জীবনটা ‘তামাশা’ নয়!

‘নিজের গল্পে পার্শ্বচরিত্র হওয়া’ ব্যাপারটা ভেবেছেন কখনো? আপনার নিজের জীবনে অন্যদের প্রভাবটা কেমন, সমাজের প্রভাবটা ভেবে দেখেছেন কোনোদিন?

সুখ, ভালো জীবনযাত্রার ব্যক্তিগত সংজ্ঞা ভুলে সমাজের চোখে সুখ, ভালো জীবনের পেছনে ছোটা মানুষ সমাজে কম নেই। সমাজ নির্ধারিত সুখের পেছনে ছুটতে যাওয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও নেহাৎ কম নয়। আখেরে জীবনটা তো আপনার! তেমনই এক গল্প ইমতিয়াজ আলী বলেছেন তাঁর তামাশা ছবিতে।

জগদ্বিখ্যাত সুফি কবি রুমি বলেছিলেন, ‘যেসব গল্প তোমার বহু আগে বলা হয়ে গেছে, সেসবে সন্তুষ্ট থেকো না। নিজের গল্পটা নিজে লেখো।’ তামাশার সবচেয়ে বড় বার্তাটা এখানেই। গল্পের নায়ক বেদের শৈশব আর যৌবনের বৈপরীত্য কিংবা করসিকার ‘ডন’ বেদ আর ভারতে এসে নয়টা-পাঁচটার যাপিত জীবনের যাঁতাকলে পিষ্ট বেদের চরিত্রের দুই মেরুর অবস্থান তুলে ধরে দর্শকদের মগজে সেটাই গেঁথে দিতে চেয়েছেন ইমতিয়াজ আলি।

এটা একটা গল্পকথকের গল্প, পরিচালকের গল্পও। যেখানে দেখা মেলে শহরতলী থেকে বহু দূরে থাকা এক বুড়োর, যিনি অর্থের বিনিময়ে ছোট্ট বেদকে গল্প শোনান। এক দিনের অসমাপ্ত গল্প পরদিন শুরু করেন অন্য কোনো গল্প থেকে। বেদ এ নিয়ে প্রশ্ন তুললে বুড়োর উত্তর, ‘আরে সব গল্পই প্রায় একই রকমভাবে শেষ হয়। তাই, প্লটের চিন্তা বাদ দিয়ে গল্পের স্বাদ নিতে শেখো।’

পরের দৃশ্যেই আবার দেখা মিলবে দূর পরবাসে এক রোলপ্লেয়িং জুটির, যারা একে অপরের কাছে অপরিচিত থেকেই সপ্তাহ পার করার অলিখিত চুক্তি সাক্ষর করে।

এমন নন-লিনিয়ার স্ক্রিনপ্লে অবশ্য পরিচালকের জন্যে নতুন কিছু নয়। গল্পের ‘বেদ’ রনবীর কাপুরকে নিয়েই বছর পাঁচেক আগে করা রকস্টার কিংবা গল্পের ‘তারা; দীপিকা পাডুকোনকে নিয়ে বানানো লাভ আজ কালও ছিলো একই ঘরাণার। তবে সেসবের চলচ্চিত্রের সঙ্গে এর কিছুটা পার্থক্য আলবত আছে। সময় আর অভিজ্ঞতা আরও ঋদ্ধ করেছে পরিচালককে। তারই ছাপ মিলেছে তামাশায়।

ছবিটাকে যাপিত জীবনের প্রতি ইমতিয়াজ আলির একটা স্যাটায়ারও বলা চলে। দর্শকদের সিংহভাগ যে জীবনে অভ্যস্ত, যে জীবন আমাদের নিজেদেরকে ঘৃণা করতে বাধ্য করে, সে জীবনের প্রতি। তামাশা দর্শকদের কানে একটা তীব্র আর্তনাদ। কেবলমাত্র সমাজের চোখে একটা ভালো জীবনযাত্রার জম্য ঘৃণ্য সব মিথ্যা আর অনুশোচনার চাদরে নিজেকে মুড়ে ফেলতে বাঁধা দেয় তামাশা।

এটা হারানো সব শিল্পীদের গল্পও। সেসব শিল্পী, যারা একসময়ে বেদ এর মতো একাধারে স্বপ্নদ্রষ্টাও ছিলো; কালের বিবর্তনে যাদের চোখে এখন আর স্বপ্ন ধরা দেয় না, ধরা দেয় যাপিত জীবনের তীব্র জরাক্রান্ত বাস্তবতা। ফলশ্রুতিতে নিজের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণাই হয় তাদের নিয়তি।

তামাশা, একটা কামিং অফ মিডল এজ ঘরাণার চলচ্চিত্র যেটা ভিন্ন ভিন্ন ধরণের আবেগ অনুভূতি দিয়ে আপনার মনের দরজায় কড়া নাড়ে।

একটা ছবির পোস্টার দিয়ে নাকি ছবির ভাবটা বুঝে নেয়া যায়। তামাশা এখানেও আপনাকে চমকে দেবে। রোম্যান্টিক ঘরাণার পোস্টার দেখে মুভি দেখতে বসে কিছু পরই আপনি আবিষ্কার করবেন ভিন্ন কিছু৷ পাওয়ার পয়েন্টের প্রেজেন্টেশন গড়গড় করে উগড়ে দিতে থাকা বেদকে দেখে অবচেতনে নিজের কথা আপনি ভাববেন এটা বাজি ধরে বলা যায়। ইমতিয়াজ আলির মুন্সিয়ানা এখানেই।

পরিচালকের মুন্সিয়ানা আরও বহু জায়গায় মিলেছে দারুণভাবে। তার উল্লেখযোগ্য অংশটা জুড়ে যে ‘তারা’ থাকবেনই, তা বলাই বাহুল্য। গড়পড়তা বলিউডি চলচ্চিত্রে খুব নায়ক লাউড রোলে থাকলে বিপরীতে সাধারণত দেখা মেলে ঘরোয়া, সতীসাধ্বী গোছের একটা ভূমিকার। কিন্তু ইমতিয়াজ আলি দীপিকাকে দিয়ে এখানে নর্তনকুর্দন যেমন করিয়েছেন, মোক্ষম সময়ে রনবীরের কাছে তার বদলে যাওয়া চরিত্রটাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে, নিজেদের হারানো ভালোবাসাকে ফিরিয়ে আনার মিনতি করাতেও পিছপা হননি একটুও।

রোবট বেদের বিপরীতে রোম্যান্টিসিস্ট তারার উপস্থিতিই মূলত ছবিটাকে নিয়ে গেছে একটা ‘ফিল গুড’ গোছের সমাপ্তির দিকে। দিনশেষে, এটা হয়েছে রোম্যান্টিক ছবিই, তবে গড়পড়তা বলার জো মোটেও নেই।

গল্পের পাশাপাশি মুভিটাকে উপভোগ্য করে তুলেছে রবি বর্মনের করা নান্দনিক সিনেম্যাটোগ্রাফি। এআর রেহমানের করা আবহ সঙ্গীতও। তার করা দুর্দান্ত সব সুরকে গল্পের ভাঁজে ভাঁজে গেঁথেছেন ইমতিয়াজ, যাতে করে কখনো সুর গল্পকে ছাপিয়ে যায়নি, কিছু কমও মনে হয়নি।

বহুমাত্রিক এক চরিত্রে রণবীর নিজেকে ছাপিয়ে গেছেন দারুণভাবে, রকস্টারের পর এই ছবিতে তাঁর অভিনয়কে ক্যারিয়ারসেরাও বলে দেয়া যায় নিঃসংকোচে। দীপিকাও দুর্দান্ত ছিলেন সমানভাবে। শুরুর দিকে কিছুটা অতিরঞ্জন থাকলেও শেষের দিকে চরিত্রে মিশে গিয়েছিলেন পুরোপুরি।

তামাশায় গল্পের তীব্রতা যেমন ছিল, তেমনি ন্যারেটিভ ড্রিফটও ছিলো সমানভাবে । সঙ্গে যোগ করুন নন লিনিয়ার গল্প বলার ধরণকে। সবকিছুর মিলিয়ে ইমতিয়াজ আলি ১৪০ মিনিটের একটা জাদুই দেখিয়েছেন। একটা চলচ্চিত্র বানিয়েছেন যেটা জীবনের প্রতি, এর বিশালতার প্রতিই একটা ছোট্ট উপহার কিংবা শ্রদ্ধা নিবেদন।

https://www.mega888cuci.com