রোহিত শেঠি: কিং অব এন্টারটেইনমেন্ট

পুরোটাই পৌরানিক একটা গল্প। কথিত আছে, তুরস্কের ফ্রিগিয়ায় মাইডাস নামের এক রাজা ছিলেন। তাঁর নাকি ঐশ্বরিক এক ক্ষমতা ছিল। তিনি যা ছুঁতেন, সেটাই নাকি সোনা হয়ে যেত।

ভারতীয় চলচ্চিত্রে সেই মাইডাসটা হলেন রোহিত শেঠি। বলিউডের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা নির্মাতাদের সংক্ষিপ্ত তালিকা করলেও ঘূণাক্ষরেও তাতে রোহিতের নাম থাকবে না। তবে, দর্শকের পালস বুঝে ছবি নির্মান করতে পারা পরিচালক তাঁর মত আর নেই বললেই চলে।

শিল্পমান, গল্প, স্ক্রিপ্ট, কনসেপ্ট বা কনটেন্ট সব কিছুর উর্ধ্বে গিয়ে সিনেমা হল গণযোগাযোগের একটা মাধ্যম। সেই সিনেমাই সবচেয়ে সফল, যেটা সবচেয়ে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। এদিক থেকে রোহিত শেঠি বরাবরই শতভাগ সফল।

সিনেমাকে তিনি দর্শকদের চোখ দিয়ে দেখতে জানেন। তিনি বোঝেন, একটা সিনেমায় একজন দর্শক যখন একটা সিনেমার পেছনে দুই ঘণ্টা-সোয়া দুই ঘণ্টা বিনিয়োগ করেন, তখন সেটা তিনি বিনোদনের প্রতি আকুতি থেকেই করেন। তাই, দর্শকদের বিনোদন দেওয়ার ব্যাপারে কোনো কার্পণ্য নেই রোহিত শেঠির।

সেটা করতে গিয়ে তিনি কখনো বাতাসে গাড়ি ওড়ান, পাশবিক শক্তির নায়ককে দিয়ে একের পর এক ধুন্ধুমার ভিলেনকে বধ করান, স্বল্পবসনা নায়িকার আইটেম সং দেখান, দক্ষিণের সিনেমা রিমেক করেন, কিংবা পুরনো গানের রিমেক করেন। বিনোদন দেওয়ার বেলার তার কাছে অসম্ভব বলে কিছু নেই। তাই তো তিনি বলিউডের কিং অব এন্টারটেইনমেন্ট।

অবশ্য, তাঁকে চাইলে কিং অব বক্স অফিসও বলা যায়। কারণ, ব্যবসায়িক ভাগ্যটা তাঁর প্রচণ্ড ভাল। শতকোটির ক্লাবে নাম লেখানো টানা আটটি ছবি পরিচালনা করার অনন্য রেকর্ডটা বলিউডে একমাত্র এই রোহিত শেঠির দখলে। রোহিতের এই যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সাল থেকে। সিঙঘাম, বোল বচ্চন, চেন্নাই এক্সপ্রেস, সিঙঘাম রিটার্নস, দিলওয়ালে, গোলমাল এগেইন, সিমবা – সবগুলোই শতকোটির ক্লাবে নাম লিখিয়েছে। এর মধ্যে চেন্নাই এক্সপ্রেস, গোলমাল এগেইন ও সিমবা নিজেদের আয় দু’শো কোটি ছাড়িয়ে নিয়েছে।

রোহিত শেঠির সাথে অজয় দেবগনের টিউনিংটা দারুণ। পরিচালক রোহিতের অভিষেকও হয়েছিল অজয়ের সাথেই। যদিও, খুব লোকই জানেন যে, অজয়ের অভিষেক সিনেমা ‘ফুল ওউর কাঁটে’-তেও ছিলেন রোহিত। ১৯৯১ সালের ছবিতে পরিচালক কুকু কোহলির সহকারী ছিলেন তিনি।

তখন রোহিতের বয়স ছিল মাত্র ১৭। যদিও, এর আগে থেকেই ইন্ডাস্ট্রিতে পরিচিতি পেয়ে যান রোহিত। কারণ তাঁর বাবা-মা দু’জনই ছিলেন অভিনেতা। মা হলেন জুনিয়র আর্টিস্ট রত্না। আর বাবা এম.বি শেঠি তো ভারতীয় সিনেমার বেশ পরিচিত মুখ। ৭০ কিংবা ৮০ দশকে তিনি একগাদা হিন্দী ছবিতে কাজ করেছেন। এছাড়া স্টান্টম্যান ও অ্যাকশন পরিচালক হিসেবেও দারুণ কদর ছিল তাঁর। সিনেমা পাড়ায় তাঁকে লোকে ‘ফাইটার শেঠি’ নামে ডাকতো। ছেলে রোহিতের অ্যাকশন-প্রীতিটা আসলে বাবার কাছ থেকেই পাওয়া।

সহকারী পরিচালক হিসেবে কুকু কোহলির সাথে শুরু হয় রোহিতের। তাঁর সাথে পরে রোহিত পরে ‘এক ওউর কোহিনূর’, ‘সুহাগ’, ‘হাকিকত’ ও ‘জুলমি’ ছবিতে ছিলেন। সুহাগ-এ অক্ষয় কুমারের ‘বডি ডাবল’ হয়েও কাজ করেছিলেন রোহিত। পরে আরেক নির্মাতা আনিস বাজমীর অধীনে চলে যান। তাঁর সাথে তিনি ‘প্যায়ার হো হোনা হি থা’, ‘হিন্দুস্তান কি কাসাম’ ও ‘রাজু চাচা’ সিনেমায় কাজ করেন।

কথায় আছে প্রভাতের সূর্য নাকি দিনের সঠিক পূর্বাভাস দিতে পারে। যদিও, রোহিতের জন্য ব্যাপারটা ছিল পুরোই উল্টো। নির্মাতা হিসেবে তিনি বলিউডে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন ২০০৩ সালে। সেবার ‘জামিন’ ছবিতে রোহিতের প্রিয় দুই অভিনেতা অজয় দেবগন ও অভিষেক বচ্চন ছাড়াও ছিলেন বিপাশা বসু। ছবিটি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছিল।

বক্স অফিস ছবিটির সাথে ‘বিলো অ্যাভারেজ’ ট্যাগ ঝুলিয়ে দেয়। সেই বিপর্যয়ে নিজেকে আমূল বদলে ফেলে তিন বছর পর ‘গোলমাল’ ফেরেন রোহিত। বাকিটা সময় স্রেফ ইতিহাস। এখন অবধি যে ১৩ টা ছবি করেছেন এর মধ্যে ১১ টিই ব্যবসায়িক ভাবে সফল। এই রেকর্ডটাও খুবই ঈর্ষণীয়। ফলে, শেষে একটা কথাই বলতে হয়, রোহিতের ছবি হয় আপনার খুব ভাল লাগবে, হয় খুব খারাপ লাগবে, কিন্তু তাঁকে আপনি একেবারেই আলোচনার বাইরে রাখতে পারবেন না।

একটা অজানা তথ্য দিয়ে শেষ করি। রোহিত শেঠির ভাই হৃদয় শেঠিও একজন নির্মাতা। তার বিখ্যাত কাজগুলোর মধ্যে ২০০৪ সালে সঞ্জয় দত্ত, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া অভিনীত ‘প্ল্যান’ অন্যতম। যদিও, সৎ ভাই হওয়ার কারণেই কি না, দু’জনের মধ্যে খুব একটা যোগাযোগ নেই বললেই চলে!

https://www.mega888cuci.com