গল্পটা পাশের বাড়ির সন্দেহবাতিক আন্টিদের জন্য

আমার ধারণা আমার গার্লফ্রেন্ড আছে। এর পেছনে কিছু কারণ আমি খুজে বের করেছি। একটা পেইজে দেখেছিলাম যাদের নামে ছয়টা অক্ষর থাকে, কেউ না জানলেও তারা আসলে মিঙ্গেল। আরেকটা পেজে দেখেছিলাম যে মানুষগুলোর নামের প্রথম অক্ষরে ‘এস’ থাকে তাদের প্রেমিকা শ্যামলা হয়।

তারপরও আমি শিওর হতে পারছিলাম না যে আসলেই আমার একটা প্রেমিকা আছে। কেমন যেন বিশ্বাস হচ্ছিলো না। আবার অবিশ্বাসও কিভাবে করি! এতো লাইকওয়ালা পেইজে কি আর মিথ্যা পোস্ট দিবে? আমাকে খুশি করার জন্য তো তাদের বানিয়ে বানিয়ে স্ট্যাটাস দেয়ার কোনো কারণ নাই।

তবে ফাইনালি একদম নিশ্চিত হলাম সেদিন যেদিন আম্মু এসে বললো, ‘কিরে, শুনলাম তুই নাকি প্রেম করিস?’

আমি অবাক হলাম। আম্মুও কি ফেসবুকের ঐ পেজগুলোতে আছে? জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে বলল?’

– সিয়ামের আম্মু বললো। সেই মেয়েকেও নাকি দেখেছে উনি।

এইবার আমার সমস্ত সন্দেহ দূর হলো। আসলেই আমি সিঙ্গেল না। সিয়ামের আম্মু আমাদের পাশের বাসায় থাকে। খুবই ধার্মিক। বোরখা না পরে বাসা থেকে বের হয় না। উনি তো আর জীবনেও মিথ্যা বলবেন না। তার উপর উনি নাকি দেখেছেন, ইস! যদি আমিও একবার দেখতাম তাহলে কতই না ভালো হতো। আমার প্রেমিকা। একদম নিজের একটা ভালোবাসার মানুষ। ভাবতেই কেমন কেমন লাগে। অদ্ভুত একটা ভালোলাগা। যখন আপনি লাইফে প্রথমবারের মত রিয়েলাইজ করবেন আপনি আর একা নেই, সেই মুহুর্তের অনুভূতির মত সুন্দর কিছু আর পৃথিবীতে হয়না।

আমি লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নীচু করে বললাম, ‘হ্যাঁ আম্মু, কেউ একজন আছে।’

আম্মু রাগতে গিয়েও রাগলেন না। হুট করে হেসে ফেললেন। বললেন, ‘আমার ছেলেটাও তাহলে বড় হয়ে গেছে। আচ্ছা, একদিন বাসায় নিয়ে আসিস ওকে। আমি দেখবো।’

আমি লাজুক ভঙ্গিতে ‘হ্যাঁ’ সূচক মাথা নাড়লাম।

অবশ্য মেয়েটা কে এখনো আমি জানিনা। তবে এখন আমার প্রথম কাজ হলো মেয়েটাকে খুজে বের করা। আম্মুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। তবে তার আগে আরেকটা কাজ করতে হবে।

আমি ফেসবুকে ঢুকে, ‘ইন আ রিলেশনশিপ’ স্ট্যাটাস দিয়ে দিলাম। প্রেমিকার নাম বা আইডি জানলে ট্যাগ করে দিতে পারতাম, কিন্তু সেটা সম্ভব হলো না। তবে ব্যাপার না, পরে ট্যাগ দিয়ে দিবো খোঁজ পেলেই।

অনেক লাভ রিয়্যাক্ট আর অভিনন্দন কমেন্ট পড়তেছে। এক ছোট ভাই লিখলো, ‘অনেক ভালো থাকুন।’

আরেকজন কমেন্ট করেছে, ‘আপনাদের সুখী ও ভালোবাসাপূর্ণ জীবন কামনা করছি।’

আমি লজ্জা আর ভালোবাসার ইমো দিয়ে রিপ্লাই দিলাম, ‘ধন্যবাদ, দোয়া করবেন আমাদের জন্য।’

সন্ধ্যায় বন্ধুবান্ধব এসে হাজির। কি ব্যাপার মাম্মা, ডুবে ডুবে জল খাওয়া হচ্ছে?

আমি হাসলাম।

সাকিব এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো, ‘কংগ্রাচুলেশনস দোস্ত। ফাইনালি তুইও।’

অনিক চিৎকার দিলো, ‘ট্রিট চাই, ট্রিট।’

আমার পকেটে টাকা ছিলো না। একজনের থেকে ধার নিয়ে বন্ধুদের ট্রিট দিলাম। কাচ্চি আর বোরহানি। প্রথম প্রেম বলে কথা! রিয়াদ বললো, ‘ভাবীর ছবি দেখাও বন্ধু।’

আমি হাসলাম, ‘সময় হোক, ঠিকই দেখতে পাবা।’

ফেসবুকে আমার উল্টাপাল্টা পোস্ট পড়ে এক সুন্দরী মেয়ে আমার উপর ক্রাশড ছিলো। মেসেঞ্জারে ঢুকেই দেখি তার কমেন্ট। রাগের ইমো দিয়ে লিখেছে, ‘আপনি সেদিনও বললেন আপনি সিঙ্গেল।’

– ইয়ে মানে আজই রিয়েলাইজ করলাম আসলে কেউ একজন আছে আমার জীবনে।

– আচ্ছা অনেক ভালো থাকবেন, শুভকামনা। সাথে সেন্টি ইমো দিছে একটা।

আমি রিপ্লাই দিতে গিয়ে দেখি মেসেজ সেন্ড হয় না। আমাকে ব্লক করে দিয়ে চলে গেছে। অনেক খারাপ লাগলো। মেয়েটাকে আমি বেশ পছন্দ করে ফেলেছিলাম। আজ আমার প্রেমিকা না থাকলে হয়তো একদিন ওকেই প্রপোজ করতাম। যাকগে, কি আর করা। এখম আমি মিঙ্গেল। এখন অন্য মেয়েকে নিয়ে ভাবাও পাপ।

কিন্তু কথা সেটা না, কথা হলো আমি আমার প্রেমিকাকে কোথায় খুজে পাবো এখন? আমার আর তর সইছিলো না। কখন যে তার মুখটা দেখব। কখন প্রথম কণ্ঠ শুনবো। কখন ঠোট ছোঁয়াবো গালে।

আচ্ছা ঐ পেইজগুলোতে মেসেজ দিয়ে জিজ্ঞেস করব নাকি? নাকি পাশের বাসার আন্টি অর্থ্যাৎ সিয়ামের আম্মুর কাছে জানতে চাইবো! এছাড়া ওকে খুজে বের করার আর কোনো সিস্টেম আছে?

ওর সম্পর্কে আমি যা যা জানি তা হলো, ওর গায়ের রঙ শ্যামলা। হাইট অনেক শর্ট। (একটা পেজে দেখেছিলাম, লম্বা ছেলেদের প্রেমিকা শর্ট হয়।) ওর চুল কোকড়া। (আরেকটা পেজের পোস্ট ছিলো যে মেয়েদের চুল কোকড়া তাদের প্রেমিকের নামের প্রথম অক্ষর এস হয়।)

এছাড়া এই মেয়ে যে আমার প্রেমিকা এটা কেউ জানেনা। এমনকি আমিও না। এর পেছনের কারণ নিশ্চয় মেয়ের বাসা থেকে কোনো সমস্যা আছে অথবা মেয়ে খুব বেশি লাজুক আর ইন্ট্রোভার্ট।

আর সর্বশেষ তথ্য হলো মেয়ের বাসা আমাদের এলাকাতেই। কারণ, সিয়ামের আম্মু ওকে দেখেছে। ফেসবুকে হবে না, সিয়ামের আম্মু ফেসবুক চালায় না।

নিজেকে ফেলুদা, শার্লক হোমস টাইপ মনে হতে লাগলো। এই তথ্যেগুলোর উপর ভিত্তি করে খুজে বের করতে হবে আমার প্রাণপ্রিয় প্রেমিকাকে। উফ, ও কত খুশিই না হবে। আচ্ছা, খুজে পাওয়ার পর প্রথম কি কথা বলব? বিয়ের আগে কি চুমু খেতে দিবে? বিয়েতে দেনমোহর কত থাকবে? আচ্ছা হানিমুন কি দেশে হবে, নাকি দেশের বাইরে? যেখানেই হোক, প্রথম বাচ্চার নাম মেয়ে হলে আমার নামের সাথে মিলিয়ে রাখবো আর ছেলে হলে ওর নামের সাথে। আচ্ছা ওর নাম কি হতে পারে? কে জানে!

দুই মাস পেরিয়ে গেছে। আমি এখনো আমার প্রেমিকাকে খুঁজে পাইনি। এলাকার এমন কোনো মেয়ে নাই যাকে দেখা আমার বাদ আছে। আমি বিভিন্ন অজুহাতে মানুষের বাসায় ঢুকে যাই। রাস্তায় পাশে দিয়ে কোনো মেয়ে গেলেই তার গায়ের রঙ, হাইট আর চুল দেখি। কিন্তু কারো সাথেই মিলে না। সিয়ামের আম্মুকে কি জিজ্ঞেসই করব? উনার সাথে আমার প্রায় সপ্তাহেই দেখা হয়। উনি একজন ইমো উইমেন অর্থ্যাৎ উনার স্বামী বিদেশ থাকে। ভীষণ পর্দা করার কারণে বাইরে বের হন না। আমিই প্রতি সপ্তায় বাজার দিয়ে আসি।

পর্দার ওপাশ থেকে উনি আমাকে কি কি বাজার করতে হবে ইন্সট্রাকশন দেন। সেসময় আমাদের কথা হয়। একদিন কি জিজ্ঞেস করেই ফেলবো? আচ্ছা আন্টি আমার প্রেমিকা মেয়েটা কে? উনি কি আমাকে খারাপ ভাববেন? ভাববেন, আমি বড্ড অধৈর্য? যদি রাগ করেন? হঠ্যাতই আইডিয়া আসলো। সামনের মাসে উনার স্বামী আসবে। আমি উনাকে নিয়ে এয়ারপোর্টে যাব। সেদিনই আমার দায়িত্ব শেষ। তারপর থেকে তো বাজার আঙ্কেলই করবেন। সো ঐদিন এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথে জিজ্ঞেস করে ফেলবো। যা খুশি ভাবুক, আর তো উনার বাসায় যাওয়া লাগবে না, সো নো টেনশন।

দেখতে দেখতে সেই দিন এসে গেলো। আমি গাড়ি নিয়ে আন্টির বাসার সামনে দাঁড়ানো। আন্টিকে নিয়ে এয়ারপোর্টে যাবো। যাওয়ার পথেই জিজ্ঞেস করবো আমার লাইফের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি। আন্টি নিচে নামলেন। প্রথমবারের মত বোরখা ছাড়া। পরনে শুধু শাড়ি। স্বামীর জন্যই বুঝি সেজেছেন আজ। আমার বুকের মধ্যে ধক করে উঠলো। সেই শ্যামলা গায়ের রঙ, মাথাভর্তি কোকড়া চুল। উচ্চতায় আমার অর্ধেক। অনেক শর্ট। উনি কখনো বাইরে যান না, তার মানে আমার প্রেমিকাকে দেখার কথা বলতে আয়না দেখা বুঝিয়েছিলেন? মনে পড়লো একটা এপস আমাকে বলেছিলো, আমার সেলিব্রেটি টুইন হলো নিক জোনাস। আর প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার মত আন্টিও আমার অনেক বড়। বয়স প্রায় পঁয়তাল্লিশ। স্বামী সন্তান আছে বলেই বুঝি ভালোবাসার কথা কাউকে জানানো বাধা ছিলো উনার। আমার গা হাতপা কাপতে লাগলো। এতোদিন কেন মাথায় আসেনি, ইস! আমি এয়ারপোর্টের উল্টোদিকে গাড়ি চালানো শুরু করলাম।

আন্টি অবাক হওয়ার ভান করে বললেন, ‘কি ব্যাপার এদিকে কোথায় যাও?’

– স্বামীকে আনতে যাওয়ার আর কোনো দরকার নাই। আমি সব বুঝে গেছি।

– কেন? কি বুঝে গেছ?

– ইস, এমন করছো যেন কিচ্ছু বুঝো না।

– না তো, সোহাইল কি হইছে তোমার? এমন করছো কেন?

– এই মনে করেন ভাল্লাগে, খুশিতে- ঠেলায়- ঘোরতে!

আমি গাজিপুরের দিকে যাচ্ছি। ঐখানে একটা রিসোর্ট আছে। সেখানেই কাজী ডেকে বিয়ে হবে। আন্টি হেল্প হেল্প বলে চিৎকার করছেন। সিয়াম কাঁদছে উচ্চস্বরে। আমি গাড়ির গতি বাড়ালাম। আর মাত্র কিছুক্ষণ!

_______________

গল্পটা সেইসব আন্টিদের জন্য উৎসর্গিত যারা পাশের বাসার ছেলে মেয়ের প্রেম নিয়ে গোয়েন্দাগিরি করে আব্বু আম্মুর কাছে নালিশ দেয়।

https://www.mega888cuci.com