প্রস্তর যুগের ক্রিকেট, মিডিয়ার ‘ঢাল’ ও তামিম ইকবাল

বাংলাদেশ ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জেতার খুব কাছাকাছি গিয়েছিল, পাকিস্তান সিরিজে খেলছে প্রস্তরযুগের ক্রিকেট। হার-জিত অন্তিম ফল মাত্র, ইনটেন্ট এবং এপ্রোচই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। দলের একজন ব্যাটসম্যানও বিগশট খেলার চেষ্টা করছে না, ব্যাপারটা রহস্যজনক। পাকিস্তানের বোলিং লাইন আপে সাদাব খান আর ইমাদ ওয়াসিম বাদে বাকিরা অনভিজ্ঞ; অথচ সেইসব বোলারকে একদমই স্ট্রোক খেলতে পারছে না বা খেলার চেষ্টা করছে না। টি-টোয়েন্টিতে ১৩০-৩৫ রান তখনই হয় যখন ২০-৩০ রানের মধ্যে ৪-৫ উইকেট হারিয়ে বসে কোনো দল, অথচ দুই ম্যাচেই বাংলাদেশ উইকেট হারিয়েছে মাত্র ৫-৬টি। হাতে এতগুলো উইকেট রেখে রান কম হওয়ার ব্যাখ্যা নেই আসলে।

তামিম ইকবালই কি মূল কারণ? অন্য ব্যাটসম্যানরা কী করছে তবে? নোমান মোহাম্মদ নামের এক স্পোর্টস জার্নালিস্টের দুটো ইউটিউব লাইভ দেখলাম।তিনি বললেন, ‘তামিমকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ক্রিকেট এফোর্ড করতে পারে না এখনো, যেহেতু সাকিব আর মুশফিক নেই।’ আজকের লাইভে তার বক্তব্য শুনে রীতিমত ক্ষোভের উদ্রেক হলো। বললেন, তামিম গতকালকের ম্যাচে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোরার আজ সর্বোচ্চ, তামিম গতকাল ১১ ওভারে ৭১ রান থাকা অবস্থায় আউট হয়েছে, বাকি ব্যাটসম্যানরা ৯ ওভারে কিছু করতে পারলো না কেন।

এ ধরনের স্ট্যান্ডপয়েন্টকে হলুদ সাংবাদিকতা বলা উচিত। বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টিতে সচরাচর জেতে না, তবু যেসব ম্যাচ জিতেছে সেখানে একটা অনিবার্য শর্ত পূরণ করেছে; প্রথম ৬ ওভার আর শেষ ৪ ওভারে গড়ে ৮ বা তার বেশি হারে রান তুলেছে। বিশ্বের যে কোনো দেশে, যে কোনো উইকেটে এখন টি২০ এর পার স্কোর ১৭০, এমনকি এই রানও সবসময় কম্পিটিটিভ নয়। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে বাংলাদেশ যদি ১৮০-৯০ চেইজ করে তখন তামিমের ব্যাটিং এপ্রোচ কি মানানসই? উত্তর যদি ‘না’ হয় আগে ব্যাট করার ক্ষেত্রে তবে মানানসই কেন হবে; কারণ জিততে হলেও আপনাকে ১৭০-৮০ টার্গেট করেই ব্যাট করতে হবে আদতে।

টি-টোয়েন্টিতে ধুমধাড়াক্কা ব্যাটিং করতে গিয়ে যদি ১৪ ওভারে ১১০ রানে অল আউট হতে হয় সেটাও গ্রহণযোগ্য, কিন্তু পাওয়ার প্লে তে ৩৫-৩৬ রান তুললে ১০০ করতেই ১৬ ওভার চলে যাবে। আপনারা খেয়াল করে দেখবেন, ৭ম থেকে ১৫ তম ওভার পর্যন্ত রানরেট কমে যায় যে কোনো দলের। ফলে ৬ ওভারে ৩৬-৩৭ তুললে বাকি ১০ ওভারে যদি ৬-৭ হারে রান তোলা হয় ১৬ ওভার শেষে রান হবে মাত্র ১০৫-১৬; বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ওভারপ্রতি ১৬ রান তোলার সামর্থ্য নেই যে ২০ ওভারে ১৭০ তুলতে পারবে; রিদমে থাকলে শেষ ৪ ওভারে বড়োজোর ১৩ হারে রান করতে পারবে। তাহলে উপায় একটাই- নতুন বলে পাওয়ার প্লে কাজে লাগিয়ে ৯-১০ হারে রান তোলা।

তাতে পাওয়ার প্লে তে ৫৪-৫৫, মাঝের ১০ ওভারে ৭ হারে ৭০, শেষ ৪ ওভারে ১২.৫হারে ৫০, তাতে রানটা ১৭৫ হয়। এটাও কিন্তু কম্পিটিটিভ নয়, কম্পারেটিভ হতে পারে। সেক্ষেত্রে ওপেন করাতে হবে সেইসব ব্যাটসম্যান দিয়ে যারা ১৪০ এর আশপাশে স্ট্রাইকরেট রাখতে পারবে। এরকম ব্যাটসম্যান আছে মাত্র ৩ জন- লিটন, সৌম্য আর আফিফ। যদি এরা রান করতে না পারে দ্রুত আউট হয়ে যাবে, বল নষ্ট করবে না। কিন্তু আপনি তাদের ঠেলে দিচ্ছেন মিডল অর্ডারে বা লোয়ার অর্ডারে, যতক্ষণে ডট বলের প্রেসার তৈরি হয়েই আছে। ওয়ানডেতে ওপেনাররা মিডলে ব্যাট করতে পারে, কারণ ওভার পাওয়া যায় প্রচুর। টি২০ তে ওপেনারদের পক্ষে মিডলে ভালো করা সম্ভব নয়, কারণ শুরুর দিকে ওভার দ্য টপ খেলে যেসব শটে চার বা ছক্কা পাওয়া যেত সেটা তখন ক্যাচ হয়ে যাবে।

তামিমের প্রেডিক্টেবল ব্যাটিংয়ের কারণে প্রতিপক্ষ দলের গেমপ্ল্যান করা সহজ হয়ে যায়, তারা তামিমকে বেশিসম্ভব স্ট্রাইকে রাখতে চাইবে, অন্য ব্যাটসম্যানদের জন্য ফাঁদ তৈরি করবে। লেগ স্ট্যাম্পে পিচ না করলে বা নিখাঁদ হাফভলি ছাড়া তামিম কোনো বলেই স্ট্রোক খেলার চেষ্টা করে না। পার্ট টাইমার পেলে, বিশেষত সে যদি স্পিনার হয় তাকে ডাউন দ্য উইকেটে ছক্কা মারার চেষ্টা করে। অন্য দেশের কথা বাদ দিই, বাংলাদেশেই কি কখনো এমন হয়েছে টি২০ তে একজন ব্যাটসম্যান ৫০ করেছে অথচ ২০ ওভার শেষে রান ১৪০ও হয়নি? সমস্যাটা তবে কোথায়?

টি-টোয়েন্টি প্রথম ৫ ব্যাটসম্যানের খেলা; একজন বড় স্কোর করলেই দলের স্কোর কম্পিটিটিভ হবে, একাধিক জন করলে হবে রান উৎসব। তাই বাকিরা কেন রান করেনি এটা অক্রিকেটিয় চিন্তা। প্রথম ৫ ব্যাটসম্যানের যে যেদিন বড় রান পাবে সে-ই ক্যারি করবে। এমনকি মোহাম্মদ মিঠুন যদি কোনোদিন ৬০ রান করে নিশ্চিতভাবে দলের রান ১৬০ পার হবে; কেবল তামিমের ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রম কেন? নোমান মোহাম্মদ টাইপ সাংবাদিকদের কাছে আছে কি কোনো ব্যাখ্যা?

বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে চিন্তামূলক লেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি ২০১৯ এর বিশ্বকাপের পর থেকেই। ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত একটানা হেরেছে বাংলাদেশ, তবু খেলা দেখেছি। তাই জয়-পরাজয় নিয়ে মাথা ঘামাই না খুব। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এসব যদি খেলার মধ্যেও দেখতে হয় সেটা বিরক্তিকর। ডোমিঙ্গো কোচ হিসেবে কেমন তা বিচারেরই সুযোগ থাকবে না কারণ সে কি তার পছন্দসই দল পাচ্ছে?

দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলের কোচিং করিয়ে এসেছে সে, স্বাধীনমতো কাজ করতে পারলে তামিমকে কখনোই সে লাল বলের ক্রিকেটের বাইরে চিন্তা করতো না, রিয়াদকে টেস্টে খেলাতো না, মিরাজ-মুস্তাফিজকে বাদ দিত। সে বুঝে গেছে মাত্র ২ বছরের চাকরি, এত পছন্দ-অপছন্দের দরকার নেই, বসের মনরক্ষা করাই যথেষ্ট। আজ থেকে ১৫-১৬ বছর আগে জাভেদ ওমর যখন খেলতো, মানুষজন বিরক্ত হতো, এখনকার মতো ফেসবুক থাকলে তাকে নিয়ে নিশ্চিতভাবেই প্রচুর ট্রল হতো।

তার ব্যাপারে প্রধান অভিযোগ ছিল একপ্রান্ত ধরে রাখার নামে সে প্রচুর ডট বল দেয়। তামিম, মুশফিকরা সেই প্রজন্মের চাইতে বেটার ব্যাটসম্যান ছিল, কিছু ম্যাচ জিতিয়েছে, সময়ের সাথে সাথে মুশফিক নিজের ব্যাটিংয়ে পরিবর্তন এনেছে, তামিম তা আনতে পারেনি। তবু পাপন তামিম, রিয়াদদের উপর আস্থা রাখে কারণ নতুন যারা এসেছে তাদের পারফরম্যান্স নেই। যদি সামান্যতম ধারাবাহিকতাও থাকতো তামিম, রিয়াদরা ২০১৭ তেই বাদ পড়ে যেত। সৌম্যের মতো সুযোগ বাংলাদেশের ইতিহাসেই কেউ পায়নি, সাব্বির নিজের উশৃংখলতার বলি হয়ে খরচার খাতায় চলে গেছে, ২০১৮ থেকে টানা খেলার মধ্যে আছে লিটন দাস – কিন্তু পারফরম্যান্স উল্লেখযোগ্য নয়, নাজমুল হোসেন শান্ত যখনই সুযোগ পায় প্রতিবার ব্যর্থ হয়, আফিফ স্লগিং ছাড়া শট খেলতে পারে না এখনো, মোসাদ্দেক যাওয়া-আসার মধ্যেই থাকে; একমাত্র মমিনুল একসময় কিছুটা ধারাবাহিক ছিল। তরুণরা যেহেতু আহামরি কিছুই করতে পারছে না, পাপন সাহেব পুরনোর প্রতিই আস্থা রাখে।

তবে এই জায়গাতে সে একটা টেকনিকাল ভুল করছে। পুরনোদের রেখেও ম্যাচ যেহেতু হারতেই হচ্ছে, সেক্ষেত্রে যারা দীর্ঘদিন খেলতে পারবে তাদের উপরই বিনিয়োগ করা উচিত৷ এখনকার চাইতে কতটুকুই বা খারাপ করা সম্ভব! তামিম, মাহমুদুল্লাহ, মুশফিক, সাকিবের পক্ষে চাইলেও কি ২০২৪ এ খেলা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে? তারপর কি এদেশে ক্রিকেট খেলা বন্ধ হয়ে যাবে?

হারছেই যেহেতু, ফ্রেশ ব্লাডদের নিয়ে হারুক; তাতে বরং কম্পিটিশন বাড়বে, রাডারে নতুন খেলোয়াড় যুক্ত হবে; ঘুরেফিরে ইমরুল, মিঠুন, এনামুল বিজয়ের বাইরেও আরো প্লেয়ারদের দেখার সুযোগ হবে। নইলে সামনের চার বছরে হারের সংখ্যা আরো বাড়বে। দলের গঠনগত পরিবর্তন আনতে হবে, সাময়িক হারলেও সেই দলের উপরই আস্থা রাখতে হবে। ২০১৯ বিশ্বকাপের পরই তা উপলব্ধি করা উচিত ছিল, দেরি হয়ে যাচ্ছে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।