সুশান্ত ও মনখারাপের ওষুধ

সুশান্ত সিং রাজপুত যেন হঠাৎই আমাদের চোখ খুলে দিলো। নিউজ ফিডে অনবরত ডিপ্রেশন নিয়ে লোকজন পোস্ট করছে দেখছি। এমনি সময়তে বোধ হয় এদের বেশিরভাগ মানুষই ট্রল করে। রাজনৈতিক উস্কানিমূলক লেখা ফরওয়ার্ড করে হোয়াটস অ্যাপ এ। শেয়ার করে মব লিঞ্চিং এর পোস্ট। কমেন্ট করে ব্যক্তিগত আক্রমণে নেমে আসে। কোনদিনও অন্যের কথাকে গুরুত্ব না দেওয়া মানুষ গুলো আজকে হঠাৎই যেনো অবসাদগ্রস্থ মানুষ গুলোর কথা শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলো!

ডিপ্রেশন একটা অসুখ। মনের অসুখ। তার জন্য মনের ডাক্তার আছে। তার আলাদা ট্রিটমেন্ট এর পদ্ধতি আছে। ঠিক যেমন করে জ্বর, সর্দিকাশি, ক্যান্সার বা বাতের ব্যথার ট্রিটমেন্ট আছে, তেমনই। ক্যান্সারে হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। লক্ষ লক্ষ মানুষ সুস্থ ও হয়ে ওঠে। ডিপ্রেশন এও মানুষ আত্মহত্যা করে। আবার চিকিৎসা শেষে অনেকেই সুস্থ জীবনে ফিরে আসে। অর্থাৎ দিনের শেষে মানসিক অবসাদ আর পাঁচটা রোগের মতই একটা রোগ। মানসিক রোগ।

সুশান্ত এর মৃত্যু দুঃখজনক। অত্যন্ত দুঃখজনক। যেকোনো মৃত্যুই তাই। কিন্তু ফেসবুকে এই মানসিক অবসাদের বিষয়টিকে যেনো পণ্য করে ফেলা হলো গত দুদিনে। সংবেদনশীলতা বেটে; তার সাথে প্রেম, অপ্রেম গুলে; উদারতা, সহানুভূতি মিশিয়ে পরিবেশন করা হলো দুরন্ত এক রেসিপি যা কিনা আদতে অন্ত:সারশূন্য। কাল থেকে আপনার আমার জীবন এক চুল ও বদলাবে না। ডিপ্রেসড মানুষ গুলোও মুখ ফুটে তাদের গোপন বেদনার কথা গুলো কারোর সাথে শেয়ার করা শুরু করবে না। যা ছিল, তাই থাকবে। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও, বাস্তবটা এতটাই রূঢ়!

যদি সত্যিই চান বদল হোক, নিজেদের মানসিকতা বদলান। সমকামী পুরুষ দেখলে টোন টিটকিরি কাটা বন্ধ করুন। আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া আপনার সেই বন্ধুটির সাথে চায়ের ঠেকে সন্মান দিয়ে কথা বলুন যাতে সে ইনফেরিয়রীটি কমপ্লেক্সে না ভোগে। আপনার প্রেমিক বা প্রেমিকার সাথে বিচ্ছেদ সচেতন ভাবে করুন, যাতে অশান্তিতে সম্পর্ক না ভাঙ্গে। যৌথ সিদ্ধান্তে সম্পর্ক ভাঙুন। চেষ্টা করুন পরিবারের মানুষের সাথে সময় কাটাতে। চাকরি সূত্রে আপনি দিল্লি, ব্যাঙ্গালোর বা আমেরিকায় থাকলেও ভিডিও কলে বা স্কাইপে নিয়মিত সময় দিন বাবা মায়ের জন্য। সন্তানের জন্য সময় বেছে রাখুন, প্রতিটা দিন কাজের শেষে।

মানসিক অবসাদ গরীব, বড়োলোক দেখে আসে না। না আছে এর কোনো বয়েস। সুশান্ত এর ৩৪ বছর বয়েস আর প্রায় ৬৯ কোটি টাকার সম্পত্তি ছিল বোধ হয়। ফলে কার জীবনে যে কি কারণে অবসাদ আছে, সেটা আমার আপনার ধারণার বাইরে। শুধু আপনার দিক থেকে কোনো ব্যবহার যেনো সামনের লোকটার কাছে অপমানের বা দুঃখের না হয়, সেটা লক্ষ রাখুন। আমরা মানুষ হিসাবে এটুকু করতেই পারি, আর বিশ্বাস করুন, আমরা সবাই যদি এটাই করি, অনেক অনেক উপকার হবে।

মনোবিদদের বক্তব্য অনুযায়ী পৃথিবীতে মানসিক অবসাদের শিকার মানুষের বেশিরভাগই সম্পর্কের টানাপোড়েনের শিকার আসলে। প্রায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অবসাদের কারণ সম্পর্কের জটিলতা আর ভাঙন। ফলে মনখারাপের ওষুধ আসলে ওই কিছু ট্যাবলেট না। ওগুলো শুধুমাত্র ঘুমাতে সাহায্য করে। স্নায়ু শিথিল রাখে। আসল ওষুধ ভালোবাসা। আপনার দুটো মিষ্টি কথা। ভালো করে হাসা। যতটা পথ সম্ভব, পাশে থেকে এগিয়ে দেওয়া। পারলে হাতটা ধরা, ট্র্যাফিক সিগন্যালে হোক, বন্ধুত্বে হোক বা জীবনে।

নিজের নিজের জীবনে এই সামাজিক দায়িত্ব গুলো পালন করলে, অবসাদ পালাবে কিনা জানিনা। মন খারাপ কমবে। আমার, আপনার, সবার!

https://www.mega888cuci.com