আমাদের সো-কল্ড স্মার্ট প্রজন্ম!

বছর তিনেক আগের কথা। বাংলাদেশ থেকে বেশ কিছু ছাত্র-ছাত্রী এসছে আমাদের এখানে পড়তে। এদের সবার বয়সই ২০-২৫ এর মাঝে।

একদিন এদেরকে আমার বাসায় আমন্ত্রণ করেছিলাম। আড্ডা হচ্ছে দেশ, দেশের ইতিহাস-সংস্কৃতি ইত্যাদি নিয়ে। আমি কথার ফাঁকে বলেছিলাম- প্রভাতফেরিটা খুব মিস করি।

এক ছেলে প্রশ্ন করে বসলো- প্রভাতফেরি যেন কি? এটা যেন কখন পালন করা হয়? আমি এতো অবাক হয়েছিলাম, আজ তিন বছর পরেও আমার ব্যাপারটা মনে আছে।

এই ছেলে কি অশিক্ষিত? মোটেই না। সে দেশে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে বিদেশে উচ্চ শিক্ষা নিতে এসছে। এক সময় হয়ত ডিগ্রী নিয়ে এরপর দেশে ফেরত গেলে আমরা তাকে বলবো – ফরেন ডিগ্রী হোল্ডার!

একবার আমি যাচ্ছি নিউজিল্যান্ডে। এই ছেলে আমাকে প্রশ্ন করেছে – নিউজিল্যান্ড যেন কোন মহাদেশে? শুনে তো আমার চোখ কপালে উঠার জোগার!

পৃথিবীর অন্য সব দেশের নাম না জানলেও তো নিউজিল্যান্ডের নাম জানার কথা। বাংলাদেশ তো প্রায় প্রতি বছরই নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ক্রিকেট খেলছে। এইতো এখনও একটা সিরিজ চলছে। অথচ এই ছেলে জানেই না নিউজিল্যান্ড কোন মহাদেশে!

এই হচ্ছে আমাদের বর্তমান প্রজন্ম। এই ছেলে আমাকে একদিন প্রশ্ন করেছিল -আপনি এতো বড় বড় লেখা কিভাবে লিখেন?

আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম – তুমি কি কখনো গল্পের বই পড়েছ?

ছেলে হেসে উত্তর দিয়েছে – না, পড়িনি। পুরো জীবনে হয়ত একটা কিংবা দুইটা পড়েছি।

না পড়াটাকেও আমি খুব একটা অস্বাভাবিক বলছি না। তবে ছেলেটা এরপর বলেছে -গল্পের বই পড়ার কোন মানে হয় না। শুধু শুধু সময়ের অপচয়। এতো বড় বড় লেখা পড়ে সময় নষ্ট করার কোন মানে হয় না।

অর্থাৎ গল্পের বই পড়াটাকেই সে ভালো চোখে দেখছে না। এবং অতি গর্বের সঙ্গে এটা সে বলে বেড়াচ্ছে। আমি যে বড় বড় লেখা লেখি, এটাও মনে হয় তাঁর কাছে অন্যায় কিংবা আন-স্মার্ট ব্যাপার স্যাপার।

ইতিহাসের কোন সময়েই হয়ত প্রচুর মানুষ পাওয়া যাবে যাবে না, যারা গল্পের বই প্রচুর পড়তো কিংবা শিল্প-সাহিত্য চর্চা করত। এদের সংখ্যা সব সময়ই কম ছিল।

তবে অতীতে মানুষজন অন্তত বই না পড়তে পারলে সেটাকে খারাপ চোখে দেখত; নিজেরা খানিক লজ্জিত কিংবা সংকোচবোধ করত। এছাড়াও যারা বই পড়তো কিংবা সাহিত্য চর্চা করত, মানুষ তাদের সমীহ করত। আর এখন হয়ে গিয়েছে উল্টো!

বই পড়লে, সাহিত্য চর্চা করলে আমরা হয়ে যাচ্ছি আন-স্মার্ট! আর বই না পড়ে, দুই চারটা ভাঙা ইংরেজি বলে (সেটাও যদি ভালো করে পারত!), হাতে একটা গিটার নিয়ে লোকজন হয়ে যাচ্ছে স্মার্ট আর সেলিব্রেটি!

এরপর এই সেলিব্রেটিরা আবার বই বের করছে। সেই বই গুল নাকি আবার বেস্ট সেলার হচ্ছে! তাও ভালো লোকজন তো বই কিনছে! ও, আমাদের সমাজে তো আবার প্রচলিত মতবাদ আছে- বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না! কিংবা বই চুরি করলেও সমস্যা নেই।

কিন্তু কেমন বই কিনতে হবে, কেমন বই পড়তে হবে , সে নিয়ে কোন প্রচলিত মতবাদ নেই। আপনাদের কি জানা আছে, মানুষজন কিভাবে ইসলামিক স্টেট (আইএস) এর মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে উঠে? আপনাদের কি জানা আছে – মানুষজন কিভাবে জঙ্গি (সেটা যে ধর্মেরই হোক) হয়ে উঠে?

এইসব মতাদর্শ তারা জানে কই থেকে? নিশ্চয় বই পড়ে! অর্থাৎ এমন বইও বাজারে কিন্তু পাওয়া যায়।

কেন, বাজারে কি চটি বই পাওয়া যায় না? ও গুলো কি বই না? হ্যাঁ, সে গুলোও বই।

সে গুলোও মানুষ কেনে এবং পড়ে। আমার বড় ভাইয়া আমাদের পুরো পরিবারে সব চাইতে কম সাহিত্য মনা। মানে খুব একটা গল্প-উপন্যাস পড়তে পছন্দ করে না।

তার মানে এই না, ভাইয়া বই পড়তো না কিংবা পড়ে না। প্রতি বই মেলায় দেখা যায়, ভাইয়াই সব চাইতে বেশি বই কেনে। তো, ভাইয়া কোন ধরনের বই কেনে?

– ভালো ছাত্র হবার ১০০ উপায়!

– জীবনে সফল হবার মন্ত্র!

এই টাইপ বই ভাইয়া প্রতি বছর কিনে নিয়ে আসে!

তো, এইগুলোও তো বই।

এইতো কাল’ই পড়লাম এইবারের বই মেলায় নাকি রেকর্ড সংখ্যক বই বিক্রি হয়েছে। কোটি কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। তার মানে তো মানুষজন বই কিনছে কিংবা বই পড়ছে।

অন্তত হিসেব অনুযায়ী তো তাই হওয়া উচিত। অথচ এই প্রজন্মের অনেককেই দেখা যাবে জানে না -প্রভাতফেরি কি! আপনি তাদের গিয়ে জিজ্ঞেস করুন – তুমি কি অরুন্ধতী রায়ের নাম শুনেছ?

আপনি নিশ্চিত থাকুন ৯০ ভাগের উপর বলবে – সে আবার কে! তবে আপনি নিশ্চিত জেনে রাখুন, তাদের গিয়ে যদি জিজ্ঞেস করেন – ‘প্যারা খেয়ে সুইসাইড’! কিংবা ‘ব্রেক আপের পর এক্সট্রা লাভ’ (দুটো’ই কাল্পনিক নাম পড়েছ কিনা? তারা লাফিয়ে বলবে- ইয়েস, অবশ্যই পড়েছি!

অতীতে আমরা শিল্প-সাহিত্য চর্চা করা মানুষ গুলোকে স্মার্ট বলতাম। আর এখন – ইয়ো ইয়ো বলে, আঙুল দুটোকে উঁচু করে, দুটো ভাঙা ইংরেজি বলে বেড়ানো মানুষজনদের আমরা স্মার্ট বলি। এরাই হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ!

https://www.mega888cuci.com