রহস্য-রোমাঞ্চ ও জীবন বাঁচানোর মিশন

ধরুন আপনি একজন সাধারণ মানুষ, কারো সাথে কোনো ঝামেলা নাই। অফিস শেষ করে অফিসের পাশের কফি শপে কফি খেতে বসেছেন এমন সময় স্যুট পড়া এক লোক এসে আপনাকে তাঁর সাথে যেতে বললো! কারণ জানতে চাইলে সে বললো কেউ আপনাকে মারতে চাচ্ছে আর সে আপনাকে বাঁচাতে এসেছে। লোকটাকে পাগল বলে পাত্তা না দিয়ে কফির কাপ হাতে তুলতেই একটা গুলিতে চূর্ণবিচুর্ণ হয়ে গেল আপনার হাতের কাপ। পুরা ব্যাপারটা ঘোলাটে লাগলেও সেই আগন্তুকের মাধ্যমেই নিজের জীবন বাচলো আপনার।

অনেক প্রশ্ন আপনার মাথায় ঘুরতে শুরু করলো। কে এই লোক? আমাকে কিভাবে চিনে? কেউ আমাকে মারতে চায় সেটা আমি জানি না অথচ সে কিভাবে জানলো ইত্যাদি! কিন্তু এর কোনো উত্তরই পেলেন না তার কাছ ত্থেকে। উলটা আপনার সম্পর্কে সব বলে দিল লোকটা। আপনি কোথায় থাকেন? আপনার গার্লফ্রেন্ড এর কি নাম? আপনি কোন ব্র্যান্ডের ঘড়ি হাতে দেন, কোন ব্র্যান্ডের পারফিউম ব্যবহার করেন সব!

আবার আশ্চর্যজনকভাবে ঠিক পরেরদিন আপনার একজন বন্ধুকেও এভাবে বাচালো স্যুট পড়া সেই লোক।

এরপর আরেকজনকে। এভাবে প্রতিদিন শহরের প্রতিটা মানুষ যাদের নিজেদের অজান্তেই কেউ মেরে ফেলতে চাচ্ছে। আবার কখনো সরাসরি হামলাকারীকেই থামিয়ে দিচ্ছে!

কেমন হবে আসলেই যদি এমন কিছু ঘটে? আর যদি ঘটেই তাহলে কিভাবে সেই লোক আপনার সম্পর্কে সব জানে? কিভাবে আগে থেকেই জানে কেউ আপনাকে মারতে চায় আর কোথায় গেলেই বা আপনাকে বাচানো যাবে? এর মানে আপনার প্রতিটা মুভমেন্ট এর উপর নজর রাখা হচ্ছে। এমনকি আপনার আশেপাশের লোকদের উপরও। যাদের গতিবিধির উপর ভিত্তি করেই কেউ জেনে যাচ্ছে কে আপনাকে মারতে চাচ্ছে।

আর সেই নজরদারি যদি করে আপনার দেশের সরকার? কিন্তু আপনাকে তো বাচলো সরকারি কেউ না, মানে আইনরক্ষাকারী বাহিনীর কেউ না। তাহলে এই লোক কিভাবে সব জানলো? কেন আপনাকে বাচালো? আর সরকারই বা কেন আপনাকে বাচানোর চেষ্টা করলো না?

ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং হবে যদি আসলেই এমন কিছু হয়। ঠিক এমন একটি থিমের উপরেই ৫ সিজন আর ১০৩ এপিসোডের এক লম্বা সিরিজ ‘পার্সন অফ ইন্টারেস্ট’ বানিয়েছেন জনাথন নোলান।

গল্পটা ঠিক এভাবেই শুরু হয়। একজন রহস্যময় কম্পিউটার জিনিয়াসের সংগৃহীত তথ্য আর সেই তথ্য কাজে লাগিয়ে একজন সাবেক সিআইএ স্পেশাল এজেন্ট মানুষের জীবন বাচানোর মিশনে নামেন। কিন্তু প্রতিটা এপিসোডের সাথে সাথে গল্পের ডালাপালা ছড়াতে থাকে। বাড়তে থাকে নতুন সব চরিত্র আর গল্পের মোড়।

সিরিজের ক্রিয়েটর জনাথন নোলান ও তার টিম কি পরিমাণ এফোর্ট দিয়েছেন তা বুঝা যায় প্রতিটা এপিসোডে নতুন একেকটা গল্প দেখে। প্রতিটা এইসোডই যেন একেকটা ভিন্ন গল্প, ভিন্ন মিশন। কিন্তু সবকিছু যেন এক সুতায় বাঁধা! এত সুন্দর করে এতকিছু একসাথে ব্যালেন্স করে নতুন নতুন ক্যারেক্টার আর মূল গল্পের ডেলেলপমেন্ট করা হয়েছে তা এক কথায় অসাধারণ। প্রতিটা এপিসোডেই মনে হচ্ছিল আগের এপিসোডের চাইতে গল্পটা বেশি পরিপক্ক, প্রতিটা ক্যারেক্টার এর প্রতি এ্যাটাচমেন্টও বাড়তে থাকে সময়ের সাথে।

আসলে জনাথন নোলান এর কাজ কেমন হতে পারে সেটা তার সম্পর্কে যারা জানেন তারা এই লোকের নাম শুনলেই বুঝার কথা। ভাই ক্রিস্টোফার নোলানের সাথে মিলে লিখেছেন মেমেন্টো, দ্যা প্রেস্টিজ, দ্যা ডার্ক নাইট, ডার্ক নাইট রাইজেস, ইন্টারস্টেলার এর মত মুভির গল্প ও স্ক্রিনপ্লে।  ‘পার্সন অব ইন্টারেস্ট’-এর পর তৈরি করেছেন নতুন সিরিজ ‘ওয়েস্ট ওয়ার্ল্ড’।

এই লোকটা জিনিয়াস আসলেই। একটা সিরিজে ড্রামা, অ্যাকশন, ক্রাইম, থ্রিলার, সাই-ফাই, ইমোশন কি রাখেনি সে! আর্টিফিশ্যাল ইন্টেলিজেন্স এর ব্যাপারগুলো খুবই ইন্টারেস্টিং। আর সবকিছু মনেহয় একদম পারফেক্টলি ব্লেন্ড। দেখেছি আর মুগ্ধ হয়েছি। সাথে রামিন জাওয়াদির থিম মিউজিক। একদম জমে ক্ষীর!

এর আগে কোনো সিরিজ দেখে এমন অনুভূতি হয়নি আমার যেটা পার্সন অফ ইন্টারেস্ট দেখে হয়েছে। এর আগে কোনো সিরিজের এতগুলা ক্যারেক্টারের প্রতি এত ভালবাসা জন্মায়নি আমার। ক্যারেক্টারগুলো হাসাবে, গুজবাম্প দিবে আবার কাঁদাবেও আপনাকে!

২৫ দিন আগে দেখা শেষ করেছি, এখনো মনে হয় হ্যাংওভার কাটেনি। শেষ করার পর টানা ৭ দিন কিছুই দেখতে পারিনি। সারাক্ষণ এই সিরিজ আর বিভিন্ন ক্যারেক্টার মাথায় ঘুরেছে। প্রতিদিনই মনে হয় আবার দেখা শুরু করবো। কেমন একটা অশান্তি লাগে চিন্তা করলেই!

আসলে অনেক আগে থেকেই দেখার ইচ্ছা থাকলেও সময়ের অভাবে এত বড় সিরিজ শুরু করা হয়নি। এবার লক ডাউনের সুযোগে দেখে ফেললাম ওয়ান অফ দ্যা মোস্ট আন্ডাররেটেড এই সিরিজ। আন্ডাররেটেড হওয়ার একটা বড় কারণ হতে পারে এত বড় সিরিজ এইজন্য অনেকেই হয়তো দেখেননি এটা।

আমারও এতদিন না দেখার জন্য আফসোস যেমন হয়েছে তেমনি ভালও লেগেছে টানা দেখতে পেরে। সবচেয়ে ভাল লাগছে যে পরিচিত অনেকেই দেখছে এই সুযোগে এবং সবাই খুব পছন্দ করছে।

যারা নিয়মিত সিরিজ দেখেন তাদের হয়তো সবারই দেখা হয়েছে ‘পার্সন অব ইন্টারেস্ট’, যেহেতু বেশ আগের সিরিজ। যারা দেখেননি তাঁদের জন্য হাইলি রিকমেন্ডেড। তবে একটু বড় মনে হতে পারে অনেকের কাছে। আমার যেমন লাগেনি। সেটা অবশ্যই পছন্দের উপর নির্ভর করে সবার। তবে ভাল লাগবে সেটা বলতে পারি।

 

https://www.mega888cuci.com