ফিলিপ হিউজ নামের বেদনার সুর

২৫ নভেম্বর ২০১৪। অস্ট্রেলিয়ার শেফিল্ড শিল্ডের খেলা চলছে। তরুণ বাঁহাতি ব্যাটসম্যান ফিলিপ হিউজ তখন উইকেটে সেট হয়ে গেছেন।

একটার পর একটা বাউন্সার আসছে, হিউজ তাঁর নান্দনিক জবাব দিচ্ছিলেন। ২০১৫বিশ্বকাপে ডাক পেতে মরিয়া এই ব্যাটসম্যান গোটা শিল্ড আসর জুড়েই ছোটাচ্ছিলেন রানের ফোয়ারা। সেদিনও দ্রুতই ফিফটি করে ফেললেন। অমন ঘাসের উইকেটে ক্ষুরধার বোলিংয়ের সামনে হিউজ যেভাবে খেলছিলেন, অজি সংস্কৃতিতে বলের সাথে সাথে মুখ চলাটাও ছিল স্বাভাবিক বিষয়।

লিড পেসার শন অ্যাব্যোট বাউন্সারে মার খেয়ে ক্ষেপে গিয়ে বলেই ফেললেন, দাঁড়াও তোমাকে যমের বাড়ি পাঠাচ্ছি! হিউজ কিছু বললেন না, হাসলেন স্মিত। অ্যাব্যোট দুঃস্বপ্নেও হয়তো চিন্তা করেন নি, তাঁরই একটি বাউন্সার তাঁর কথা মিলিয়ে দিয়ে যাবে!

রান তখন ৬৩, অ্যাব্যোটের বাউন্সারটা গ্রিন পিচে আউটসুইং করে একটু বেশিই লাফালো, উচ্চতা আন্দাজ করতে পারেননি হিউজ। হুক করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বল ব্যাটকে ফাঁকি দিয়ে লাগল এমন জায়গায়, যেখানে হেলমেট কভার করতে পারেনি, কানের নিচ অংশটায় ঘাড়ের একটু আগে।

সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়লেন তিনি, জ্ঞান হারালেন, দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হল।  হিউজ সারাজীবনের জন্য অপরাজিত কিংবা অমর হয়ে গেলেন।

হিউজকান্ড শোনার পর আমজনতার লজিক দিয়ে ভাবছিলাম, হিউজ হয়তো মারা যাবেন না। ঘাড়ে তো আর স্ট্রোক বা অ্যাটাক করার মত কিছু নেই, বলতো আর মাথায় লাগেনি! রক্ত হয়তো জমাট বেধেছে, ডাক্তার অপারেশন করবেন, ঠিক হয়ে যাবে।

জুলজির সবচেয়ে বাজে ছাত্রটির তখনো অজ্ঞাত ছিল যে, বল মাথায় না লেগে কানের তলায় লাগা আরো বেশি ভয়ংকর। মাথায় খুলি নামক একজন গার্ড আছেন, সাথে হেলমেট। কিন্তু ঘাড়ে যে কিছু নেই! ঘাড় খুবই স্পর্শকাতর জায়গা।

বড় আঘাতে ধমনী ছিড়ে ব্রেইন স্ট্রোক ঘটে মৃত্যু অবধি হতে পারে, তা তখন মেনে নেওয়া কষ্টদায়ক হবে।

বন্ধুকে ঠাট্টার ছলে কিছু হলেই বলি, ‘এক্কেরে কানের নিচে দিমু’ অথবা ‘মাইরা মাথা ফাটায়া দিমু’ বলতে বলতে দুয়েক ঘা বসিয়েও দেই। কিন্তু ফিল হিউজ নিজের জীবনের বিনিময়ে শিক্ষা দিয়ে দিলেন, এসব অঙ্গ নিয়ে নো তামাশা! সুতরাং যারা মাঝেমাঝে বন্ধুরা মিলে ডব্লিউডব্লিউই খেলা শুরু করে দেই, ফিলিপ হিউজ তাঁদের সামনে একটি সতর্কবার্তা।

আমাদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর ক্রিয়াপ্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল, কোন একটি জায়গায় অল্প একটু ডিপ্লেসমেন্ট বা মন্থরতা কারণ হতে পারে খুব ভয়াবহ কিছুর।

অস্ট্রেলিয়ার মত দেশে ফিল হিউজ রেয়ার একটি ইনজুরিতে মারা গেলেন, ধমনিতে বল লেগে ধমনি ছিঁড়ে রক্ত সারা মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়েছিল, ডাক্তাররা হাজার চেষ্টা, আধুনিকতম প্রযুক্তি দিয়েও রিকভার করতে পারেননি।

আপনার বাউন্সারে আপনার উলটোসাইডে দাঁড়ানো ব্যাটসম্যান আঘাত পেয়ে গুরুতর কোন ইনজুরিতে পড়লে সে দায়িত্ব কে নেবে? টেপ টেনিস বলও মোক্ষম জায়গায় লাগলে মৃত্যু ঘটাতে পারে!

কিংবা বলটিকে খেলতে গিয়ে শরীরের কোন এক পেশিতে এমনভাবে টান লাগলো যা পরবর্তীতে আপনার বন্ধুকে বড় ধরণের শারীরিক সমস্যায় ফেলতে পারে। যেমন অল্পবয়সে স্থায়ী বাতের ব্যথা।

ফিল হিউজের ঘটনা অত্যন্ত শোকের, সাথে আমাদের সচেতনতার জন্য হুশিয়ারি দেয়।

আমাদের প্রফেশনাল ফিটনেস ট্রেনিং নাই, আমরা বিনোদনের জন্যই ক্রিকেট খেলি, সুতরাং আমাদের সেফ প্লেয়িং এর কৌশল সম্পর্কে ধারণা কম। তাই যারা খেলবেন এসব বিষয়গুলোতে বিবেক জাগ্রত রাখবেন, সতর্ক থাকবেন।

যেখানে অস্ট্রেলিয়ার মত সচেতন দেশের জাতীয় দলের ক্রিকেটার মাঠের খেলায় মারা গেলেন, আমরা সে তুলনায় প্রটেকশন এর কিছুই জানিনা। তাই আমাদের ঝুঁকি বেশি। আমরা এ ধরণের ঘটনা আর শুনতে চাইনা।

তাঁর মৃত্যুর পর আইসিসি এ ব্যাপারে সতর্ক হচ্ছে, হেলমেট ডিজাইনে আসছে পরিবর্তন। কুমার সাঙ্গাকারাকে দেখা গিয়েছিল, ঘাড় কভার করা হেলমেট পড়তে। আমার এতগুলো কথার মূল উদ্দেশ্য সতর্কতা।

ক্রিকেট ঘাতক নয় বরং ভালোবাসা হয়ে থাকুক আমাদের মাঝে।

https://www.mega888cuci.com