’ যাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই কিনা এখন ফিফা অনেক সতর্ক। বিজয়ী দল স্রেফ উত্সবের সময়টাতেই পায় আসল বিশ্বকাপ। দেশে ফেরার সময় তাদের দেওয়া হয় একটা রেপ্লিকা। প্রথমবার এই ট্রফি জিতে পশ্চিম জার্মানি।

তবে, বিশ্বকাপ কিন্তু কেবলই একটা ট্রফি নয়। এর সাথে আছে আকাশচুম্বি প্রাইজমানি জয়ের হাতছানিও। রাশিয়া বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন দল প্রাইজ মানি পাবে ৩৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩১৮ কোটি ৩৪ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। রানার্স-আপ দল পাবে ২৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৩৪ কোটি ৫৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা। এমন তথ্য দিয়েছে ফুটবলের প্রধান সংস্থা ফিফা। আগামীকাল বিশ্বকাপের ফাইনাল। সেখানে লড়বে ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়া।

গত বছরের অক্টোবরে ফিফা জানায়, ২০১৮ বিশ্বকাপে মোট পুরস্কার মূল্য ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই পুরস্কার মূল্য ভাগ করে দেওয়া হবে অংশগ্রহণকারী ৩২ টি দলের মধ্যে।

২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে মোট পুরস্কার মূল্য ছিল ৩৫৮ মিলিয়ন। অর্থাৎ চলতি বিশ্বকাপে পুরস্কার মূল্য ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বেশি। ফিফা আরও জানায়, বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া সব দলই খরচ-বাবদ ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাবে।

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে ছিটকে পাওয়া দলগুলি পাবে আরও ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বেশি। শেষ ষোলো থেকে যে দলগুলো বাদ যাবে ছিটকে যাবে তারা পাবে আরও ১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে যারা বাদ পড়বে তারা পাবে ১৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে হেরে যাওয়া দল ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর যে দল জিতবে তারা পাবে ২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

https://www.mega888cuci.com