তিন নারীর মায়াবী বন্ধন

একাকিত্ব কোনো অভিশাপ নয়। একাকিত্ব যাপন আয়ত্ত করতে জানতে হয়। সবসময় রক্তের সম্পর্কেই পরিবার গঠন না করলেই সেটা বাঁচা নয় – এই সামাজিক পরিকাঠামো ভাঙা দরকার। বন্ধুত্ব যাপন করেও একটা সুখী সংসার ছোটো পরিবার বানানো যায় সেই গল্পের সন্ধান দিয়েছেন অপর্ণা সেন।

‘সোনাটা’ …৭৩ বছরেও মায়াবী অপর্ণা সেন। ‘সোনাটা’ নামে বিথোভেনের একটি সুরও রয়েছে। সেই সুর যেন সারা ছবি জুড়ে বিনি সুতোর মালায় গেঁথেছেন অপর্ণা।

মারাঠি সাহিত্যিক মহেশ এলকুঞ্চওয়ারের নাটক ‘সোনাটা’-এর ওপর ভিত্তি করে চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন অপর্ণা। এই গল্প নিয়ে অনেক আগে সোহাগ সেন একটি নাটক উপস্থাপনা করেছিলেন সেটির ইংরাজী চলচ্চিত্রায়ন করলেন অপর্ণা। অনেকদিন করবেন করবেন করে শেষমেশ করলেন ‘সোনাটা’।

অবিবাহিত মধ্যবয়স্কা তিন প্রৌঢ় নারী, যারা এক সঙ্গে এক জায়গায় থাকেন মুম্বাইতে। ভিন্ন মতাদর্শের হয়েও খুব কাছের বন্ধু তারা তিন নারী। অপর্ণা সেন এই ছবিতে সংস্কৃতের অধ্যাপকের চরিত্রে। তাঁর চরিত্রের নাম অরুণা চতুর্বেদী ছোটো করে অরু।

দোলন সেন নামে এক ব্যাংকারের চরিত্রে শাবানা আজমি। সুভদ্রা নামের একজন আবেদনময়ী সাংবাদিকের চরিত্রে লিলেট দুবে। সুভদ্রা মাঝেমধ্যেই এঁদের বাড়িতে আসেন এবং চিন্তাভাবনার নতুন উপাদান দিয়ে যান এদের। দোলন শুধু বেঁচে থাকতে চায় সেলিব্রেট করতে চান তাঁর জীবন।

রক্ষণশীল অরুণা সব বিষয়ে দুশ্চিন্তা করেন সামাজিক বিধিনিষেধ মেনে চলেন। কেউ আসতে দেরী করলেও তার দুশ্চিন্তার অন্ত থাকেনা। সে সবকিছু পরিপাটি রাখতে চায়। অপর্ণা নিজেও অনেকটা এরকম পারফেক্টশানিস্ট। যে ঘরে একটা ফটোগ্রাফি একটু বেঁকে থাকলেও সোজা করে সাজায়। আবার সুভদ্রার কোনও প্রেমিকই স্থায়ী হয়না। সে কমার্শিয়াল মশালা মুভি দেখে। পুরুষদের শরীর দেখে।

সেই নিয়ে আলোচনা করে প্রাণের সখী দোলনের সঙ্গে। যে আলোচনা চলে যায় পর্ণগ্রাফিতেও। অরুনা আবার একদমই এসব বালখিল্য আলোচনা পছন্দ করেনা। কিন্তু তবু তারা দিনের শেষে একে অন্যের মনের আয়না। তাদের তিনজনের গ্রুপ একটা খোলা জানলা।

ছোটো ছবি সবটা বলে দিলে আর দেখবেন কি!

ছবিতে অতিথি শিল্পীর চরিত্রে কল্যান রায় রয়েছেন। অপর্ণার প্রাক্তন প্রেমিক এখানে সে। আরেকটা চরিত্রের কথা না বললেই নয় অনুসূয়া মজুমদার। কি দুরন্ত করেছেন নিজেকে সম্পূর্ন বদলে ফেলেছেন। এই না হলে অভিনেত্রী। অপর্ণাও তাকে সাহায্য করেছেন অবশ্যই। কে বলবে পরমেশ্বরীর মাটির মানুষ শাশুড়ী এক ট্রান্সজেন্ডারের চরিত্রে অবতীর্ন হতে পারেন।

আর শাবানা এ ছবির সেরা তুরপের তাস। ‘সোনাটা’ দেখুন শাবানার জন্য। কি কিউট বাবলি কি প্রানবন্ত লেগেছে। বাংলায় রবি গান নিজে গেয়েছেন শাবানা আজমি এ ছবিতে। কত বাংলা ডায়লগ ওনার মুখে। কি মিষ্টি।

ছবির শেষ দৃশ্য চুপ করিয়ে দেয়…… এতটাই বাস্তব।

‘সোনাটা’ … অপর্ণা সেনের সবচেয়ে কমদিন চলা ছবি। মোটে এক সপ্তাহ। এর কারণ অনুসন্ধান করলে বলা যায়, এ ছবি তিন নারীর একাকিত্ব যাপন, অবদমিত কামনা যাপনের গল্প। যারা দেখছে বাইরের সমাজ পাল্টে যাচ্ছে। ছুঁতে চেষ্টা করছে সেই সমাজ কে এই মুম্বাই নিবাসী তিন প্রৌঢ়।

এই গল্প নাটক হিসেবে যতটা উপভোগ্য চলচ্চিত্র হিসেবে ততটা নয়। সবার যে ভালো লাগবে তাও নয়। একই অর্ন্তদৃশ্যে সমগ্র ছবি যেটা মঞ্চে চলে। ছবিতে দর্শকের একঘেঁয়ে লাগবে। যে বাড়িতে দুজন অতিথি আসছে এবং তাদের জন্মদিন পালন করা হবে সেই বাড়ির হোস্টরা মদ্যপান করে বেঁহুশ প্রায়।

তারা বলছে ফ্রায়েড রাইস করার চাল ধুতে হবে কেক অর্ডার দিতে হবে অথচ মদ্যপান চ্যাট গসিপ অবদমিত যৌনতার স্বাদগ্রহন এসব করে গেলেন। কি আজব! এ ছবি শুধুমাত্র উচ্চবিত্তদের গল্প বলে তাই হয়তো কোনো সিঙ্গেল স্ক্রীনে রিলিজ করেনি।

এই ছবি সবাইকে এক ভালো লাগা দেবেনা। তাই হয়তো সাতদিন শুধুমাত্র মাল্টিপ্লেক্সে চলেছে অপর্ণার এ ছবি।

রূপা ইন্দ্রাণী ঋতুপর্নার ‘আরো একবার’ ছবিটিও তিন নারীর গল্প এর আগেই দেখলাম সেটি অনেক বেশী উপভোগ্য। অনেক সহজে পৌছবে সকলের কাছে।

‘সোনাটা’র শেষ দৃশ্য সত্যি আমায় চুপ করিয়ে দিয়েছে। যদিও উপসংহারের কারণ অপর্ণা ‘ইতি মৃণালিনী’ তেও দেখিয়েছেন।

জীবন কত অনিশ্চিত। তবু ‘সোনাটা’র শেষ অনেক বেশী নাড়া দিয়ে যায়।

একেবারেই বানিজ্যিক ভাবে সফল নয় ছবিটি। জানিনা আর সেই হাউসফুল বোর্ডে অপর্ণা সেনের ছবি আমরা পাবো কিনা যা আবার খুব সৃজনশীল ছবি। তবু ‘সোনাটা’ একাকিত্বযাপন করতে শেখায়। নারীবাদকে ছাড়িয়ে ‘সোনাটা’ তিনজন নারীর অন্যরকম বন্ধন দেখিয়েছেন অপর্ণা সেন। ছবির অন্দরসজ্জা চোখ জুড়িয়ে দেয়। সঙ্গে অসাধারন শাবানা আজমির খোলা কন্ঠে –

আকাশ কাঁদে হতাশ-সম, নাই যে ঘুম নয়নে মম-

দুয়ার খুলি হে প্রিয়তম, চাই যে বারে বার।

আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার. পরানসখা বন্ধু হে আমার॥

https://www.mega888cuci.com