সৌদামিনী, যার বিদ্যুতের মতো চমক!

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

সৌদামিনী, যার বিদ্যুতের মতো চমক! কিন্তু সেই চমক পুরুষতান্ত্রিক মেঘের আড়ালে ঢেকে যেতে থাকে।

সৌদামিনী (শাবানা আজমী) লেখাপড়া করতে চেয়েছিল আর তাতে তাঁকে সাহায্য করেছিল তাঁর মামা (উৎপল দত্ত)। কিন্তু কয়েকটা পাশ দেবার পরই সৌদামিনীর মা (সুধা শিবপুরি) মেয়েকে আর অরক্ষনীয়া করে ঘরে বসিয়ে রাখতে চাননি যত শীঘ্র মেয়েকে গোত্রান্তর করে দেওয়া যায় তাতেই মা সচেষ্ট। মেয়েদের বেশী লেখাপড়ার চেয়ে বিয়েটা বেশী জরুরী।

১৯৭৭ সালের ‘স্বামী’ ছবিটা দেখলে বোঝা যায় নারীবাদ যত কপচানো হয় সেখানে নারীদের উপর বোঝা চাপাচ্ছে নারীরাই। বরং পুরুষ সেখানে উদ্ধারকারী। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনীকে একটা স্মার্ট লুক দেন পরিচালক বাসু চ্যাটার্জ্জী।

একটা ভালো লাগা কাজ করবেই ছবিটা দেখলে। শরৎ চন্দ্রের অনেক কাহিনীর মতো শুধুই দুঃখের নয়। দুঃখ থেকে স্বপ্নের ফেরিওয়ালা পথ দেখাচ্ছে একজন। যে সৌদামিনীর স্বামী ( গিরিশ কারনাড)। কিন্তু, সৌদামিনীর প্রথম প্রেম পাশের বাড়ির ওকালতি পাশ করা ছেলেটি (বিক্রম) তাঁর পূর্বরাগেই সৌদামিনীর দিন কেটে যায়। সৌদামিনীও তাই ওকালতি পড়তে চায়।

কিন্তু সামাজিক নিয়ম আর পরিস্থিতির চাপে ঘনশ্যাম (গিরিশ) কে সৌদামিনীকে বিয়ে করতে হয়। বিয়ের দিন প্রথম প্রেমিকের হাত ধরে সৌদামিনীর আর পালানো হয়না, প্রেমিক কথা রাখেনা। অচেনা অজানা সংসারে নতুন বয়সে বেশ কিছুটা বড় দোজ বরে স্বামীর হাত ধরে চোখের জলে পাড়ি দেয় মায়ের মামার মিনি।

যেতে যেতে গ্রামের সেই মাঠ মেঠো পথ পুকুর দেখতে থাকে যেখানে প্রথম প্রেমিক তাঁকে আশ্বাস দিয়ে প্রথম চুম্বনে স্নাত করে বলেছিল তাদের বিয়ে হবেই। খানখান হয়ে যায় সেই স্বপ্ন। এতো প্রতি ঘরের মেয়েদের গল্প।

শ্বশুর বাড়িতে স্বামী সৎ মায়ের (শশীকলা) নিজের সন্তান নয়। তাই তাঁর দেখাশোনা কেউ করেনা এই বিপত্নীক ঘনশ্যামের। কিন্তু ঘনশ্যামই পরিবারের সবাইকে নিজের পায়ে সাবলম্বী করেছিল একার রোজগারে।

সৌদামিনী কিছুতেই পারেনা এই নতুন স্বামীকে ভালোবাসতে। কিন্তু সে দেখতে থাকে নিজের বাড়িতে ঘনশ্যাম কি ভাবে বঞ্চিত।
এই ঘনশ্যাম অতি সুপুরুষ শিক্ষিত মার্জিত ভদ্র যেন ছবিতে দেবদূত। গিরিশ কারনাডকে কী অপূর্ব লেগেছে এই ছবিতে! যে স্থুলকায় সৎ বোনকে পণের বিনিময়ে বিয়ে দিতে তীব্র প্রতিবাদ জানায় তাঁর সৎ মায়ের বিরুদ্ধে।

আবার সৌদামিনী তাঁর শাশুড়িকে যখন বলে প্রতিবাদী স্বরে কেন তাঁর বরকে রোজ সকালে না খেয়ে কাজে বেরতে হবে? ঘনশ্যাম সৌদামিনীকে বলে তুমি শিক্ষিতা উঁচু মনের নীচু মানসিকতায় নিজেকে মিশিও না।

এহেন সংসারে আবার এসে জোটে দেওরের বন্ধু হয়ে সৌদামিনীর প্রথম প্রেমিক। শেষ অব্দি স্বামী ঘনশ্যাম কি ভাবে মেনে নেয় স্ত্রীর প্রথম প্রেমিক এবং স্ত্রী কে?

ছবিটার শেষে বোঝা যাবে ছবির নাম ‘স্বামী’ সার্থক। হাজার চাকচিক্যওয়ালা প্রেমিক থাকলেও ভরসার হাত যার ধরা যায় বিশ্বাস যাকে করা যায় সারাজীবন তারই রয়েছে স্বামী হবার যোগ্যতা। বর বেশে প্রথম ঘনশ্যাম গিরিশকে দেখলে বিক্রম কে আর দর্শকের ভালো লাগবেনা। তৃতীয় ব্যাক্তি ছবিতে সচরাচর ভিলেন হয় কিন্তু সৌদামিনীর স্বামী এখানে ছবির নায়ক যে ভীষন অপাপবিদ্ধ।

ছবিটা বার্তা দেয় এমন একটি পুরুষ চরিত্রটি যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মিথ ভাঙছে, নারীদের দ্বারা নারীদের অত্যাচারে রুখে দাড়াচ্ছে কিন্তু মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা আর স্ত্রীর প্রতি কর্তব্য সমান তালে মিলিয়ে, বোনকে পণের বিনিময়ে জলে ফেলে দিচ্ছেনা, যে উঁচু গলায় কথাই বলেনা কিন্তু উঁচু মনের অধিকারী। এমন পুরুষ এমন স্বামী তো সব মেয়ের আদর্শ।

‘রিয়েল ফেমিনিস্ট’ ছবির মূল অভিনেতা যা আমরা এড়িয়ে যাই নারীবাদী ছবি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে। চোখ জুড়োবে এ ছবি দেখে।

ছবির গান লতাজীর কণ্ঠে ‘পাল ভার মেয়’ সবচেয়ে প্রিয়। বাঙালী সংস্কৃতি, পাট ভাঙা তাঁতের শাড়ির গন্ধ,শিউলি ফুল, বৃষ্টির সোঁদা মাটি ভেজা গন্ধ যেন নাকে আসে। কালো দাদু ছাতা, হলুদ ফুলিয়ার তাঁত, হাতে বই সঙ্গে বৃষ্টি কি অপূর্ব শাবানা আজমি। কি দারুন বাসু চ্যাটার্জ্জীর ভাবনা।

‘ক্যায়া কারু সাজনি’ জোসে ইয়েসুদাসের গলায় আইকনিক। কিশোর কুমারের কন্ঠে ‘ইয়াদো মেয়’ মন ছুঁয়ে যায়।

এই ছবি গুলো দেখলে বোঝা যায় আগে বাঙালি পরিচালকরা কত সুস্থ রুচির ছবি করতেন যা মানুষের ভালো লাগত শুধু নয় শিক্ষিত করত। আজকাল নাম করেই বলছি ‘চরিত্রহীন’ এর মতো সব ওয়েব সিরিজে যেভাবে যৌনখিল্লি হচ্ছে সেখানে সুস্থ ভাবনার অবক্ষয় ঘটছে।

বিরল কিছু পরিচালক সুস্থ চিন্তার ছবি করছেন আজকাল তাঁদেরও চিনি, যাদের প্রেরণা এই তপন সিনহা, বাসু চ্যাটার্জী, হৃষিকেশ মুখার্জ্জী, বাসু ভট্টাচার্যরা। ছবির থিম বাংলা, কিন্তু ভাষা হিন্দি তাই এই ছবি আন্তর্জাতিক।

https://www.mega888cuci.com