অকৃতজ্ঞ টলিউড ভুলে গেছে দুঃসময়ের অন্নদাতাকে

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

তাঁকে মনে রাখার দায় যেন আজ আর কারও নেই। তিনি বাংলা ছবিকে বউ সিরিজ উপহার দিয়ে ডুবিয়ে দিয়ে গিছেন আজকালকার জ্ঞানপাপী দুটো শর্ট ফিল্ম বানানো পরিচালকরা দাবী করে। আজকাল ছবি বানানো মানেই সাদা কালো চাড্ডি শর্ট ফিল্ম বানিয়ে পরিচালক হওয়া। সেসব ছবিতে না আছে কোনো প্রাণের টান না ভরে মন।

আজকালের মূলধারার ছবিগুলো তো তামিল টোকা কিংবা এত বাজেট সেখানে মনের টান বাঙালিয়ানাটাও নেই। দেবদেবী গুলো শ্বেতপাথরের বলিউড টোকা। কোনো বাঙালি পরিবারে ওরকম ঠাকুরঘর হয় যেখানে লক্ষ্মীর পাঁচালী পিঠেপুলি ব্রতকথা নেই শুধু গুজরাটি টোকাশিল্প। কিন্তু যার কথা বলছি তাঁর ছবিগুলোতে নিখাদ বাঙালিয়ানা ছিল।

যার ছবিতে মহানায়ক উত্তম কুমার অভিনয় করবেন পাকা ছিল কিন্তু মহানায়কের মহাপ্রয়ান ঘটায় সেটা অধরা রয়ে গেল। তখন ছবির নাম ছিল ‘হব ইতিহাস’। নায়ক নয়, ভিলেনের চরিত্র করতেই উত্তম চেয়েছিলেন। তখন ছবিটির পরিচালক শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়। মহানায়ক মারা যেতে ছবিটি করেন অঞ্জন চৌধুরী।

‘হব ইতিহাস’-এর নাম হল ‘শত্রু’। ‘শত্রু’ বাংলা ছবির ইতিহাস থেকে কোনদিনো মুছে যাবে না। উত্তমের জায়গায় করলেন মনোজ মিত্র। রঞ্জিত মল্লিকের সারা জীবনে সেরা অভিনয় ‘শত্রু’। মাস্টার তাপুর ‘ও পুলিশ’ ডাক কেউ ভুলবেনা।

উত্তমের অসমাপ্ত ছবি – ‘হব ইতিহাস’

সুচিত্রা সেন অন্তরালে যাবার পরপর মিসেস সেনের সঙ্গে অনেকটাই কথা পাকা হয় যার ছবি করার কিন্তু সেই ছবি শেষ অবধি সুচিত্রা সেন করেননা। পরে সেই ছবি’র ‘অনন্যা’ নাম ভূমিকায় অপর্ণা সেন করে সুপারহিট হয় নব্বই দশকে।

হ্যাঁ তিনি অঞ্জন চৌধুরী। চিত্রনাট্যকার-পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী। তাঁর জন্ম অবশ্য বাংলাদেশেই, যশোরে। দেশভাগের আগে ১৯৪৪ সালের ২৫ নভেম্বর তাঁর জন্ম হয়। মারা যান ২০০৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি।

তাঁর মতো পরপর সিন প্রশ্নোত্তর দিয়ে ডায়লগ দিয়ে জুড়ে দেওয়া চিত্রনাট্য লিখতে কেউ কোনোদিন পারেননি। একজন সেরা চিত্রনাট্যকার তিনি। হেন বড় স্টার নেই বাংলা ছবির যিনি অঞ্জন চৌধুরীর ছবিতে কাজ করেননি।

যে ফিল্মবোদ্ধারা বলেন, অঞ্জন চৌধুরী বাংলা ছবিকে আরও কাদায় নামায় তারা কিন্তু এটা বলেন না, মহানায়কের মহাপ্রয়ানের পর টলিপাড়ার স্টুডিওপাড়ায় তালা ঝুলে যায়। সব ছবি বন্ধ হয়ে যায়। কোনো টেকনিশিয়ান খেতে পেতেননা। অন্ধকার যুগ চলে আসে।

অঞ্জন চৌধুরী

সত্যজিৎ, তপন, মৃনাল কিংবা তরুণ থাকলেও তাঁরা হয়তো বছরে দু-একটা ছবি বানাতেন কিংবা তাও না। মূলধারার ছবি একটাও তৈরী হতনা। তখন অঞ্জন চৌধুরী, বীরেশ চট্টোপাধ্যায় তার কিছু পরে প্রভাত রায় সুজিত গুহ’র মতো পরিচালকরা মূলধারার ছবিকে বানিজ্য সফল করান। হলের বাইরে লাল হাউসফুল বোর্ড ঝোলাতে সক্ষম হন।

টলিউড আবার নিজ ছন্দে ফেরে। আজ সেই পরিচালক চিত্রনাট্যকার অঞ্জন চৌধুরীর অবদান কি করে লোকে ভুলে যায়? অঞ্জন চৌধুরী বলতেন, ‘আমার ছবি প্যাকেটে করে বিদেশে আওয়ার্ড আনতে যায়না। যে ছবি বাংলার লোক দেখতে পায়না, আমার ছবির হলের বাইরে লাল হাউসফুল বোর্ড ঝোলে।’

কিন্তু শত্রু তো পুরস্কার পাবার মতোই ছবি। তাঁর ছবিতে থাকতো নিখাদ বাঙালিয়ানা যেটা দর্শক পাশের বাড়ির ঘটনা দেখছে ভাবে। তাঁর ছবিতে বিশাল বিশাল সেট, বিদেশে কোটি টাকার লোকেশানে গান থাকতনা কিন্তু উল বোনা, কুরুশের কাজ করা কত শিল্প,বাঙালির পুজো পার্বণ, একান্নবর্তী পরিবারের রান্নাবান্না থাকত।

সব পরিচালকেরই ভালো মন্দ কাজ থেকে, ঋতুপর্ণ-র ব্যোমকেশও ট্রাশ মুভি। তাই সবারই শেষের দিকে অনেক ট্রাশ ওয়ার্ক থাকে তাতে তাদের অবদান মুছে যায়না।

চুমকি ও রিনা

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, রুমা গুহঠাকুরতা, উৎপল দত্ত, গীতা দে, রবি ঘোষ, অনুপ কুমার, সন্ধ্যা রায়, সুপ্রিয়া, সাবিত্রী, মাধবী, মহুয়া, দেবশ্রী, মীনাক্ষী গোস্বামী, কালী বন্দ্যোপাধ্যায় – কে কাজ করেননি অঞ্জন চৌধুরীর সঙ্গে! চুমকি চৌধুরীর মেজ বউ, ইন্দ্রজিৎ, নাচ নাগিনী নাচ রে – এত সুপারহিট হয় চুমকি জায়গা করে নেন দেবশ্রী মুনমুন শতাব্দী দের গ্ল্যামারের পাশে।

নায়িকা হতে হবে স্লিম অ্যান্ড ট্রিম হতে হয়না দশর্কের হৃদয়ে পৌঁছাতে হয়। সেটা চুমকি করে দেখিয়েছেন। রীনা চৌধুরীর ‘পূজা’, ‘আব্বাজান’ পশ্চিম বাংলাসহ বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ মনে রেখেছে আজও। আর বউ সিরিজের ডায়লগ, সন্ধ্যা রায় ভালো বউ, সঙ্ঘমিত্রা ব্যানার্জ্জী কুচুটে বউ, সোহমের হরলিক্স খাওয়া – এত দশক মানুষ মনে রেখেছে সেটা কোথাও তার পরিচালনার গুন।

অসম্ভব সুপারহিট ছবি করতেন উনি। ভবাণীপুরের যে ভারতী সিনেমা হল আজ বন্ধ সেই হল ‘গুরুদক্ষিণা’ স্টপেজ নাম হয়ে যায় এত দর্শক নামতো ঐখানে সিনেমা দেখতে।

সিঙ্গেল স্ক্রিনকে বাঁচিয়ে রাখতে অঞ্জন বীরেশ প্রভাত দের মতো পরিচালকদের দরকার আজও যে জায়গাটা শিবপ্রসাদ নন্দিতা কিছুটা পূরন করেছেন। কিন্তু আরও দরকার। সাদা কালো আর্ট ফিল্ম যেকোন আর্ট ফিল্ম আর এইসব তামিল টোকা বানিজ্যিক ছবি করে গেলে সিঙ্গেল স্ক্রিন হল গুলোকে আরও বন্ধ করে দেবে।

এত সিনেমা হল উঠে গেল,আজকাল সিনেমা দেখা বিলাসিতা একটা ছবি দুশো তিনশো টাকা মাল্টিপ্লেক্সে দেখা। কিন্তু মাল্টিপ্লেক্স কোনদিনও সিঙ্গেল স্ক্রিনের আবহ তৈরী করতে পারেনা। বহু মানুষ ছবি দেখেনা সিঙ্গেল স্ক্রিনের অভাবে। কত ছবি হল পায়না সিঙ্গেল স্ক্রিনগুলোর কেউ যত্ন নেয়নি বলে।

অনেক আগেই উঠে যেত যদিনা অঞ্জন চৌধুরীর মতো পরিচালকরা হাল না ধরতেন। শুধু হলিউড ছবি আর আর্ট ফিল্ম দেখলেই ফিল্মবোদ্ধা হওয়া যায়না। আর্ট ফিল্ম কোনদিনও কমার্শিয়াল ছবির মতো পেটে ভাত জোগাতে পারেনা টেকনিশিয়ানদের। সব ছবি দরকার ভালো ছবি মন্দ ছবি আর্ট মূলধারার।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।