বন্ধুর গলায় বাংলাদেশের গান

সাল ১৯৭১। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়। লক্ষ লক্ষ শরণার্থী আশ্রয় নিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। সহশিল্পীদের সাথে অর্থ সংগ্রহে নেমে গেলেন তৎকালীন বাংলা সংগীত জগতের সবচেয়ে জনপ্রিয় গায়িকা। বহির্বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালিয়ে গেলেন।

সুরকার সমর দাস যখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু করলেন, তিনি ছিলেন অন্যতম সহযোগী। কিছু গানও গেয়েছেন স্বাধীন বাংলা বেতারে, যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি পরই  নিজের মায়াভরা কন্ঠে গেয়ে উঠেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু তুমি ফিরে এলে…’।

১৯৭২ সাল। স্বাধীন দেশে প্রথমবারের মত উদযাপিত হবে মহান ভাষা দিবস। প্রথম বিদেশি শিল্পী হিসেবে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন করেছেন পল্টন ময়দানে মুক্তমঞ্চে গান গেয়ে। তিনি আর কেউ নন, নিজের মধুমাখা কন্ঠে যিনি শ্রোতাদের মুগ্ধ করতেন, অকুণ্ঠ ভালোবাসায় পেয়েছেন ‘গীতশ্রী’ খেতাব। তিনি উপমহাদেশের অন্যতম সেরা কন্ঠশিল্পী কিংবদন্তি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও তাঁর নাম খুব ঘণিষ্টভাবে জড়িয়ে আছে। আলমগীর কবিরের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত বিখ্যাত সিনেমা ‘সূর্যকন্যা’র সেই কালজয়ী গান ‘আমি যে আঁধারে বন্দিনী’ তাঁরই গাওয়া। বাচসাস পুরস্কার ও পেয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের বাংলা চলচ্চিত্রেও নিজেকে করেছেন অনন্য।

পঞ্চাশ, ষাট ও সত্তর দশকে ছিলেন সবচেয়ে ব্যস্ত গায়িকা। অসংখ্য গান জনপ্রিয় হয়েছে এই মায়াবী কন্ঠে। বিশেষ করে সুচিত্রা সেনের ঠোঁটে তাঁর গলা দারুণ মানিয়ে যেতো, এই জুটির বহু গান পেয়েছে কালজয়ীর মর্যাদা।

তেমনি একটি অনন্য উদাহরণ স্বপ্তপদী সিনেমার সেই মন ভোলানো গান ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’। নিশিপদ্ম সিনেমার ‘ওরে সকল সোনা মলিন হল’র জন্য পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। শ্রাবণী ভট্টাচার্যের সঙ্গে মায়ের ভূমিকায় গেয়েছেন আরেক যুগান্তকারী গান ‘আমি তোমার মেয়ে, তুমি আমার মা’।

এছাড়া বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে ‘এই শুধু গানের দিন’, ‘কিছুক্ষণ আরো না হয় রহিতে কাছে’, ‘আমি তাঁর ছলনায় ভুলব না’, ‘মধুমালতী ডাকে আয়’, ‘চন্দন পালঙ্ক শুয়ে’, ‘আমি জেনে শুনে বিষ করেছি করেছি পান’সহ আরো বহু বিখ্যাত গান। বিখ্যাত হয়েও সারল্যতায় নিজেকে নিয়ে গেছেন আরো উঁচু স্থানে।

বাংলা সঙ্গীত জগতে হেমন্ত মুখ্যার্জীর সঙ্গে উনার জুটি জায়গা করে নিয়েছে কালজয়ী জুটি হিসেবে। এই জুটির সব গুলো গানের আবেদন চিরন্তন। বাংলা গানে নিজেকে সমুজ্জ্বল করার আগেই হিন্দি সিনেমায় নিয়মিত গান করতেন। বোম্বের ব্যস্ততাকে এড়িয়ে বাংলা গানে নিজেকে নিমজ্জিত করেন।

সমসাময়িক কাছের বন্ধুরা একে একে চলে গেছেন অদেখা ভুবনে। স্বামী কবি শ্যামল গুপ্ত মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। ৮৭ বছর পেরিয়ে তিনিও হয়তো অপেক্ষায় আছেন মৃত্যুর পথ চেয়ে। যমের সাথে যুদ্ধ করে সুস্থ স্বাভাবিক বেঁচে থাকুন আরো কয়েক বছর।

https://www.mega888cuci.com