দীর্ঘস্থায়ী এক শিহরণের নাম ‘টেক অফ’

নারী শব্দটা নিছক ছোট। তবে,  সুন্দর এই পৃথিবীতে সবার আগমনই এই সত্ত্বাকে ঘিরে। তবে কখনো আদৌ এই পুরুষপ্রধান সমাজ সেই নারীত্বের যন্ত্রনাটা উপলব্ধি করতে পারে। কেউ কেউ হয়তো পারে, কিন্তু, অনেক সামাজিক রীতিই সেই চিন্তাটাকে বোতলবন্দী করে রাখে। সবাই তাই প্রচলিত ভাবনার অনুসারেই ভাবতে শুরু করে।

বিশেষ করে উপমহাদেশে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন এসেছে খুব সামান্যই। তার পেছনে কখনো সমাজের দোহাই দেওয়া হয়, কখনো বা ধর্মের। অনেকাংশেই হয়তো সমস্যাগুলো কমে এসেছে, কিন্তু পুরোপুরি মিলিয়ে যায় নি। কেউ শেকল ভেঙে কর্মক্ষেত্রে গেলেও তাদের সহ্য করতে হয় নানান বঞ্চনা। আর মানুষের লোলুপ দৃষ্টি তো আছেই।

নারীরা স্বাধীনচেতা হয়ে যদি নিজের পরিবারের জন্য কিছু করতে চায় তাতেও আসে বাঁধা। অনেক সময়ে তার জের ধরে সম্পর্কেও আসে ফাঁটল। ২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া মালায়ালাম ছবি ‘টেক অফ’ সত্যি ঘটনা অবলম্বন করে নির্মিত হলেও এই ছবিটি অনেক রকম সামাজিক বাস্তবতারও চিত্র দর্শকের চোখে আঙুল ‍দিয়ে দেখিয়েছে।

ছবির গল্প আবর্তিত হয়েছে সামিরা নামের এক নার্সের জীবনকে ঘিরে। ভারতের কেরালা রাজ্যের বাসিন্দা সে। ২০১৪ সালে তিনি-সহ  জন নার্স আটকা পড়েছিলেন ইরাকের এক হাসপাতালে। আর সেখান থেকে বের হয়ে আসেন অসামান্য বীরত্ব দেখিয়ে। ছবিটি ও সামিরা নামের এই চরিত্রটি নির্মিত হয়েছে বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে।

বাস্তবের ঘটনায় ছিলেন ৪৬ জন নার্স, ছবিতে বলা হয় ১৯ জন নার্সের কথা। মূল ঘটনার সাথে সিনেমার স্টোরি টেলিংয়ে বেশ কিছু পার্থক্য আছে, কিন্তু মূল সুরটা একই। একই ঘটনা অবলম্বনে বলিউডে সালমান খান ও ক্যাটরিনা কাইফকে ‘টাইগার জিন্দা হ্যায় নির্মিত হয়। কিন্তু, সেটা একদমই ভিন্ন ঘরানার ছবি।

মূল ঘটনাতে সামিরার চরিত্রটি ছিল। রাজেশ পিল্লাই এর মনে সামিরার এই দুঃসাহসী গল্প ছুঁয়ে যায়। তিনি নিজ প্রোডাকশনে চিন্তা করেন সিনেমাটির রূপ দিতে। পরে পরিচালক মাহেশ নারায়ণের সাথে এই ব্যাপারে বৈঠক করেন। সিনেমার প্রোডাকশন সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে আসলে আকস্মিক ভাবে রাজেশ পিল্লাইয়ের মৃত্যু সবার মনে নাড়া দিয়ে উঠে।

পরে তাঁর প্রোডাকশন হাউজ থেকে সিদ্ধান্ত হয় তার স্মৃতিচারণে এই সিনেমা যেন সম্পন্ন হোক তার সু-ব্যবস্থা যেন করে সিনেমার সাথে জড়িত বিশিষ্টগণ। পরবর্তী তে মাহেশ নারায়ণ সিনেমার স্ক্রিপ্ট তৈরি করে বাস্তব ঘটনাটি কে সিনেমায় রূপ দেন। সিনেমা ২০১৬ এর শেষ দিকে রিলিজের কথা থাকলে পরে আরো কিছু যোগ-বিয়োগ করে ২০১৭ সালের মার্চ মাসে সিনেমা মুক্তি পায়।

ছবির গল্পে যায় এবার।

সামিরা একজন নার্স, যার উপার্জনের উপর তার বাবার পরিবার চলে। তবে পারিবারিক লোন ও অন্যান্য সাংসারিক খরচ মেটাতে সামিরা হাসপাতালের কাজে অতিরিক্ত সময় দিয়েও তেমন সুবিধা করতে পারছিল না। শাহিদ নামের এক মধ্যবয়স্ক লোক সামিরাকে ভালবেসেই এই হাসপাতালে নার্সের কাজে লেগে আছে। সামিরা খিটখিটে স্বভাবের, তাই শাহিদের কথায় কর্ণপাত করতো না। বরং শাহিদকে লাঞ্ছিত করত ধারালো কথা দিয়ে।

সিনেমার অন্তরালে গেলে লক্ষ্য করা যায় সামিরা কিছু বছর আগে সুখী স্ত্রী ছিল ফাইজালের। ফাইজাল খুব ভালবাসত তার স্ত্রী সামিরাকে। সামিরা বিয়ের পর ও তার পরিবারের জন্য নার্সের কাজ করে সংসার চালিয়ে যাচ্ছে। উপার্জনের অর্থ শ্বশুরবাড়ির আপত্তি না থাকলেও মুসলিম রক্ষণশীল পরিবার বলে ঘরের বাইরে যেতে বিধিনিষেধ মানে অনেক রকম।

একসময় ফাইজালও বিরক্ত হয়ে যায় সামিরার প্রতি। কেননা, সামিরা তাদের সন্তান ইব্রাহিমকে বাসায় একা রেখেও কাজে চলে যাচ্ছে। এভাবে রেষারেষির এক পর্যায়ে তাঁদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। আকস্মিক ভাবে সামিরা যে হাসপাতালে কাজ করতো, সেখান থেকে তাঁকে পাঠানো হয় ইরাকে। বেতনের পরিমানও বাড়ে। সুযোগ হাতছাড়া করে না সামিরা।

তবে ইরাক তাকে একা যেতে দেওয়া হবে না, পরিবার সাফ জানিয়ে দেয়। এছাড়া অন্যান্য বিপদের আশঙ্কা তো আছেই। তাই, সামিরা শাহিদকে সম্মতি জানালো বিয়ের প্রস্তাবে। শাহিদ ও তার মনের মানুষ কে পেয়ে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। এভাবে দম্পতি ইরাক চলে গেল অন্যান্য আরো কয়েকজন নার্সের সাথে।

তবে সেখানকার বিধ্বস্ত পরিবেশ তাঁদের কোমল মনে বিরাট আঘাত হানলো। একসময় শাহিদকেও আটক করে ফেলে কিছু উগ্রবাদী। ইরাকের সেই দুর্গম পরিবেশে সামিরা কিভাবে নিজের ও তার সহকর্মী দের রক্ষা করলো – সেই পরিস্থিতি নিয়ে সিনেমার গল্প এগিয়ে যায়। বাস্তব ঘটনার অসাধারণ এক চিত্রায়ন ঘটেছে রূপালি পর্দায়।

সিনেমার বাস্তব প্রাসঙ্গিকতার সাথে মিল রাখার জন্য টেকনিক্যালি সিনেমার বাজেট বাড়াতে হয়। যেটা মালায়ালাম সিনেমার জন্য পরীক্ষণীয় দুঃসাহসী প্রচেষ্টা। সিনেমাটির বাজেট প্রায় ৩০ কোটি রূপি। ছবিটি ব্লকবাস্টার হিট হয়।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ইরাকে হলেও সেখানে সিনেমার শুটিং করা জীবনের জন্য ঝুঁকিকর। তাই আরব আমিরাতের রাস আল খাইমিয়াতে ইরাকের সে প্রেক্ষাপট সাজিয়ে শ্যুটিং করা হয়। এই প্রচেষ্টা শতভাগ সফল। পরিচালকের কাজ অসাধারণ। স্ক্রিনপ্লে দূর্দান্ত। ছবির মাঝে আপনি নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন।

অভিনয়ের ক্ষেত্র সবার আগেই বলতে হয় পার্বতীর কথা। দর্শক বাকরুদ্ধ হয়েছে পার্বতীর অভূতপূর্ব অভিনয়ে। এরপরেই যার নাম আসবে তিনি হলেন আরেক অসাধারণ অভিনেতা ফাহাদ ফাসিল। এখানে অনেকটা কম স্ক্রিন প্রেজেন্স পেয়েও তিনি বাজিমাৎ করেছেন। আর কুঞ্চাকো বোবানও মুগ্ধ করেছেন। ছোটখাটো চরিত্রগুলোও নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন ছবির গল্পের সাথে। এই ছবিটি এমন ভাবে দর্শকের মনে গেঁথে যাবে, যাতে তাঁদের মন পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

‘টেক অফ’ খুব সৎ, আন্তরিক আর বিশুদ্ধ একটা ছবি। এটা সেই বিরল কিছু মণিমুক্তা যা যখন চলবে তখন মনে শিহরণ যোগাবে। আর ছবি শেষ হয়ে যাওয়ার পর দর্শকের হৃদয়ে টিকে থাকবে। শুধু শুধু তো আর ছবিটা ১২৫ টি থিয়েটারে চলে নি!

https://www.mega888cuci.com