সাইফ-অমৃতা: অন্যরকম লাভস্টোরি নাকি চিরায়ত ট্র‍্যাজেডি!

সবাই তো ভালবাসা চায়

কেউ পায় কেউ বা হারায়

তাতে প্রেমিকের কী আসে যায়

এন্ড্রু কিশোরের এই গানটি আমরা জীবনে একবার কখনো গুনগুন করে গাইনি, এমন কেউ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

কারণ গানটি যে আমাদের জীবন থেকেই নেয়া, আমাদের মনকে লক্ষ্য করেই যে কবির কলম ঝলকে উঠেছিল!

প্রত্যেকেই চায় তাদের জীবনে শুদ্ধতম ভালবাসার ছোঁয়া আসুক, তাদের প্রেমের গল্পটা খুব নিখুঁত হোক, নজরকাড়া হোক, অটুট হোক,  কিন্তু সবাই কি সে ভাগ্য পায়?

সবার সে ভাগ্য হয়না। জীবন কি কখনো চিরঅটুট অবস্থান গ্রহণ করতে পারে? না, পারেনা। সমুদ্র জলজগতের জীবনের অপার সৌন্দর্য বিলিয়ে প্রবল ঝড় তুলে জীবন কেড়েও নিতে জানে। তবু আমরা সেদিকেই এগিয়ে যাই, যেতেই হবে, এটাই যে মানুষের ধর্ম!

তেমনি যাকে ভালবাসা যায়, শুধু তাঁর সৌন্দর্য আর ভালগুলিই শুধু শুষে নিয়ে, একটা সময় পর তাঁর খুঁতগুলিকে মানতে পারলেন না, তাহলে কিভাবে তা ভালবাসা হতে পারে?

তা যে শুধুই আকর্ষণ, প্রবল মোহের আসক্তি।

বলিউড অনেক প্রেমে বিভোর স্বপ্নিল প্রেমিক-প্রেমিকার অভ্যুদয় ঘটালেও এর আনাচেকানাচে যে কত বিরহব্যথা হাহাকার করেছে, তা কে জানে!

যেমন বলিউড তারতা সাইফ আলী খান ও অমৃতা সিংয়ের গল্পটাই শোনা যাক।

ভাবুন তো, আপনি যাকে ভালোবাসেন যিনি ডিনারের জন্যও আপনার সাথে বাইরে যেতে চান না তবে আপনি কী করবেন?  সে যদি আপনার থেকে আরো সফল এবং আপনার চিন্তার থেকে বেশী স্বাধীনচেতা হয়?  ডেটে যাবার বদলে আপনাকেই একা বাড়িতে ডিনারের জন্য আহবান জানায়?

তারউপর অগ্রিম জানিয়ে রাখে যে, আপনার ও তাঁর মধ্যে ‘কিছুই’ হতে পারবে না? আপনি কি কিছুটা থমকে যাবেন না, যখন আপনি তাঁর প্রেমে রীতিমত হাবুডুবু খাচ্ছেন? একই ছাদের নিচে একটি সম্পর্কের মধ্যে দু’জন থেকেও শারীরিকভাবে ঘনিষ্ঠ হবেন না, যখন দুজনই বলিউড তারকা?

আপনার চেয়েও অনেক বেশি বয়সের এক নারীকে নিজের সাথে জড়ানোর মত পরিণতবোধ আপনার মধ্যে আছে?  আপনি কি পুরোপুরি আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে তা ছুড়ে ফেলার বাতিক আছে?

এই সব প্রশ্নের উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে আপনার এই মজার গল্পটি সাইফ আর অমৃতার গল্পের মতই।

  • প্রথম দেখায় প্রেম নয়!

নব্বই দশকের শুরুর কথা। সাইফের বলিউড ক্যারিয়ার তখনও শুরুও হয়নি। ব্যস্ত ছিলেন নিজের অভিষেক সিনেমা রাহুল রাওয়ালের ‘বেখুদি’ নিয়ে। তখনই অমৃতার সাথে এক ফটোশ্যুটে তাঁর প্রথম দেখা। ছবি তুলতে সাইফ যখন প্রথম অমৃতার কোমরে হাত রাখেন তখনই প্রথমবার দু’জনের চোখাচোখি হয়। তবে, সেই দৃষ্টিতে প্রেম ছিল না, ছিল পেশাদারিত্ব।

লোকে তাঁর পাশ দিয়ে যাবার আগে দু’বার ভাবে, তবে অমৃতার কাছে যাওয়ার জন্য সাইফের কোন চিন্তাভাবনা লাগত না। তাদের একসাথে প্রথম ছবির শুটিংয়ের সময়, তিনি অমৃতাকে বাহুতে এমনভাবে জড়িয়ে রাখলেন, যেন ইতোমধ্যে তিনি তাঁর কাঙ্খিত অধিকার পেয়ে গেছেন!

না, এটা ‘প্রথম দেখায় প্রেমের’ মত কিছু ছিল না! সাইফ ভাবেনও নি হয়তো, এত দ্রুত এত কিছু ঘটে যাবে! তিনি চিন্তাও করেননি, অমৃতা সিং যেরকমটা ভাবছিলেন!

  • একটি অপ্রত্যাশিত ফোন কল

ওই ফটোশ্যুটের পরই অমৃতার প্রতি সাইফের ভাললাগা কাজ করতে থাকে। ক’দিন বাদেই সাহস করে ফোন করে বসেন। বলেন, ‘আমি কি আপনার সাথে ডিনারে যেতে পারি?’

অমৃতার জন্য ফোন কলটা ছিল খুবই অপ্রত্যাশিত। ডিঙ্গি (অমৃতার ডাক নাম) সাফ জানিয়ে দিলেন, ‘আমি ডিনার বাইরে করব না’। বরং  তিনি নিজ বাড়িতে ডিনারের জন্য সাইফকে আমন্ত্রণ জানান।

  • সেই রাত

সাইফ আসার আগে তিনি বাড়ি ফিরে মেকআপ তুলছিলেন। সাইফ  তাঁকে খুব স্নিগ্ধ অবস্থায় দেখতে পান, অমৃতা তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।

কয়েক মিনিট নীরবে তাঁরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, অমৃতা তাঁকে হাসিমুখে স্পষ্টভাবে বলেন যে, আজ তাদের মধ্যে কিছুই ঘটবে না।

এখন আপনাকে রুদ্ধশ্বাস ধরে একটু অপেক্ষা করতে হবে, কারণ ঠিক পরেই যা ঘটবে তা আপনার ঠোটে এক চিলতে হাসি ফুটাবেই।

রাতের খাবারের শেষে হঠাৎ বাতি টিমটিম করতে লাগল, শনশন করে হাওয়া বইতে লাগল, আশপাশ চুপচাপ হয়ে শূন্যতা সৃষ্টি করছিল, এই মোহমাখা পরিবেশে এক জোড়া সুখপায়রা নীরবে প্রিয়র নিবিড় স্পর্শ পেল!

নব্বই দশকে এই চুম্বক কাণ্ড হরহামেশাই ব্যাপার ছিল না, ঘটনা ছিল দারুণ চমকপ্রদ ও সাইফ অমৃতার জন্য তা যথেষ্ট রোমাঞ্চকর।

  • টানা দু’দিন সাইফ বাড়ি ফিরলেন না

সেদিন সাইফ আর সে বাড়ি ছাড়ল না। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই পড়েছেন, সাইফ তখন আর বাড়ি থেকে বের হননি!

তবে অমৃতার কথার নড়চড় হয়নি,  তারা দু’টি আলাদা রুমেই থেকেছেন এবং তাদের মধ্যে কোন শারীরিক সম্পর্ক হয়নি। তবে তা ঠিক দুই দিনের জন্য!

অমৃতার মা তাঁর নিজের ঘরে ছিলেন এবং স্বভাবতই শীতল আচরণ করেছেন, মেয়ের ছেলেবন্ধু কোন কারণ ছাড়াই বাড়িতে অবস্থান করলে যেমনটা করা উচিত যেকোনো মায়ের।

অমৃতা মাকে মিথ্যে বলল যে, সে শুধু রাতের খাবার আর মধ্যাহ্নভোজের জন্য সেখানে ছিল। কিন্তু মা যে সন্তানের সামান্যতম পরিবর্তনও খুব সহজেই ধরতে পারেন! কিছু লক্ষণ দেখে অমৃতার মা সন্দেহ করে বসলেন যে অমৃতার সাথে সাইফ বাসায় বাস করছিল।

  • প্রেম থেকে বিয়ে: ভালবাসার চূড়ান্ত পরিণতি

আসলে অমৃতা তখন বিয়ে করতে চাচ্ছিলেন কিন্তু সাইফ সদ্য নিজের ক্যারিয়ারের শুরু করছিলেন। তারা তিনমাস ধরে ডেট করছিলেন, এবং এটা তাদের জন্য দারুণ একটা সময় যাচ্ছিল। সাইফ বলেছিলেন, ‘আমি চাইনি ও কিছু প্রত্যাশা করুক আমার কাছে। শুধু চেয়েছি কিছু ভাল সময় কাটাতে। চেয়েছিলাম দু’জন দু’জনকে আরো ভালভাবে জানতে।’

‘এই সম্পর্ক কি টেকসই হবে?’ তাঁদের বন্ধুরা এই সম্পর্ক নিয়ে তাদের হুঁশিয়ার করার চেষ্টা করলেও তাঁরা তেমন কান দেয়নি। তাঁরা জীবনকে একটি সুযোগ দিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

সাইফ ছিলেন ২১ বছর বয়সী, আর অমৃতার বয়স ছিল ৩৩।  সাইফ এবং অমৃতার মত সম্পর্ককে আজকের বাবা-মাও সহজেই গ্রহণ করবেন না। তার উপর সাইফ ছিলেন শর্মিলা ঠাকুরের ছেলে, নবাব পরিবারের সন্তান। আলোচনায় থাকবেন এটা জানাই ছিল।

সাইফের মা, শর্মিলা ঠাকুর একবার তাকে বলেছিল যে, সে তাঁর জীবনে অমৃতার মত কোনও নারী কখনও পাবে না। সাইফ তাঁর দৃষ্টিতে মায়ের কাছে সঙ্গীর সংজ্ঞা বলেছিলেন যা তিনি অমৃতার মাঝে পেয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে অনুভব করেছি যে আমি যার প্রতি টান অনুভর করব তাঁরও যদি একই টান থাকে, সেই আমার জন্য উপযুক্ত।’

অমৃতা বলেছিলেন, ‘সাইফ আমার জীবনের একমাত্র ব্যক্তি ছিল, যে আমার জন্য ধৈর্য ধরতে জানত এবং যে আমাকে বুঝত।’

বিয়ের দু’দিন আগে, শর্মিলা তাদের সম্পর্ক সম্পর্কে জানলেন এবং বিয়ে করতে সাইফকে সাবধান করেছিলেন। কিন্তু আমরা জানি, তাঁরা গোপনে বিয়ে করেছিলেন।

অমৃতা আগে শর্মিলার সাথে একটি ছবি করেছিলেন। মজার ব্যাপার যে, তিনি সিনেমাতে তার শাশুড়ির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন এবং এখন প্রকৃত জীবনেও তা মিলে গেল।

সাইফ-অমৃতার মাঝে সোহা আলী খান

অবশেষে অমৃতা শর্মিলার সাথে দেখা করল। ওই সময়টা সাইফকে তার মা বাইরে হাঁটতে পাঠিয়ে দিলেন। ঘটনাগুলি অমৃতার পক্ষে গেল না এবং এমনকি অমৃতাও তার সাথে একমত হয়েছিলেন যে,  তার মেয়ে সারা যদি এমন কিছু করে তবে তিনি তাঁকে ধরে মারবেন!

অমৃতাকে টাইগার পতৌদির সাথে দেখা করতে হয়েছিল, এবং সাইফ আবারও বাবার সঙ্গে অমৃতাকে রেখে চলে গেলেন। ‘যখন আমার তাকে প্রয়োজন তখন সে আবারও আমাকে বোকা বানিয়ে ছেড়ে চলে গেল’, সাইফকে নিয়ে অমৃতা মজা করে বললেন।

টাইগার তাঁকে বললেন, ‘মিডিয়া আজো আমাদের (টাইগার ও শর্মিলা) জীবন-যাপন নিয়ে নাক গলায় (শর্মিলা সফল নায়িকা ছিলেন, টাইগার ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের সফল অধিনায়ক)। কিন্তু আমরা ২৪ বছর ধরে একসাথেই আছি। আমি আশা করি একদিন তুমিও এ কথা বলতে পারবে।’

  • প্রেমের ইতি, বিচ্ছেদের সূচনা

অমৃতা সম্ভবত একমাত্র নায়িকা ছিলেন, যিনি ১২ বছর ধরে একটানা ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করে গেছেন চেহারা ও ফিগারে বয়সে কোন ছাপ পড়তে না দিয়েই। সাইফের সাথে প্রতিযোগিতা করেননি কখনো। ‘আমি এটা করেছি এবং এটি অর্জন করেছি। জীবন অনেক উপায়ে আমাকে সাহায্য করেছে। জীবনে অনেক কিছু বাকি রয়ে গেছে ’, মিসেস সাইফ আলী খান পাতৌদি বলছিলেন।

তিনি একটি সম্পর্ক নিয়ে বেশ দামী একটি কথা বলেন, ‘যদি আপনি একজনকে সর্বক্ষণ নজরে রেখে তাঁকে অন্য কারো থেকে দূরে রাখবেন, তবে আপনি ভুল। এর জন্য বিবেক আর আবেগই যথেষ্ট।’

উভয়ই জানত যে সম্পর্কটি দীর্ঘসময় নাও থাকতে পারে, কিন্তু কেউ কি ভালোবাসা হারানোর কথা ভাবতে পারতেন? সিমিকে দেওয়া এই ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার দেবার পাঁচ বছর পর, তাদের ডিভোর্স হয়ে যায়। ১৯৯১ সালে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল। ১৩ বছর পর বিচ্ছেদ। ক্ষতিপূরণ হিসেবে অমৃতা পেয়েছিলে পাঁচ কোটি রুপি।

সাইফ-অমৃতার বড় মেয়ে সারা যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেছছেন। সাইফ-অমৃতার একমাত্র ছেলে ইব্রাহিম আলী খান মায়ের সাথে বসবাস করছেন।

ইতোমধ্যেই ইতালিয়াযন মডেল রুজার সাথে কিছুদিন ডেটিংয়ের পর সাইফ এখন একজন বিবাহিত ব্যক্তি। সাইফের বর্তমান স্ত্রী কারিনা কাপুর বিখ্যাত কাপুর পরিবার থেকে এসেছেন এবং এই দম্পতি তাদের প্রথম সন্তানের মুখ দেখেছেন।

  • ঝড় শেষে শান্তির সুবাতাস

সাইফের প্রথম ঘরের উভয় সন্তানই কারিনার ভাল বন্ধু, দু’পক্ষের বোঝাপড়াও দারুণ। এজন্য অবশ্য মা অমৃতা সিংয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করলেই নয়। দু’জনই তাদের বাবার বিবাহে উপস্থিত ছিলেন। ক’দিন আগেই কফি উইদ করণ অনুষ্ঠানে এসে সারা আলী খান বলেছিলেন, ‘বাবা-মাকে এখন আলাদা দেখি, কিন্তু তাঁদের ভাল থাকতে দেখি। তাঁদের ভাল থাকাটাই তো সবচেয়ে বড় ব্যাপার।’

একজন সাংবাদিক অমৃতাকে কারিনার গর্ভাবস্থায় মন্তব্য করতে বলেছিলেন। যদিও তিনি তাঁকে এমন জবাব দিয়েছিলেন যে পাল্টা প্রশ্ন করার কোনো জো ছিল না। কিন্তু কারিনা সবসময়ই অমৃতার প্রশংসা করেন, তাদের সন্তানদের ঠিকভাবে গড়ে তোলায়। এই ত্রিমুখী সম্পর্কে অবশ্যই কিছু শেখার আছে।

একটি প্রেমের গল্প হারিয়ে গেলে আরো কিছু প্রেমের গল্প তৈরি হয়। সাইফ-অমৃতা দম্পতি সম্পর্কে খুব বেশি শোরগোল ওঠে নি, যতটা সাইফ-কারিনাকে নিয়ে উঠেছিল।  কারণ তখন ইন্টারনেটের প্রসার হয়নি। তাই মিডিয়ায় উত্তপ্ত শিরোনাম এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হবার কোন সুযোগ ছিল না।

একটি প্রেমের গল্প হয়তো শেষ হয়েছে, কিন্তু সুন্দর ভাবেই শেষ হয়েছে।

https://www.mega888cuci.com