বলিউড রাজত্বের খামখেয়ালি রাজা

লোকটা সিনেমার প্রেমে পরেছিলেন জিনাত আমানের উরু আর অমিতাভ বচ্চনের হাতে বন্দুক দেখে। মধ্যবিত্ত পরিবারের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া ছেলেটা সারাদিন সিনেমা হলে পরে থাকতো। সারাদিন সিনেমা দেখতো। সিনেমা দেখতে দেখতেই জিনাত আমান থেকে ভালবাসাটা স্থানান্তরিত হলো শ্রীদেবীতে। সেই ভালবাসা, সেই মুগ্ধতা এখনো কমেনি। সেই গল্পে পরে আসছি।

১৯৬২ সালের অন্ধ্রপ্রদেশে জন্ম নেন রাম গোপাল ভার্মা। সিনেমা পাগল লোকটা শুধু সিনেমা দেখতে নিজেই দিয়ে বসেন ভিডিও ক্যাসেটের দোকান। সেখানে সারাদিন সিনেমা দেখতেন। সিনেমা দেখতে দেখতেই ঠিক করলেন নিজেই সিনেমা বানাবেন। পরিচিতদের দ্বারা যোগাযোগ তেলেগু পরিচালক বি গোপাল এর চতুর্থ সহকারী পরিচালক এর কাজ পান। সিনেমার নাম ছিল ‘কালেক্টর গাড়ি আব্বাই’।

সেই কাজ করার পর মনে হলো তার ভাবনার সাথে মিলছেনা। নেমে পরলেন মাঠে। নির্মান করলেন নিজের প্রথম সিনেমা ‘শিভা’। নির্মান করলেন নিজের ভাষায়। তেলেগুতে, নায়ক নাগার্জুনা। এরপর চলে আসেন বোম্বেতে (বর্তমানে মুম্বাই)। নির্মান করেন নিজের প্রথম হিন্দি সিনেমা ‘শিভা’। নাম ভূমিকায় সেই নাগার্জুনাই। সিনেমা ব্যবসা সফল হলো।

ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে বানিয়েছেন ‘রাত’-এর মত ভিন্নধর্মী সিনেমা। বলিউডের ক্রিটিক, মুম্বাই ভিত্তিক সিনে মিডিয়া সবাই বুঝলো যে ছেলেটা এসেছে সে গল্প বলতে জানে। এরপর বানানো চালিয়ে গেলেন। প্রতিটা সিনেমাতেই নিজের ছাপ রাখলেন। তার সিনেমা কান ফিল্ম ফেস্টিভেলে ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটে প্রদর্শিত হয়েছে। বিখ্যাত ফিল্ম ক্রিটিকরা তার সিনেমার জনরাকে ‘মুম্বাই নয়ার’ নামক নতুন নামে আখ্যায়িত করেছেন।

অস্কার জয়ী পরিচালক ড্যানি বয়েল বলেছিলেন, ‘মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ে রামুর মত করে কেউ গল্প বলতে পারেনি।’ ১৯৯৫ সালে নির্মাণ করলেন ‘রঙ্গিলা’।একদম ভিন্ন আঙ্গিকে ত্রিভুজ প্রেমের গল্প। আমির খান উর্মিলা রসায়ন জমে ক্ষীর হয়ে গেল। ব্লকবাস্টার ব্যবসা সফল হলো ছবি। এই সিনেমায় তারকা হয়ে গেলেন উর্মিলা। এবং এই সিনেমার জন্যই সেরা অভিনেতার পুরস্কার পাওয়ার আক্ষেপ থেকেই আর ভারতের কোনো অ্যাওয়ার্ড শো-তে যাননা আমির খান।

এই সিনেমা দিয়ে যাত্রা শুরু হলো বলিউডে রাম গোপাল ভার্মা রাজত্বের উপহার দিলেন ভূত, সাত্যা, কোম্পানি, সরকারের মত ব্যবসা সফল ও সর্বমহলে প্রশংসিত সিনেমা। নিজের সিনেমার মাধ্যমে ইন্ডাস্ট্রিতে আনেন অনুরাগ কাশ্যাপ, সৌরভ শুকলা, মনোজ বাজপায়ি, বিবেক ওবেরয়ের মত গুনীদের। রাম গোপাল ভার্মাকে কেউ কেউ বলিউডের সর্বকালের অন্যতম সেরা পরিচালকের খেতাব ও দিয়ে দিচ্ছিলেন। বিবিসিও তাকে স্থান দেয়।

তবে যত বড় রাজত্বই হোক, রাজা যদি খামখেয়ালি হয় তাহলে রাজত্ব ধরে রাখা কঠিন। নিজের খামখেয়ালি আচরণ নানারকম বিতর্কে জড়িয়ে থাকা, নারীপ্রিতি সব মিলিয়ে আস্তে আস্তে নিজের কাজে ফোকাস হারাতে শুরু করেন। সিনেমার চেয়ে বিতর্ক তৈরিতে মনোযোগী হন।

তেলেগু তারকা পবন কল্যানের ব্যাপারে বাজে মন্তব্য করেন। সে বিষয়ে পরে অনুপমা চোপড়ার সাথে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘পবনের ভক্তরা কি রিয়েকশন দেয়, তার মজা নিতেই আমি মন্তব্য করেছিলাম। আমি জানি ওরা খুব ঝামেলা করবে, আমি কিন্তু মন্তব্য করে চুপচাপ বসে ছিলাম।’

তার সিনেমা ভিরাপ্পানের সমালোচনা করায় এক নারী সাংবাদিকের চেহারা নিয়ে বাজে মন্তব্য করে বলেন, ‘সিনেমাটা তাহলে তোমার চেহারার মত।’ মোদি সরকারের স্বচ্ছ ভারত কর্মসূচির প্রচারণাকে নিজের নির্মিত ‘আগ’ সিনেমার চেয়েও বাজে বলেন। ১৯৯৮ সালে অ্যাওয়ার্ড শোতে ‘সাত্যা’র তুলনায় ‘কুচ কুচ হোতা হ্যায়’ বেশি পুরস্কার পাওয়ায় প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

  • শ্রীদেবী আখ্যান

যুবক বয়সে শ্রীদেবীর বাড়ির সামনে দাড়িয়ে থাকতেন। তার বায়োপিকে শ্রীদেবীকে সৌন্দর্যের দেবি আখ্যা দেন। সেই বায়োপিকের কিছু মন্তব্যের জন্য বনি কাপুর তার সমালোচনা করলে তিনি বনি কাপুরকে নিয়ে সিরিজ টুইট করেন এবং সর্বশেষ শ্রীদেবির অংগ নিয়ে মন্তব্য করেন যা ব্যপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

  • রামুর জীবনে নারী

রাম গোপাল ভার্মা বিয়ে করেন। তবে তিনি বারবার প্রেমে পরেছেন। উর্মিলা মাতন্ডকার, অন্তরা মালি, রখসার রাহমান প্রমুখ নায়িকার সাথে তার নাম জড়িয়েছে বারবার। সিনেমার সেটে তাঁর স্ত্রী উর্মিলাকে চড়ও মারেন।

রামগোপাল ভার্মার সেরা কাজ

  • রঙ্গিলা

১৯৯৫ সালে নির্মিত ত্রিভুজ প্রেমের এই সিনেমাটি এখনো মনে হয় নতুন। মুম্বাইর সিনেমা হলে টিকিট ব্ল্যাক করা মুন্না প্রেমে পরে তার এলাকার মেয়ে। যে কিনা সিনেমার নায়িকা হবার স্বপ্নে বিভোর। সেসময় তার জীবনে আসে সুপারস্টার।

  • ভুত

ভারতীয় হরর সিনেমার ইতিহাসে ভূত অনন্য সংযোজন। সাইকোলজিকাল হরর ঘরানার সিনেমাটি সেসময় বক্স অফিস ও ক্রিটিক সবার মুখেই হাসি ফুটিয়েছিল। উর্মিলা মার্তোন্ডকারের অনবদ্য অভিনয় এখনো মানুষ স্মরণ করেন

  • সাত্যা

রামগোপাল ভার্মার আন্ডারওয়ার্ল্ড ট্রিলজির প্রথম সিনেমা সাত্যা। এই সিনেমার চিত্রনাট্য লেখেন সৌরভ শুক্লা (যিনি এই সিনেমায় কাল্লু মামা চরিত্রে অভিনয়ও করেন) ও অনুরাগ কাশ্যপ। আর এই সিনেমার ‘ভিকু মাত্রে’ চরিত্রে অভিনয় করে লাইম লাইটে আসেন ভারতের ইতিহাসের অন্যতম সেরা অভিনেতা মনোজ বাজপেয়ী। সিনেমার নাম ভূমিকায় ছিলেন সাউথ অভিনেতা জে. ডি. চক্রবর্তী। তাঁর বিপরীতে কাজ করেন রামুর লাকি মাসকট উর্মিলা।

  • কোম্পানি

আন্ডারওয়ার্ল্ড ট্রিলজির ২য় সিনেমা কোম্পানি। দাউদ ইব্রাহিমের চরিত্রের ছায়া অবলম্বনে তৈরি করা হয় অজয় দেবগনের চরিত্র মালিক। তার সাথে মনিষা কৈরালা,অন্তরা মালি, মালায়লাম মেগাস্টার মোহন লাল। আর এই সিনেমার মধ্য দিয়ে অভিষেক হয় বিবেক ওবেরয়ের। দুর্দান্ত অভিনয় করে তাক লাগিয়ে দেন তিনি।

  • কওন

সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা থ্রিলার সিনেমা। এ যুগে আমরা আন্ধাধুনের মত সিনেমা দেখে মুগ্ধ হই। সে সময় কওনের মত সিনেমাকে বোঝার ও গ্রহন করার মত দর্শকের অভাব ছিল। তা না হলে সিনেমাটি আরো আলোচনার দাবি রাখে।

  • সরকার

মহারাষ্ট্র ভিত্তিক ধর্মীয় রাজনৈতিক দল শিবসেনার প্রধান বালা ঠাকরের জীবন নিয়ে নির্মিত ট্রিলজি সিনেমার প্রথম কিস্তি এটি। অমিতাভ বচ্চনের অসাধারণ অভিনয় সাথে কে কে মেনন, অভিষেক বচ্চনদের চমৎকার সাপোর্টে সরকার বলিউডের রাজনৈতিক সিনেমার তালিকায় উপর দিকে থাকবে।

রোডট্রিপ কমিক থ্রিলার দৌড়, তাঁর অন্যতম প্রিয় চরিত্র ভিরাপ্পানের উপর নির্মিত প্রথম সিনেমা ‘জঙ্গল, মিডিয়া রাজনীতি নিয়ে নির্মিত ‘রণ’, তেলেংগানার গ্যাংস্টার থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে যাওয়া প্রতাপ রাবির জীবন নিয়ে নির্মিত ‘রক্ত চরিত্র’ সিরিজ তাঁর অন্যতম সেরা নির্মান। এছাড়া হরর তার প্রিয় সাবজেক্ট। হরর ফিল্ম ‘ফুক’ তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা কাজ। ‘২৬/১১’ সিনেমাটাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

প্রযোজক হিসেবে উপহার দিয়েছেন ‘শুল, ‘ডি’, ‘আবতাক ছাপ্পান’-এর মত প্রশংসিত সিনেমা। দিলসের সহ প্রযোজক হিসেবেও জড়িত ছিলেন।

  • স্বর্গ থেকে পতন

একের পর এক বিতর্ক, তার সাথে মানসিক সমস্যা, বিভিন্ন জনের থেকে অর্থ নিয়ে যাকে তাকে নায়ক বানিয়ে সিনেমা বানানো, ‘শোলে’র দুর্বল রিমেক ‘আগ’ – সব মিলিয়ে গত কয়েক বছরে একের পর এক বিতর্কে জড়ান। যদিও ‘আগ’ বানাবার পর বলেছিলেন সরকারের চেয়ে আগে তিনি বেশি পরিশ্রম দিলেও আগ কোনো সিনেমাই হয়নি। তাঁর নিজের পরিশ্রম জলে গেলেও তিনি দুঃখ পাননি। তবে দুঃখ পেয়েছেন এই সিনেমার সাথে অমিতাভ বচ্চন, অজয় দেবগন ও মোহনলালের নাম জড়ানোয়।

https://www.mega888cuci.com