আমারেই পাবে তুমি ‘তাসের ঘর’-এ

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

সব তাসের ঘর ভেঙে পড়েনা, স্মৃতি আগলে দাঁড়িয়ে থাকে। বাড়ির এক অংশের নাম তাসের ঘর, অন্য অংশের নাম পুতুল ঘর। নান্দনিকতা বাড়ির নাম থেকে স্থাপত্য নির্মাণকৌশলে বিদ্যমান।

ঋতুপর্ণ ঘোষের বাড়ি, স্বপ্ন, ছোটবেলা, স্কুলে যাওয়া, প্রথম যৌবন, প্রথম বিজ্ঞাপনে চাকরি, ছবির জগত, বালিশে মুখ লুকিয়ে কাঁদা কি অথ রূপান্তর কথা – সবকিছুই এই বাড়িতে।

শুধু হালে ক্রিমসাদা রংয়ের বাড়ির রংটা টকটকে লাল হয়ে গেছে এক পরিচালকের শ্যুটিংয়ের দৌলতে। রং পাল্টেছে বাড়ি কিন্তু বাকি সব এক। এমনকি কাঠচাঁপা গাছটাও।

ইন্দ্রাণী পার্কের অভিজাত পাড়া এখন পাড়া কালচার হারিয়ে কমপ্লেক্স কালচারে পরিণত হচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে পুরনো বাড়ি গুলো। কিন্তু ঋতুপর্ণর বাড়ি খুঁজে পেতে অসুবিধে হয়না। বাড়ির রং বদলালেও নির্মান তো বদলায়নি। এই গোল দো তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঋতুপর্ণ চিত্রনাট্য পড়তে পড়তে দেখতো ইন্দ্রাণী পার্কের জলাশয়ে রাজহাঁস কি পানকৌরি, সাদা বকদের।

এই গোল বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন শর্মিলা ঠাকুর থেকে ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন। ‘উনিশে এপ্রিল’ মৃত্যুদিন ঘিরেই গল্প ‘তাসের ঘর’ বাড়িটা হয়ে গেল। আসতেন ঋতুর দুই চুমকি দেবশ্রী রায় কি ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। আবার এই গোল বারান্দাতেই রিঙ্কু র দিদি অপর্ণা সেন দাঁড়িয়ে দেখেছিলেন তাঁর রিঙ্কুর শেষযাত্রায় শেষ প্রস্থান। ঋতুপর্ণর ডাক নাম এই পাড়ায় রিঙ্কুই। ‘তাসের ঘর’-এর বিপরীতের বাড়িটা পুরনো আদলের বাচ্চারা দাঁড়িয়ে থাকে ঐ বাড়িতেই তো ঋতুপর্ণ করেছিল ‘রেইনকোট’-এর শ্যুটিং।

বাড়ির পাশে একটা ক্লাব ঘর। এখন শ্রাদ্ধ র খাওয়া দাওয়া কাজে ব্যবহারে ভাড়া দেওয়া হয়। সেইসব লোকের ভিড় ছিল তাঁরা উদাসীন হয়তো অনেকেই জানেননা পাশে কার বাড়ি? এসব কালচার তো ঋতুর বাড়ির নৈঃশব্দতাকে নষ্ট করছেই। এঁটো কলাপাতা কি ভ্যাট রয়েছে একগাদা গাড়ির আনাগোনা। কিন্তু বাড়ির সামনের ইন্দ্রাণী পার্ক অপূর্ব সাজানো সরকারী তৎপরতায়।

যদিও ঋতুর তাসের ঘর সবটাই বন্ধ ,রোদ প্রবেশের ফাঁক টুকু নেই। ‘১৮ এ’ লেখা দরজায় তালা পড়েছে ২০১৩ সালের পরপরই। ভেতরে রয়ে গেছে ঋতুর ব্যবহার্য সবকিছু,সব নিজের হাতে বানানো পোশাক,ছবির স্টিল।

আজও শোনা যায়, রাতের বেলা ঋতুপর্ণ নাকি আসে এ বাড়িতে। স্টাডিতে আলো জ্বলে ওঠে কি বইপত্রর শব্দ কি আলমারি খোলার শব্দ।
পুতুলঘর পেছনদিকে সেখানে কেয়ারটেকার তাঁর পরিবার আত্মীয় ভাইরা বোধহয় থাকেন। ব্যবহার হয় পুতুল ঘর দিকটা। গেটও খোলা।
কিন্তু ঋতুর দিকের ঘরে দরজা কি আর কোনদিনও খুলবে।

১৮ এ’র সাদা দরজা কি আর খুলবে?

যে দরজা দিয়ে ছিল ঋতুর আনাগোনা, সব খ্যাতনামা শিল্পীদের যাতায়াত। এই বাড়িতেই তো থাকতেন ঋতুর বাবা-মা। এই গোল বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঋতুর মা দেখতেন দুই ছেলে সাউথ পয়েন্ট স্কুল থেকে ফিরল কিনা। আসতেন মাধবী মুখোপাধ্যায় যিনি ঋতুর চেয়েও ছিলেন ঋতুর মায়ের বেশী বন্ধু।

শুধু ঋতু নয় এরপর তো আরো কত ঋতুর মতোরা হয়তো চলে যাবে এভাবেই অকালেই সমাজ সংসার তাঁদের বুঝবেনা।

‘বিয়ে করনি’ বলে টিটকিরি দেবে? বিয়ে করলেই যেন সে সতীলক্ষ্মী। একটা লাইসেন্স। সবাই তো ঋতুপর্ণর মতো উচ্চতায় পৌঁছয়না কি গ্ল্যামার জগতের প্রচারে পৌঁছয়না তাঁদের অবস্থা কাটে আরো দুর্বিপাকে। পরিবার বোঝেনা বাবা মা বোঝেনা। অপর্ণা সেনের মতো বুঝদার বোধসম্পন্ন মহিলাও ঋতুকে এ প্রশ্ন করেছিলেন। কত সহজে আমরা কাউকে, সন্তানসম কাউকে মাতৃস্থানীয়রা বলেন ‘ও তো ঋতুপর্ণর মতো!’ সমাজ পাল্টাচ্ছে কিন্তু সমাজ কি মননে শিক্ষিত হচ্ছে!

তাসের ঘর একা আজ। ঋতুর ‘অন্তরমহল’ একলা আজ। কাঠচাঁপা গাছটায় আজও প্রতি বছর ফুল ফোটে কিন্তু বাড়ির সবচেয়ে নন্দনবোধসম্পন্ন মানুষটি তো আর নেই।

নির্মাতার বাড়ির সামনে লেখক

হয়তো দেখিবে চেয়ে সুদর্শন উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে।

হয়তো শুনিবে এক লক্ষ্মীপেঁচা ডাকিতেছে কাঠচাঁপার ডালে।

ইন্দ্রাণী পার্কে স্বচ্ছ দিঘীর জলে হয়তো কিশোর এক সাদা ছেঁড়া পালে
ডিঙ্গা বায়;

রাঙ্গা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে

দেখিবে ধবল বক;

আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভীড়ে।

https://www.mega888cuci.com