আজও ‘পঞ্চম’-এই আছি

একদিন রোজকার মতোই প্রাত:ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন বাবা। বাড়ি ফিরে ছেলেকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। ছেলে তো ভীষণ অবাক। এমন তো কোনদিন হয়নি এর আগে। পরে বাবার মুখে শুনলেন, আজ রাস্তায় বেশ কিছু মানুষ তাঁকে ‘ছেলের বাবা’ পরিচয়ে চিহ্নিত করায় তিনি বেজায় খুশি। ঐ ছেলের নাম ছিল রাহুল দেববর্মন। যাকে পঞ্চম নামেও চিনি আজ সবাই। সংক্ষেপে তিনি আর ডি।

‘এক্স’ হয়ে গিয়ে তিনি আজও ‘আর ডি এক্স’। অন্তত: তাঁর সৃষ্ট গানের ব্যাপ্তি আর প্রভাবে। আজও সারা দেশের গানের সুরে পঞ্চমের উচ্ছ্বাস! কিন্তু তাঁকে কি দিতে পেরেছি আমরা, তার জীবিতাবস্থায়? শোনা যায় যে ‘১৯৪২…এ লাভ স্টোরি’-র পর তার হাতে কোনও কাজ ছিল না। ভাবা যায় যে সেই নব্বইয়ের দশকে রাহুল দেববর্মনকে কোনও কাজ দেওয়া হত না! কারণ হিসেবে বলা হত, উনি সুর করলে ছবির গান হিট হবে না! ‘পাবলিক’ আর চায় না ঐ সুর।

ভাবুন সেই সময়টা! ঐ রকম লেভেলের একজন সুরকার! তার ছিল এই অবস্থা! শিল্পের আঙিনায় ক্ষণিকের ব্যর্থতা কি এভাবেই চিরস্থায়ী দাগ রেখে যায় সেই শিল্পীর জীবনে? আসলে এই ‘পাবলিক’ নামের ‘দেখোয়াড়’ বস্তুটাই ভয়ঙ্কর হাস্যকর। তারা কখন কি পছন্দ করবেন, সেটা বোঝা শিবের পিতাশ্রীরও অসাধ্য।

কিন্তু কারো কারো অভিজ্ঞতা তো এগুলোও দেখে ফেলেছিল এবং পছন্দ করেছিল।

‘মুসাফির হু ইয়ারো’ গানটির জন্মকথাই ধরুন। শ্রদ্ধেয় ভানু গুপ্ত একটা কর্ড বাজাচ্ছিলেন। এর ওপরে ভিত্তি করে তৈরী হয় শুধু গানের ‘মুঝে চালতে যানা হ্যায়, বাস চলতে যানা’ এই অংশটুকু। এই টিউনটা স্নান করতে করতে দশ মিনিটে বানিয়েছিলেন পঞ্চম।

আর এই গানের মুখরার শুরুটা গুলজারের সঙ্গে গাড়িতে যেতে যেতে, গাড়ির ছাদ পিটিয়ে বানান তিনি। তার পর যে গানটা তৈরী হল তাতে রিদিমের একটাই প্যাটার্ন থাকল। ইন্টারলিউডে বেজে গেল গানের মুখরা। ব্রেক করে অন্য কোনও যন্ত্র এনে এই গানের মেলোডি নষ্ট করতে চাননি আর ডি। শিক্ষণীয় সংযম দেখিয়েছিলেন তিনি এ গানে। আসলে তাঁর সুরে যত পরীক্ষা নিরীক্ষাই আর ডি করে থাকুন, তাঁর সবটাই শুধু মেলোডির জন্য! মেলোডির জন্য কোনও আপোষ তিনি কোনদিন করেননি।

শোনা যায়, ‘ছোটে নবাব’ ছবিতে সুর করার সময় এই মেলোডিকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য বাবা শচীন দেব বর্মনকে কিছু না বলেই তিনি ‘ঘার আ যা, ঘির আয়ি’ ক্ল্যাসিকাল গায়কী নির্ভর গানটি গাইতে বলে দেন লতা মঙ্গেশকরকে। জিজ্ঞেস করার প্রসঙ্গ উঠেছিল কারণ সে সময়ে বেশ কিছু দিন শচীন দেব বর্মন আর লতা মঙ্গেশকরের মধ্যে ঠাণ্ডা লড়াই চলছিল।

শচীন কর্তা তার সুর করা কোনও ছবিতেই লতা মঙ্গেশকরকে দিয়ে গান গাওয়াচ্ছিলেন না সেই মুহূর্তে। কিন্তু ও রকম ধ্রুপদী মেজাজের গানের জন্য পঞ্চমের দরকার ছিল লতা মঙ্গেশকরকেই। আর গানের কম্পোজিশন শুনে লতা মঙ্গেশকর আনন্দের সঙ্গে গান রেকর্ড করলেন। এবং শচীনকর্তা সেই গান শুনে ‘বন্দিনী’ ছবিতে আবার লতা মঙ্গেশকরকে দিয়ে গান গাওয়ালেন! আবার জয় হয়েছিল মেলোডির।

‘শোলে’ ছবিতে হেমা মালিনীকে গব্বরের ডাকাতরা যখন তাড়া করেছে তখন একমাত্র আর ডি’র পক্ষেই সম্ভব ছিল ওই টেনশনভরা সিচুয়েশনে তবলার ব্যবহার। ব্যাতিক্রমী প্রতিভারা বোধহয় এরকমই হন।

আমাদের সময় গান শোনা ব্যাপারটা জীবন বুঝতে শিখিয়েছিল, প্রেম করতে শিখিয়েছিল, বৃষ্টি ভিজতে আর রোদে পুড়তে শিখিয়েছিল, নি:শ্বাস নিতে আর প্রশ্বাস ছাড়তে শিখিয়েছিল, শুধু তার সুরসৃষ্টিকে সঙ্গে নিয়ে। আমাদের গহীন রাতের স্বপ্নে পঞ্চমের সুর বলে যেত ‘মেরা কুছ সামান, তুম্হারে পাস পড়া হ্যায়।’ আর আমাদের সময় উত্তর দিত, ‘পিছু টানে ফিরে যাওয়া আমারও অনেক কিছু, তুম্হারে পাস পড়া হ্যায়’।আজও সঙ্গেই চলেছে তারা আমাদের। আজও। একইরকম ভাবে।

এমনই ছিলেন রাহুল দেব বর্মন। এক সময়ে বছরে সতেরোটা ছবির জন্য গান তৈরি করেছেন তিনি একসাথে। কিন্তু আত্মবিশ্বাস, দক্ষতা, প্রতিভা আর গান নিয়ে পড়াশোনার ফলে নিজের মধ্যে যে ক্ষমতার সুরক্ষাবৃত্ত তৈরি করেছিলেন তিনি, সেই বলয় তাঁকে বরাবর বাজারী নিয়ম ভেঙে চুরমার করে অন্য রাস্তায় গান বাঁধার স্বপ্নকে দিনের আলো দেখিয়েছিল। গানে পারকাশনের ব্যবহারও তার মত আর কেউ পারেন নি আর পারবেনও না।

১৯৯৪ সালের চার জানুয়ারি তাকে ৫৫-তে পৌঁছে যাবার আগেই ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেছে। তাঁর সৃষ্টি করা গানগুলিকে নয়। গানে গানেই থেকে গেছেন, আছেন আর থেকে যাবেন তিনি। ১৯৯৪ এর চার জানুয়ারির পর আজ এতগুলো বছর অতিক্রান্ত আজও ‘পঞ্চম’-এই আছি আমরা।

তাঁর ‘কুছ সামান’ এখনো আমাদের কাছে রয়ে গেছে। তাতেই আমাদের ‘বেচারা দিল’ ওলটপালট। আমরা শুধু শুনেই যাই তাঁর জাদুকরী সৃষ্টিগুলি, যারা বলে ‘কুছ না কাহো’। আমাদের কিন্তু ‘ক্যাহেনা হ্যায়’। আজও ‘তেরে বিনা জিয়া যায়না’। ‘আনেওয়ালা পল’ আজও ‘যানেওয়ালা হ্যায়’।

আজও পঞ্চম আক্রান্ত দিকদিগন্তে তার সুরে বেঁচে নিই আমরা। সুরের আকাশের সেই অনন্য ধ্রুবতারা, সুরের ঈশ্বর রাহুলদেব বর্মণকে এক অতিসাধারণ গানপাগল বন্ধুর আনত প্রণাম। ‘ইয়ে দোস্তি… হাম নেহি তোড়েঙ্গে।’

‘জিভানকে দিন ছোটে সাহি, হম ভি বাড়ে দিলওয়ালে।

কাল কি হামে ফুরসাত কাহা, হোতে তো হাম মাতওয়ালে।

https://www.mega888cuci.com