বিশ্ব কাঁপানো ঢাকার এক গেরিলা অপারেশন

১১ ডিসেম্বর ১৯৭১। একাত্তরের এদিন স্বাধীনতার সূর্য বাংলার দিগন্তে সুস্পষ্ট। এদিনটিতেই অবরুদ্ধ ঢাকায় পরিচালিত হয়েছিল শেষ গেরিলা অপারেশনটি (প্রাপ্ত তথ্যানুসারে)। এ গেরিলা আক্রমণটি পুরো পৃথিবীর কাছে সেই বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল, ‘বাংলার মানুষকে আর দাবায়ে রাখা যাবেনা’। বঙ্গোপসাগরে মার্কিন সপ্তম নৌবহর প্রেরণের প্রতিবাদ’ও ছিল এই অপারেশন।

আমেরিকান কালচারাল সেন্টারে (ইউসিস ভবন নামে পরিচিত) এই গেরিলা হামলা চালানো হয়েছিলো। প্রেসক্লাবের বিপরীতে অবস্থিত ভবনটি আজও আছে। গেরিলারা ইউসিস আক্রমণ করে আমেরিকার কাছে সতর্কবাণী পাঠাতে চেয়েছিলেন। ফলে, ওই সময় পাকিস্তানের বন্ধু বলে পরিচিতি আমেরিকা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল।

সমগ্র বাংলাদেশ থেকে দ্রুত বিতাড়িত হতে থাকা পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তখন উন্মাদের মতো, হিংস্রতা ও বর্বরতা দিয়ে যেন নিজেদের আগের গণহত্যা ও নিপীড়নকেও ছাপিয়ে যেতে চাইছে। এমতাবস্থায় ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে দুঃসাহসী এ অভিযান পরিচালনা করেছিলেন চারজন অকুতোভয় গেরিলা যোদ্ধা।

তাঁরা হলেন যথাক্রমে মানু, ফুলু, স্থপতি জিয়াউদ্দিন ও স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বাবুল। গেরিলা যোদ্ধা স্থপতি জিয়াউদ্দিন ও স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বাবুল সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রশিক্ষণ নেননি। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তাঁরা দেশের অভ্যন্তরে অস্ত্র ও বিস্ফোরক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। এবং আরও স্মর্তব্য যে, এই দুর্ধর্ষ অপারেশন পরিচালনাকারীদের মাঝে গেরিলা যোদ্ধা মানু এবং ফুলু, ‘মেলাঘর’ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছিলেন।

১১ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে, অবরুদ্ধ ঢাকার শেষ গেরিলা অপারেশনে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলেন বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন।

৪৭ বছর পূর্বে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম দুঃসাহসী অভিযানের বর্ণনা দিয়েছেন স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন। আমরা তাঁর মুখে সেই গেরিলা অপারেশনের বর্ণনা তুলে ধরলাম:

আমেরিকা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সরাসরি বিরোধিতা করেছে। এ কারণে আমারা সিদ্ধান্ত নিলাম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আমেরিকান সেন্টার বা ইউসিস বিল্ডিং ব্লো করে প্রমাণ করতে হবে যে মুক্তিযোদ্ধারা আমেরিকার ভূমিকায় ক্ষুব্ধ। এই বিল্ডিং উড়িয়ে দেবার দায়িত্ব দেয়া হলো আমাকে। এই বিল্ডিং তখন ছিল সবচেয়ে সুরক্ষিত জায়গায়। এখন যেখানে সচিবালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (তখন সম্ভবত জেলা প্রশাসকের অফিস ছিল) সেখানে আর্মি ক্যাম্প ছিল। দুই বিল্ডিংয়ের ওপরে সার্বক্ষণিক মেশিনগান নিয়ে পাহারা দিত পাকিস্তান আর্মিরা। বর্তমানে জাতীয় প্রেসক্লাবের বিপরীতে কর্ণারে যে বিল্ডিংটা ওটা ছিল সে সময় ইউসিস বিল্ডিং। খুব রিস্ক ছিল এ অভিযানে।

গেরিলা অপারেশনের আগে আমরা এ জায়গাটা রেকি করলাম। আমাদের হিসেবে এই বিল্ডিং ব্লো-আপ করলে ন্যূনতম ১০ থেকে ১২ জন লোক মারা যাবে। কোনো বিকল্প নেই। আমি কিছুতেই এত মানুষের মৃত্যু মানতে পারছিলাম না। আমার সঙ্গে ছিল মানু। ও বাইরে থেকে ট্রেনিং নেয়া হাইলি কোয়ালিফাইড। মানু বুয়েটে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ত। আমাদের চেয়ে ভালো ট্রেনিং ছিল তার। সঙ্গে আমার সহপাঠি বন্ধু জিয়াকে নিলাম। জিয়া (বর্তমানে স্থপতি) মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই প্রাইজবন্ডের পুরস্কার পেল। পুরস্কারের টাকায় একটা ভক্সওয়াগন গাড়ি কিনে ফেলল। ওই গাড়ি আমরা ব্যবহার করেছি মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন কাজে।

সিদ্ধান্ত হল, আমরা একটাও নিরীহ মানুষকে মরতে দেব না। কীভাবে? আগে ইউসিস বিল্ডিং থেকে সব লোককে বের করে দিয়েই করব আমাদের অপারেশন। মানুর বক্তব্য ছিল লোক বের করতে গেলে তো আমাদেরকেই মরতে হবে পাকিস্তানি মিলিটারির গুলিতে। সিদ্ধান্ত হল – উই উইল টেক দ্য রিস্ক। সাধারণ মানুষগুলোকে রক্ষায় অনেকটা আত্মাহুতি দেবার মতো চিন্তাভাবনা।

জিয়ার গাড়ির নাম্বার প্লেট বদলাতে হবে। বদলাব কোথায়? সেই সময় ঢাকা শহর ঘুরে ঘুরে দেখেছি নিরাপত্তা বিবেচনায় সবাইতে দুর্বল জায়গা হচ্ছে থানার আশপাশে। থানার পাশে পুলিশ সবচাইতে কেয়ারলেস ছিল। বর্তমানে রমনা থানার যে পাশ দিয়ে রাস্তাটা যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বাড়ির দিকে গেছে, সেটি তখন ছিল দু’পাশে জঙ্গলে ভরা নিরিবিলি সরু একটি রাস্তা।থানার প্রবেশ পথটি ছিল বর্তমান প্রধান সড়ক থেকে।

মাঝেরজন স্থপতি কাজী নুরুল করিম, দিলু নামেই খুব বেশি পরিচিত। স্বাধীনতা যুদ্ধে ফরিদপুর জেলায় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অবদান রেখেছিলেন।
বাম দিকে নিভৃতচারী গেরিলা যোদ্ধা স্থপতি জিয়াউদ্দিন , যিনি জীবন নামেই পরিচিত। ইউসিস ভবন অপারেশনে তাঁর ভক্সওয়াগন গাড়িটি ব্যবহৃত হয়েছিল।
সর্বডানে, গেরিলা যোদ্ধা, স্থপতি শ্রদ্ধেয় মোবাশ্বের হোসেন। আই.এ.বি এর প্রাক্তন সভাপতি, আর্কএশিয়া ও সি.এ.এ এর প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট। রণাঙ্গনে তিনি বাবুল নামে পরিচিত ছিলেন। অনেকেরই অজানা এই নাম!

থানার ওপাশের সরু পথের পাশে ভক্সওয়াগন গাড়িটা দাঁড় করিয়ে আমরা নম্বর প্লেট বদলালাম। ওখানে থানার পাশেই আমরা প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ ভরা ব্রিফকেস ও আর্মসগুলো ভাগ করে নিলাম। মানুষ দেখছে আমরা গাড়ি ঠিক করছি। সারা ঢাকা ঘুরে আমার কেন জানি মনে হয়েছিল এ জায়গাগুলোই হচ্ছে সবচাইতে নিরাপদ। এখানে কেউ সন্দেহ করবে না। অপারেশন শেষে একই পদ্ধতিতে ওই জায়গায় এসেই আমরা গাড়ীর সঠিক নাম্বার লাগিয়ে অস্ত্রগুলো একত্রিত করে নিরাপদ স্থানে রেখেছিলাম। আমাদের গায়ের কোট পরিবর্তন করেছি ওখানেই। এগুলো এখনো অবিশ্বাস্য লাগে। হয়ত ওই বয়সে মুক্তিযুদ্ধের সময়েই এ রকম কাজ করা সম্ভব !

আমাদের অপারেশনের মুল প্রস্তুতি নেয়া হয়ে ছিল আমাদের প্রায় সব কাজের প্রস্তুতি কেন্দ্র বর্তমান বুয়েটের আহসানউল্লাহ হলের শহীদ বদিউজ্জমান বদির রুমে। এই অপারেশনের পর তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল পাকি দালাল রাজাকাররা। বদি আর ফিরে আসেনি আমাদের মাঝে।

ব্রিফকেসে এক্সপ্লোসিভসহ ডেটোনেটর লাগান। আমি এক্সপ্লোসিভ নিয়ে ডেটোনেট করব। আমার পেছন থাকবে মানু, অস্ত্র নিয়ে সে আমাকে কাভার করবে। সকাল প্রায় নয়টায় আমরা পৌছে গেছি ইউসিস বিল্ডিং। যাতে ইউসিস খোলার সঙ্গে সঙ্গে কাজটা শেষ করা যায়।এত সকালে ওখানে লোকজন কম থাকবে, ক্ষয় ক্ষতির সম্ভাবনাও যাবে অনেক কমে। ঐ সকালেও যেয়ে দেখি ওখানে ১৫-২০ জন লোক, তারা পড়াশোনা করছে। আমরা দুজন কোট পরে ঢুকেছি।

স্টেনগান কোটের ভেতরে। ঢুকেই সবাইকে হাত তুলতে বলেছি। স্টেনগান দেখার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে সবাই হাত তুলেছে। একজন আর হাত তোলে না। তাকে গালি দিয়ে বের করা হলো। পরে জানতে পারলাম সে বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের ছাত্র সামদানী (পরবর্তীতে বিদেশে দুর্ঘটনায় মারা যায়), আমাকে চিনে ফেলেছে। আমাকে দেখে সে ভয় পেয়ে ভেবেছিল, যদি আমি তাকে চিনতে পারি, তবে হয়তো তাকে আমি অন দ্য স্পট গুলি করে মেরে ফেলব। এই ভয়েই সে হাত তুলছিল না।

সবাইকে নির্দেশ দেয়া হল, ডানে বায়ে কেউ তাকাবেন না। ঝড়ের বেগে দৌড়াতে দৌড়াতে চলে যাবেন। চলে যাবার পর ডেটোনেট কর্ডে দিয়াশলাইয়ের আগুন দেয়া হলো। কিছুক্ষণ পর দেখি ডেটোনেটর কর্ডের আগুন দৃশ্যমান হচ্ছে না। আমাদের শেখানো হয়েছে একবার ডেটোনেট করার পরে দ্বিতীয়বার নেভার ট্রাই। সুপ্ত আগুনে বার্স্ট হয়ে যেতে পারে। আমার মাথায় তখন এসব ভয়ডর নেই। অপারেশন সাকসেসফুল হওয়াটাই ছিল তখন একমাত্র চিন্তা। দ্বিতীয়বার আগুন দেবার পর দুজনে বের হয়ে এসেছি। বাইরে স্টার্ট করা গাড়িতে অস্ত্র সহ বসা মুক্তিযাদ্ধা ফুলু।

হামলার পরের দিন অর্থাৎ ১২ ডিসেম্বর ১৯৭১ তোলা হয় ইউসিস ভবনের এই ছবিটি।

ইউসিসের অডিটোরিয়ামে ঢোকার পথে রিসিপশনিস্টের মহিলার সঙ্গে গল্প করছে বন্ধু জিয়া। অসম্ভব সাহসী ছিল জিয়া। যে কোনো উত্তেজনাকর মুহূর্তে স্বাভাবিক থাকতে পারার অসাধারণ গুণ ছিল তার। মানু ছিল সব সময় আমার পাশে পাশে। আমরা সবাই যেয়ে গাড়িতে উঠলাম। উঠার সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণ হলো। আমি এত টেনশনে ছিলাম যে, ওই শব্দও শুনতেই পাইনি। শুধু দেখলাম দরজা-জানালার কাচ চারদিকে উড়ে যেতে, অসংখ্য মানুষ জ্ঞান শূন্য হয়ে দৌড়াচ্ছে চারদিকে।

ওই বিল্ডিংয়ের পাশে সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিংয় ও পাশের ভবনে ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এই বিল্ডিংয়ে ছিল অডিটোরিয়াম, লাইব্রেরিসহ আমেরিকান অফিস।

অপারেশন করার পর আমরা ওখান থেকে চলে গেলাম সেই রমনা থানার পাশের রাস্তায়। অস্ত্র গোলাবারুদ একত্রিত করে নিরাপদ স্থানে রাখার ব্যবস্থা করা হলো। এরপর আমার গোপীবাগের ৫৩, রামকৃষ্ণ মিশন রোডের বাসায় চলে এলাম। বাসায় এসে আমার ছোট্ট সন্তানটিকে কোলে নিয়ে স্বাভাবিক ভাবে রাস্তায় ঘুরে বেড়ালাম। আমাদের বাসার একটা অংশে ছিল সরকারি অফিস।

সেক্রেটারিয়েট এলাকায় দিনের বেলায় এই ঘটনা ঘটার পরিপেক্ষিতে ভীতিজনক এলাকার বাসাবাড়ী ছেড়ে সরকারি অফিসের বেশ কিছু বড় কর্তা পরিবার পরিজনসহ নিরাপদ মনে করে আশ্রয় নেয় এই সরকারি অফিসে। পাশের বাড়ির এক অবাঙালি পরিবারের কর্তা দৌড়ে এসে আমাকে জানাল – ‘শুনছেন, কি হয়েছে জানেন? ডেঞ্জারাস ঘটনা। ঢাকা শহরের ভেতর এত বড় বিস্ফোরণ ঘটল! তাও দিনের বেলা সকাল নয়টায়! খুব সাবধানে থাকবেন।’

এ দুঃসাহসিক অভিযানের সাথে যুক্ত প্রতিটি গেরিলা যোদ্ধার প্রতি আমাদের হৃদয় গভীরের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।

কৃতজ্ঞতা: গেরিলা ১৯৭১

https://www.mega888cuci.com