শুধুই একটা ‘থাপ্পড়’ নয়!

‘থাপ্পড়’ দেখলাম, দেখার পর অনেকগুলো রিভিউ পড়লাম। কিন্তু আমার মনে হল এই রিভিউগুলো কোনোটাই ‘থাপ্পড়’ ছবিকে রিপ্রেজেন্ট করতে পারেনি। কিংবা, আমি এই ছবি থেকে সেটা বুঝেছি সেটা কোথাও জানি অনুপস্থিত ছিল। কেউ কেউ সস্তা ফেমিনিজম, নারী জাগরণ কিংবা ‘থাপ্পড় মারা ঠিক না’ এসবের জয়গান গেয়েছেন। বুঝেছিয়েছেন ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স ঠিক না এটা করা উচিত না, তাকে ভালোবাসুন, ব্লা ব্লা ব্লা অনেক কিছু। কিন্তু, আসলে ‘থাপ্পড়’ এর মর্মার্থ আরো গভীর। ফেমিনিজম, ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স কিংবা চলে আসা সিস্টেমের ভুল ত্রুটি ধরার থেকেও অনেক উপরে ‘থাপ্পড়’-এর বার্তা।

‘থাপ্পড়’ ফেমিনিজ নয় ববং মনুষ্যত্বের জয়গান গেয়েছে, গেয়েছে মনের জয়গান। মন থেকে যদি কোন কিছু আসে তাহলে সেটা করতে না করছে তা যত কঠিনই হোক। শুধু সমাজের ভয়ে কিংবা মানুষ কি বলবে এই জন্য মনের কথা শোনা যাবে না এটার বিপক্ষে বলেছে। ‘থাপ্পড়’-এর বার্তা অনেক বেশি দূরদৃষ্টি সম্পন্ন। একমাত্র মানসিকভাবে শক্তিশালী এবং পরিস্কার হলেই শুধু নারীর মুক্তি নয়, পুরুষেরও মুক্তি মেলে – ‘থাপ্পড়’ সে কথা বলেছে।

‘থাপ্পড়’-এ একই সাথে ছয়টি গল্পের সমন্বয় দেখানো হয়েছে। সিঙ্গেল মাদার, দুই পৌঢ় দম্পত্তি, একটি পরকীয়া, মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং, অমৃতা এবং গৃহপরিচারিকার গল্প। শুধু ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সই ভায়োলেন্স নয়, মানষিকভাবে একজন মেয়ে যে স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলছে সেটাও একটা ভায়োলেন্স।

সে তো নিজেকে মেরে ফেলে অন্য কেউ হবার চেষ্টা করছে কিন্তু আসলেই কি এই মুখোশে তার মুক্তি মেলে। কেউ আবার ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সকে ভালোবাসা মনে করে থেকে যাচ্ছে, কেউ বা সুখ খুজে নিচ্ছে অন্যের বাহুডোরে লোকচক্ষুর আড়ালে। কিন্তু কেন? মনের আনন্দের জন্য। মানুষের ঠিক বেঠিক হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে শুধুমাত্র মানসিক শান্তি লাভের জন্য কিন্তু সঠিক পথে থেকেই যে মনের চাহিদা পূরণ করা যায় থাপ্পড় সে কথা বলেছে।

পুরুষ মানুষ মানেই রাফ এন্ড টাফ হবে, সবর্দা ক্যারিয়ার ফোকাস হবে এটা আসলে না। টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি সমাজকে কতটা বাজেভাবে ইম্প্যাক্ট করছে সেটা দারুণভাবে প্রোট্রেট করেছে বিক্রম চরিত্রের মধ্য দিয়ে। নিজের ভুলকে ভুল হিসাবে না দেখে পুরুষত্ব দেখিয়ে পুরষশাসিত সমাজের চিত্রটা তুলে ধরেছে। পুরুষরা কাঁদতে পারবে না, কিন্তু তার সকল রাগ ‘অধিকার’ হিসেবে স্ত্রীর উপর ঝাড়তে পারবে এটা আসলেই টক্সিক ব্যাপার। সামান্য একটু অনুশোচনা হয়তো বেধে দিতে পারত ক্ষয়ে যাওয়া সম্পর্ককে কিন্তু পুরুষ মানেই ‘জ্বলে পুরে ছাড়খার কিন্তু মাথা নোয়াবার নয়’।

ফেমিনিজম মানে রাস্তার দাড়িয়ে মূত্র বিসর্জন নয়, ফেমিনিজম মানে নো ব্রা ডে বলে স্তন প্রদর্শন নয়, ফেমি মিনিজম মানে সামাজের সাবাইকে বোঝানো মেয়েদের সুন্দর স্বপ্নকে বাড়তে দেওয়া উচিত, সেগুলোকে অঙ্কুরে বিনষ্ট হতে দিতে হয় না। এর জন্য পুরুষকে সাহায্য করা উচিত, জিজ্ঞাসা করা উচিত ‘তোমার ভালোলাগার কাজগুলো চল একসাথে করি, কিংবা তুমি এগিয়ে যাও কিছুটা সময় তোমার মত করে নিয়ে।’

ভায়োলেন্স হলেই ডিভোর্স দিয়ে দাও সেটাও দেখায় নি ‘থাপ্পড়’-এ। যদি ভায়োলেন্সের পর ভালোবাসা থেকে থাকে তাহলে হয়তো নতুন সকালে উঠে আবার একসাথে পথচলা যায় কিন্তু যদি ভালোবাসা না থাকে, তা যদি খুঁজেই পাওয়া যায় না আর অনেক চেষ্টা করেও তাহলে আলাদা হয়ে যাওয়া ভালো।

কারণ, ভালোবাসাহীন বাগানে ফুলের সৌন্দর্য থাকে না, আগাছাগুলো তখন চারদিক থেকে জড়িয়ে ধরে। তাই ভালোবাসাহীন বাগানের ফুল হবার থেকে, কচুরিপানার ফুল হওয়া অনেক ভালো। জীবনে চলতে হলে সঙ্গী প্রয়োজন কিন্তু তার থেকেও প্রয়োজন বিশ্বাস। বিশ্বাসহীন ভালোবাসার থেকে বড় ধোঁকা কিছু নেই। ভালোবাসার বিশ্বাসের উপর একাকী বেঁচে থাকা যায় কিন্তু বিশ্বাসহীন ভালোবাসা পুরো জড়বস্তুর মত, ব্যবহার করা যায় কিন্তু মনের খোরাক মিটানো যায় না।

ভালোবাসা অর্জন করে নিতে হয়, সম্মান করতে হয় তাকে, বিশ্বাস থাকতে হয়ে সেখানে। ভালোবাসায় অধিকার থাকবে তবে সেটা কখনোই গায়ে হাত তোলার নয়। থাপ্পড় টা আসলে তাপসী পানুর গালে ছিল, থাপ্পড়টা অনুভব সিনহা মেরেছেন মেয়েদের আমিত্বের উপর, ভালোবাসা বলে যা ভাবছে তারা তার উপর।

https://www.mega888cuci.com