নিদাহাস ট্রফির ফাইনাল ও কিছু ভয়ানক অভিজ্ঞতা

|| প্রেমাদাসা স্টেডিয়াম, কলম্বো থেকে ফিরে ||

অফিসিয়াল কাজের জন্য নিদাহাস ট্রফির ফাইনালের আগেরদিন কাকতালীয়ভাবে গিয়েছিলাম শ্রীলঙ্কাতে। বিমানবন্দরে ইমিগ্র্যাশন অফিসার শুধু জিজ্ঞেস করলো, ‘আর কেউ হেয়ার ফর দ্য ম্যাচ?’ আমি বলেছিলাম, কাজের জন্য এসেছি, সাথে এটাও ফিল করতে পারছিলাম, শ্রীলঙ্কানরা আমাকে শুধু ক্রিকেট দিয়েই চেনার চেষ্টা করছে।

যাই হোক, অনেক উত্তেজনা নিয়ে সরাসরি প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে গিয়েছিলাম নিহাদাস ট্রফির ফাইনাল ম্যাচ দেখতে। খুবই বাজে কিছু অনুভূতি নিয়ে খেলা শেষ হওয়ার আগেই, নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে চলে এসেছি। প্রথমেই বলি, গত দুই ম্যাচ এ শ্রীলঙ্কাতে আমাদের দেশের মানুষ এবং ক্রিকেট টিম সম্পর্কে ওদের মাঝে কি ইমেজ গড়ে উঠেছে আর সেটা কি বড় ধরণের ক্ষতি হয়ে গেছে।

দ্বিতীয় ম্যাচে মুশফিক আমাদের দেশ কে জয় এনে দিয়েছিলো ঠিকই, কিন্তু তার কোবরা ডান্স সেলিব্রেশন, শ্রীলংকানরা সহজে মেনে নিতে পারেনি। কলম্বোতে আসার আগে আমি এটা জানতাম না যে কোনো একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা যে ড্রেসিং রুম ব্যবহার করছিলো, ওটা ভেঙে ফেলেছে।

ফাইনাল খেলার পরের দিন ওদের দ্য আইল্যান্ড নামক পত্রিকায় দেখলাম ছেপেছে, সাকিব ড্রেসিং রুম এর গ্লাস ভাঙার সাথে জড়িত। সেলেব্রেশনের সময় উত্তেজনায় কোনো একপর্যায়ে সাকিব এই কাজ করেছে বলে ওদের ওই দৈনিক পত্রিকার আর্টিকেলে অভিযোগ উঠেছে। কি আজব অভিযোগ! পরবর্তী ম্যাচে, ফাইনাল এ যাওয়ার বাঁচা মরার লড়াই-এ, বাংলাদেশ দুর্দান্ত জয় পেয়ে মাঠে যখন দলীয় ভাবে কোবরা ডান্স উদযাপন করলো, আমাদের টিম তখন ম্যাচ এ জয়ী হলেও, শ্রীলঙ্কানদের সাপোর্ট সব সময়ের জন্য হারায়।যদিও, বাংলাদেশের কোনো খেলোয়াড় আদৌ এর সাথে জড়িত কি না, তার কোনো জোর প্রমাণ অবশ্য পাওয়া যায়নি।

আমি এখন প্রেমাদাসাতে যা হয়েছে সেটা বলি। প্রথমেই যখন আমাদের উইকেট একের পড়ছিল, আমাদের সামনে কয়েকজন শ্রীলঙ্কান ইচ্ছা করেই খুব বাজেভাবে নাগিন ড্যান্স দেয়া শুরু করলো। তাঁর গায়ে মার্কার দিয়ে লিখা ছিল, ফা* ইউ বিডি। তার কোবরা ডান্স এর শারীরিক ভঙ্গিতেও সেই আচরণের কোনো কমতি ছিলো না। নাচের  এক পর্যায়ে সে তার শরীর আমার সাথে প্রায় কয়েকবার লাগানোর চেষ্টা করছিল। অনেকটা গায়ে পড়ে ঝগড়া করার মত।

সমস্ত ব্লকের মানুষ এসব দেখে অদ্ভুত মজা নিচ্ছিলো। এরকম অসম্ভব বাজে ইনসিকিউর ফিল কখনোই করিনি। আমি বুঝতে পারলাম, সঠিক সময়ে আমি ভুল জায়গায় চলে এসেছি। ঠিক যেই মুহূর্তে শ্রীলঙ্কাতে এসে, এদেশটাকে অসম্ভব ভালো লাগা শুরু হচ্ছিলো, মুহূর্তের মধ্যেই সেটা ঘৃনায় রূপ নেয়া শুরু করলো।

যাই হোক, সাব্বির যখন ৬ হাঁকাচ্ছিলো, তার এই কোবরা ডান্স বন্ধ হয়ে গেলো। প্রথম দিকের পাওয়ার প্লেতে বাংলাদেশ বেশি রান করতে পারেনি। এমনিই একটু মন খারাপই ছিল, জয়ের কোনো লক্ষণ পাচ্ছিলাম না। রিয়াদ আর সাব্বির এর জুটি বাংলাদেশ কে ভালো একটা অবস্থানে এনে দেয়। মেহেদি মিরাজের দুর্দান্ত ফিনিশিং দেখে মনের ভেতর জয়ের আশা আবার হরে উঠে।

সাকিব, মুশফিক আর রিয়াদ যখন ব্যাটিং এ নামলো, পুরো স্টেডিয়াম যেন ইন্ডিয়ার একটা খন্ড হয়ে গেলো, যায় হোক, প্রথম ইনিংস তাও ধর্য্য ধরে পার করতে পেরেছিলাম। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে পরিবেশ আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলো।  রোহিত যখন পাওয়ার প্লেতে বেশ ভালো ব্যাটিং করছিলো, তখন শুধু মাত্র গ্যালারিই নয়, ধারাভাষ্যে যিনি ছিলেন, ভুবনেশ্বর, তাকেও কোবরা ডান্স দিতে দেখা গেছে।

কোবরা ডান্স গ্রুপটার আচরণ এটি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলো যে, একপর্যায়ে একজন আমার কাছ থেকে আমার ফ্ল্যাগটা, কেড়ে নিতে আসলো, আমি প্রথমে দিতে রাজি হয়নি। পরে দেখলাম ওর অনুরোধ না রাখতে খুব উত্তিজিত হয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিগত ভাবে আমি পাবলিক প্লেসে ঝামেলা করার মতো লোক নোই। অবশেষে ফ্ল্যাগ টানাটানির একপর্যায়ে আমি হাল ছেড়ে দিলাম। নিরাপত্তার অভাব ফিল করেই আমি ওখান থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলাম।

যাওয়ার সময় দেখতে পেলাম হাজারো লোক উৎসুক দৃষ্টিতে আমাদের দিকে আছে। চলে আসার সময় দেখলাম যে লোকটা আমার ফ্ল্যাগ কেড়ে নিয়েছে, ও ফ্ল্যাগ তা মাটিতে ফেলে দিয়েছে। আমি ফেরত গিয়ে ফ্ল্যাগ নিয়ে স্টেডিয়াম থেকে এরপর বের হয়ে গেলাম। অথচ বাংলাদেশ তখন খুবই ভালো বোলিং করছিলো। আমি বুঝলাম না, স্টেডিয়াম এ অনেক পুলিশ ছিল, কিন্তু তাঁরা এরকম আচরণ নিয়ন্ত্রনে একটুও সক্রিয় না কেন?

প্রচন্ড রাগ নিয়ে বের হয়ে গেলেও, মনের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করছিলো যে, আচরণে  ওরা  আমাদের চেয়েও আরো পিছিয়ে। পরাজয় মেনে নেয়া খুবই কঠিন, কিন্তু হেরে গিয়ে এভাবে আচরণগত ত্রূটি খুঁজে বেড়ানো ও যেকোনো টিমের জন্য দুর্বলতার লক্ষণ।

ক্রিকেট নিয়ে ওদের আবেগটাও অনেক শক্ত সেটা বুঝতে পেরেছি কিছু মজার অভিজ্ঞতা থেকে। এখন পর্যন্ত আমি যখনি  নতুন কোনো শ্রীলঙ্কানের সাথে পরিচিত হচ্ছি, সবাই প্রথমেই ওই ক্রিকেট ম্যাচের কথা জিজ্ঞেস করেছে। খুবই অবাক হয়েছি যখন সনাৎ জয়সুরিয়ার মতো প্লেয়াররাও হেরে আবেগ ধরে রাখতে না পেরে বিতর্কিত টুইট করেন।

আমাদের প্লেয়াররা, বিশেষ করে সাকিব, মুশফিক, রিয়াদ আর ওয়াটার বয়দের, খুব জোরে সোরেই পুরো স্টেডিয়াম থেকে টিসিং করা হচ্ছিলো। মাঠের বাইরে থেকে সাকিব এর ব্যাটসম্যানদের চলে আসতে বলা আর নুরুল হাসান থিসেরা পেরেরা কে আঙ্গুল তুলে কথা বলা এখানে খুব বোরো করে পাবলিসিটি পেলেও, তামিম যখন কুস্যাল মেন্ডিস কে সামলাচ্ছিলেন, সেটা এখানে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি।

ভারতীয় দলের কারো হয়তো মনে হয়নি যে ভারতে নয়, ম্যাচটা অনুষ্ঠিত হচ্ছে শ্রীলঙ্কার রাজধানীতে। সাকিব অসম্ভব ধৈর্য্য নিয়ে মুহর্মুহ পরিকল্পনা পাল্টেছেন। প্রতিপক্ষ কে অসাধারণ চাপেও ফেলে দিয়েছিলো। যদিও এ ম্যাচটা হারাতে আমি খুবই কষ্ট পেয়েছি, তাতে কি, সাকিব দেড় প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাওয়ার স্পৃহা দেখে ফিল করেছি, সাকিব তোমরা অনেকে কিছু এনে দিয়েছো আমাদের।

একসময় আমরা বিশ্বকাপ জিতবো। ইন্ডিয়ান, শ্রীলঙ্কানদের তুলনায় ক্রিকেটে আমাদের অর্জন তুলনামূলক ভাবে কম।  তাই ওদের সোশ্যাল মিডিয়া ও গণশাধ্যমে আমাদেরকে ব্যঙ্গ করার জবাব মাঠে জয়ের মাধ্যমেই দিতে হবে। আমরা যখন মাশরাফির কথা শুনি, দেখি তখন শুধু ক্রিকেটই ভালো লাগে না, ক্রিকেট নিয়ে তার চিন্তাধারা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং আমাদের অনুভূতি কে তিনি যেভাবে উপস্থাপন করেন, সমস্ত ব্যাপারটাকেই ভালো লাগে। সেলেব্রেশন নিয়ে তাঁর মাঝে যেমন উন্মাদনা আছে, সেই সাথে আছে অন্য টিমের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা।

https://www.mega888cuci.com