দ্য কিউরিয়াস কেস অব বেঞ্জামিন বাটন: মধুর সমাপ্তি কিংবা ট্র্যাজেডি!

চারদেয়ালে একলা যখন বন্দী থাকি কত কীই না ভাবি আমরা। উদ্ভট যত চিন্তাভাবনা। কখনো ভাবি, যে প্রক্রিয়ায় জীবন চলছে তার উল্টোরথে চলতো যদি? ঘড়ি কেন এভাবে ঘোরে? ওভাবে ঘুরলে হতোই বা কী? বিধাতার খেয়ালে আমরা বেড়ে উঠছি আমাদের মতো করেই।

‘বেঞ্জামিন বাটন’ – ঠিক প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার রাতে যার জন্ম! আঁধারের পর আলোর আগমন বুঝি একেই বলে? বোতাম ব্যবসায়ী বাটন সাহেবের ঘরে এলো নতুন অতিথি, সংবাদ শুনে ভাগতে ভাগতেই এলেন তিনি। পেলেন মৃতপ্রায় স্ত্রীকে, ফের ছুটলেন!

স্ত্রীকে দেয়া কথা রাখতে, সদ্যজাত সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। পিতার কোলের চাইতে আর কোথায় বা আছে মাতৃহারা সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর নিরাপদ আশ্রয়? এক চ্যারিটি হোমের সিড়িতে রেখে এলেন সন্তানকে, সঙ্গে ১৮ ডলার। সেখানকার সেবিকা ‘কুইনি’ (তারাজি হ্যানসন) বাচ্চাকে নিজ কামরায় নিয়ে কপালে তুলেন চোখজোড়া।

একি! এই শিশুর শরীরে যে বৃদ্ধের ছাপ, যেন অশীতিপর কোন বুড়ো প্রহর গুনছেন মৃত্যুর। ঘনিষ্ঠ ডাক্তারবাবু দেখেশুনে বলেই দিলেন, হাতে সময় নেই শিশুটির!

কখনো সখনো ঘটতে ঘটতেই বাঁক বদলায় কত ঘটনা। বেঞ্জামিনের জীবনের গল্পেও তেমনি বাঁকবদল। সেবিকা মায়ের প্রার্থনা, ভালোবাসায় বদলে যায় নিয়তি। ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেন, বার্ধক্যকে নিয়েই। সাত বছর বয়সে দেখা হয় তার মতোই অন্য একজনের সাথে, যার সঙ্গে কোথাও যেন মিল আছে!

সে বামুন মানুষ, গড়নে ছোট বলে সমাজে হাসির পাত্র। বেঞ্জামিনের ভালো লেগে যায় তাকে, জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের সূচনা ওই বামুনের হাত ধরেই। প্রতি সেকেন্ডে ঘটতে থাকা প্রতিটি ঘটনায় বাঁধা চেনা-অচেনা প্রত্যেকের ভাগ্য! ‘ডেইজি’র (কেট ব্লেনচেট) সাথে দেখা তখনই মেলে।

মা, ডেইজি আর বামুন ভদ্রলোক মিলে বেঁচে থাকার যে বীজ বুনে দেয় বুড়ো বেঞ্জামিনের হৃদয়ে সযত্নে তাকে পরিচর্যা করে গেছে সবটা নিংড়ে দিয়ে। জাহাজি হয়ে দুনিয়া ঘুরেছে, যুদ্ধ দেখেছে। সমুদ্র যুদ্ধ তার কাছে জীবন যুদ্ধে জয়ী হবার বইয়ে অনন্য এক অংশ যেখানে রঙিন আলপনায় উপভোগ করেছে প্রতি মূহুর্ত। জাহাজের সহকর্মী ট্যাঁটুশিল্পীর সঙ্গে, হোটেলে দেখা হওয়া অচেনা রমনীর সঙ্গে, বাইকে করে প্রকৃতির সঙ্গে।

প্রায় পৌনে তিনঘন্টা! রুদ্ধশ্বাস থ্রিল নয়, হিমশীতল ভয় নয়; তবু কোথাও যেন উৎকণ্ঠা ঠিকই ডালপালা মেলে। কী হচ্ছে, কী হবে? পিতার দেখা পাবে কখনো? অজস্র প্রশ্নের উত্তর রয়ে গেছে উনার কাছে। জীবনের এক এবং একমাত্র খেলার সাথী ডেইসি কি তাকে ভালবাসায় বাঁধবে নাকি সহানুভূতি পর্যন্তই সীমানা এঁকে দেবে? আচ্ছা, ডেইসি যখন বৃদ্ধ হবে বেঞ্জামিন হবে শিশু, তাহলে?

‘অল্প অল্প করে জীবনের গল্প চিরদিন সাজানো তো থাকবেই…’ – ১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘স্কট ফিৎজেরাল্ড’-এর ছোটগল্প ‘দ্য কিউরিয়াস কেস অব বেঞ্জামিন বাটন’ অবলম্বনে পরিচালক ডেভিড ফিঞ্চার অল্প অল্প করেই পর্দায় বেঞ্জামিনের পুরো গল্পটা সাজিয়েছেন। আর আমাদের ভাবিয়েছেন, শিখিয়েছেন হাজারো প্রতিকূলতার মাঝেও জীবনকে উপভোগ করতে, আত্নবিশ্বাসী হতে, সন্তুষ্ট থাকতে।

শুরুর দিকে একটু শ্লথ গতিতে এগোনো সিনেমাটি সময়ের সাথে অতটা গতিশীল না হলেও গল্পে ডুবে যেতে বাধ্য করেছে। পরিচালকের পর এতে অবশ্যই অবদান ‘ব্র্যাড পিট’-এর, যিনি অভিনয় মুন্সিয়ানায় হঠাৎ হঠাৎ ভাবাতে বাধ্য করেছেন ‘আদৌ সিনেমা দেখছি কি না’ এই ভেবে!

আর তাতে পূর্ণতা দিয়েছে অস্কারজয়ী মিউজিক কম্পোজার ‘আলেক্সান্ডার ডেসপ্ল্যাট’-এর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। আইএমডিবিতে ৭.৮ রেটিং, রটেন টম্যাটোতে ৭২ মার্ক পাওয়া সিনেমাটি তের বিভাগে মনোনয়ন আর ‘বেস্ট ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট, বেস্ট মেকআপ, বেস্ট আর্ট ডিরেকশন’ এই তিন বিভাগে অস্কায় পায় । মেক-আপের মুন্সিয়ানা, গল্পের উপস্থাপনে সমালোচক মহলে সমাদৃত হয়ে আদায় করে আরো গোটা বিশেক সম্মাননা।

গল্পের শেষটা কেমন? সিনেমায় মজে গেলে উপসংহার নিজেই টানতে পারবেন, কিন্তু এমন উপসংহার আপনি চাইবেন না। মধুুর সমাপ্তি বলতে পারেন, আবার ট্র্যাজিকও! ধাঁধায় পড়ে গেলেন? জীবনটাই তো একটা মস্ত ধাঁধা!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।