ক্লাসি একটা জাতি হুট করে এত খ্যাত হয়ে গেল!

একেকটা সময় আমার মনে হয় আমরা হয়তো কিছুটা কালচারাল আইডেনটিটি ক্রাইসিসে ভুগতেসি।অথচ এইটা তো হওয়ার কথাই ছিল না!

গানের ব্যপারটাই ধরেন। মাত্র সেইদিনি না উপল গাইল ‘তোর জন্য আমি বন্য’। তারপর তো আমি বেশ কিছুদিন ফুয়াদ উপলে মন্ত্রমুগ্ধ থাকলাম। ‘ছটফট সারা বেলা, দেবী তোমার দেখা নাই!’ কি অস্থির গান ছিল।

তার আগে বা পরে ঠিক মনে নাই বালাম গাইসিল ‘এক মুঠো রোদ্দুর হাতে, এক আকাশ নীল’! কিংবা লুকোচুরি খেলো না! বালাম হাবিবের সে কি ক্রেজ। আমরা পার্টি ফার্টিতে বাজাইতাম কৃষ্ণ আবার ব্রেক আপ হইলে বা নতুন নতুন প্রেম হইলেও আমরা কিন্তু হাবিবই শুনতাম- ‘মন-মুনিয়া’ বা ‘স্বপ্নের চেয়েও মধুর’ কিংবা ‘দিন গেলো’!

সুমন -আনিলার কথা মনে আছে? সে কি গান বানাইল খাসা! ‘গাইবো না আর কোনো গান, তোমায় ছাড়া!’ শুনে নাই এইরকম পোলাপাইন পাওয়া যাবে কি?

মাঝখানে ওই যে ‘এক পায়ে নুপূ ‘! আনিলা তো ব্র‍্যান্ড হয়া গেল ‘তীর্যক বাঁকা স্রোত’ দিয়া!

তপু আরেক জিনিয়াস। `মেয়ে তুমি এখনো আমায় বন্ধু ভাবো কী’ অথবা `একটা গোপন কথা ছিল বলবার’ শুনসেন না?

জুলির কথা মনে পড়ে? বালামের সাথে লতার রিমেক করল। `ও মোর ময়না গো!’ আর কণিকার `বলেছিলে এক নদী দু:খ হলে’ সারাদিনই শুনতাম।

খালিদ শুনেন নাই? ‘যদি হিমালয় হয়ে’ কিংবা ‘এ হৃদয় ভেঙে গেলে জানো কি তা লাগে না লাগে না জোড়া!’ তারপর ‘কোনো কারণে ফেরানো গেলো না তাকে’!

অর্ণব শুনসেন না? ছেলেটা বাংলা মিউজিকই চেঞ্জ কইরা দিল। কি সব লিরিক! ‘তোমার জন্য নীলচে তারার একটুখানি আলো!’ আরো আছে ‘সে যে বসে আছে একা একা’। আবার ‘হোক কলরব ফুলগুলো সব লাল না হয়ে নীল হলো ক্যান!’ কিংবা ‘কষ্টগুলো শিকড় ছড়িয়ে’!

অর্ণব শুনার পর যে কোনো মানুষের গান শোনার কান পরিবর্তন হইতে বাধ্য। শিরিনের কথা ভুলে গেলে ক্যামনে হবে? ‘পাঞ্জাবীওয়ালা’, ‘মাতওয়ালী’ দিয়া মেয়েটা দেশের একদম কোর গানগুলারে আলাদা ধাচে আলাদা কম্পোজিশনে তুইল্যা ধরল। এবং যথারীতি হিট।

মিলাও বেশ ভাল কিছু গান দিসিল। একদম ধামাকা গান গুলা বাদ দিলেও – ‘বলতে পারো, আমি না মেঘ কে বেশী আপন!’, ‘অগ্নিপুরুষ’ও বেশ মেলোডিয়াস লাগতো।

কণারে তো আমার সবসময়ই খুব বড় সিঙ্গার লাগে। অসম্ভব মিষ্টি গলা।

লিজেন্ডদের কথা বলব কি? আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, পার্থ বড়ুয়া, শাফিন আহমেদ, হামিন আহমেদ! কতজনের কথা বলব? কয়টা গানের কথা বলব?  লিজেন্ডের কথা বাদ দেই। সেইটা আপনাদের জন্য তোলা থাক!

আমি বরং দলছুটের কথা বলি। সঞ্জীব চৌধুরীরে ভুইল্যা গেসেন আপনারা? ক্যামনে কি ম্যান? ‘চোখটা এত পোড়ায় কেন, ও পোড়া চোখ সমুদ্রে যাও’ আর ‘আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল চাঁদ!’ এগলা কি ভোলা যায়?

সঞ্জীবের কথা আসলে বাপ্পা বাদ যায় কি করে? ‘বায়োস্কোপ’, ‘পরী’, ‘সূর্যস্নানে চল’, ‘বাজি’ বাপ্পা মজুমদারের কয়টা এপিক ক্রিয়েশন!

ফাহমিদা নবীও তো অনেকদিন মেলা হিটে চলল! ‘লুকোচুরি লুকোচুরি গল্প’ আম্মারও বহুত ফেভারিট ছিল। আমারো!

মাঝখানে আবিদ উঠল। সেকি ক্রেজ রবীন্দ্র সঙগীতের! নতুন কইরা আমরা আবার রবীন্দ্র শুনলাম আবিদের মুখে। পোলাটা মইরা না গেলে আরো কিছু ভাল গান গাইতো ফর শিওর।

হৃদয় ছেলেটাও শুরুতে তো ভালই চলসিল। ‘চাই না মেয়ে’, ‘বল না তুই বল না’, ‘অবুঝ ভালবাসা’ ডেইলী পাঁচবার কইরা শুনতাম।

ও হো হো। তাহসান বাদ পইড়া গেসে। মানুষজন আমারে পিটাইতে পারে। বাট বুকে হাত দিয়া বলতে পারবেন তাহসানের ‘আলো’, ‘বিন্দু’, ‘ঈর্ষা’ ‘প্রত্যাবর্তন’, ‘নেই’ – আপনি একবারো শুনেন নাই? তাহসানরে অস্বীকার কইরা পশ সাজা যায় বাট হিস্টোরিতে তাহসান থাকবেই!

আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ডগুলার কথা না বলি। ক্রিপ্টিক ফেইট, স্টেকইবিলিস, মেঘদল, শহরতলী অনেকগুলা নাম উইঠা আসবে।

ব্যান্ডের কথা কইতে গেলে আরেকটা লেখা লাগব। শালার নগরবাউল, এলআরবি, মাইলস, ওয়ারফেজ, আর্ক, আর্টসেল, প্রমিথিউস, দলছুট! হাঁপায়া গেলাম।

আচ্ছা ভাল কথা আমরা তো টুকটাক মহীনের ঘোড়াগুলিও শুনসি। তখন জানতাম না কলকাতার ব্যন্ড। ‘তারারাও যত আলোক বর্ষ দূরে!’, ‘শহরের ঊষ্ণতম দিনে’, ‘চৈত্রের কাফন’, ‘ধাঁধার চেয়েও জটিল’ – এগুলারে খুব আপনা গান লাগতো। লিরিক্স শুনে চমকায় উঠতাম। একটা গানের কথা এমনও হইতে পারে!

মানে বিতং কইরা এত গানের বর্ণনা দেওয়ার কারণ হইল আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে এই যে এত রুচিশীল গান আমরা শুইনা শুইনা বড় হইসি সেই আপনেরাই এখন কেমনে ‘বুক চিনচিন করছে হায়, মন তোমায় কাছে চায়!’ তারপর ‘তুমি হলে বাবু আমি তোমার হিরো!’, ‘বাবু খাইসো’ এই গান গুলা শুনেন? শুধু শুনেনই না, শুধু শুনলে আমার কোনো আপত্তি ছিল না। আপনার কান, আপনার গান আমার কি?

 

আমার প্রব্লেম হইল এই গানগুলারে আপনারা প্রমোট করেন, সগর্বে শেয়ার দেন, বন্ধুবান্ধবরে দেখায়া ভিউজ বাড়ান,ভাইরাল করেন! রুচিতে বাঁধে না একটুও? মানে ক্যামনে ম্যান?

প্লিজ এইটা বলতে আইসেন না সার্কাজম করেন। এইটা একটা পুরা খোঁড়া যুক্তি লাগে। বিষয়টা বলি। হুমায়ূন আহমেদের আজ রবিবারও একটা সার্কাস্টিক নাটক ছিল এখনকার ব্যাচেলার পয়েন্ট ও কয় কমেডি নাটক। ব্যপারটা কি রুচির পার্থক্য লাগে না আসলে? সার্কাজম করে হইলেও আপনারা যে  খুবি ইনকাল্ট একটা জিনিসরে প্রমোট করতেসেন এটা বুঝেন?

এত ক্লাসি একটা জাতি থেকে আমরা হুট করে এত খ্যাত কেমনে হয়ে গেলাম? এইটা একটা রহস্য না?

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।