নওয়াজিশ আলী খান: আমাদের আনন্দদায়ক শৈশবের রূপকার

খুব বেশিদিন আগে কথা নয়, যখন বাংলাদেশের টেলিভিশনের পর্দার সামনে থেকে দর্শকরা নড়তে চাইতেন না। আঠার মত বসে থাকতেন তো থাকতেনই। খুব সফলতার সাথে যিনি এই কাজটা করেছেন তিনি হলেন নওয়াজিশ আলী খান।

শৈল্পিক ও প্রতিভাবান এই প্রযোজক ক্যারিয়ার শুরু করেন সেই পাকিস্তান টেলিভিশনের জমানায়, সেই ১৯৬৭ সালে। এই হিসেবে তিনি টেলিভিশনের সাথে যুক্ত আছেন ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে।। ‘জননী’, ‘গাছ মানুষ’, ‘কবি’র মত টেলিফিল্ম প্রযোজনা করেছেন তিনি। তার প্রযোজনায় নির্মিত ‘বহুব্রীহি’, ও ‘অয়োময়’-এর কথা তো না বললেই নয়। বলা হয়, তিনিই প্রয়াত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদকে লেখালিখির পাশাপাশি নাটক ও সিনেমা বানাতে উৎসাহিত করেন।

১৯৭২ সালে নওয়াজিশ আলী খান যোগ দেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে। সেখানে ২৮টি স্মরণীয় বছর কাটিয়ে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে অবসরে যান। এরপর একুশে টেলিভিশনে যোগ দেন হেড অব প্রোগ্রাম হিসেবে। এরপর ২০০২ সালে একুশে টিভি বন্ধ হয়ে গেলে এটিএন বাংলায় প্রোগ্রামের উপদেষ্টা হিসেবে আছেন গত ১৬ বছর হল।

তিনি বরাবরই টেলিভিশন আরেকটু ওপরের স্তরে নিয়ে যেতে চেষ্টা করতেন। আশি-নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে হলিউডের সিনেমা আসা শুরু করলো। এর উদ্যোক্তা ছিলেন এই নওয়াজিশ আলী। শুধু তাই নয়, নব্বইয়ের দশকে আমরা যে সিনবাদ, হারকিউলিস, এক্স ফাইলস, টিপু সুলতান, আকবর দ্য গ্রেট কিংবা আলিফ লায়লার মত সিরিজ বাংলা ডাবিংয়ে দেখে গোগ্রাসে গিলেছি তাঁর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল এই নওয়াজিশ আলীর। এজন্যই তো তিনি টেলিভিশনের প্রবাদ পুরুষ।

তিনি গুনগত মানের দিকে জোর দিতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন টেলিভিশনের অনুষ্ঠানমালা হলে প্রযুক্তি আর শিল্পের এক মেলবদন্ধ। পর্দায় একটা শিল্পমান সম্মত সফল অনুষ্ঠান সম্প্রচারের জন্য প্রযুক্তির সাথে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও উদ্দীপনা – সব কিছুরও প্রয়োজন।

বাংলাদেশে টেলিভিশন এসেছে আজ থেকে ৫৩-৫৪ বছর আগে। বলা হয় টেলিভিশন হল ইতিবাচক কৌশলে মানুষের শিক্ষা, জানা ও বিনোদনের মাধ্যম। নওয়াজিশ আলীও এটা মানতেন। তাই তো টেলিভিশনে তিনি ‘রত্নদ্বীপ’ নামের শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান নিয়ে আসেন। ড. আলাউদ্দিন আল আজাদের সাথে মিলে তিনি এখানে বাংলা সাহিত্যকে সহজ ও আকর্ষণীয় উপায়ে উপস্থাপন করেন।

‘কোথাও কেউ নেই’ ধারাবাহীকের শুটিংয়ে

 

পল্লীগীতির প্রসারে কাজ করেন তিনি। আব্দুল লতিফ, আব্দুল আলিম, নীনা হামিদরা জনপ্রিয়তা পান। ফেরদৌসী রহমানের সাথে মিলে তাঁর করা ‘এসো গান শিখি’ হল কিংবদন্তিতুল্য আরেকটি অনুষ্ঠান।

নওয়াজিশ আলী খানের আরেক বিখ্যাত কাজ হল ‘বর্ণালী’। এই গানের অনুষ্ঠানের জন্য তিনি ১৯৭৬ সালে সেরা প্রযোজকের পুরস্কার পান। ‘জলশা’য় তিনি জনপ্রিয় ব্যান্ডগুলোকে নিয়ে আসেন। ঈদের বিশেষ ‘আনন্দমেলা’ অনুষ্ঠানে উপস্থাপনার সুযোগ করে দেন আনিসুল হক, আবেদ খান, ড. সানজিদা আক্তার, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ও জুয়েল আইচদের।

তিনিই প্রথমবারের মত সাফ গেমস বিটিভিতে দেখার ব্যবস্থা করে দেন, যার মূর পরিকল্পনায় ছিলেন মুস্তফা মনোয়ার। হুমায়ূন আহমেদের সাথে মিলে তিনি এক সাথে বেশ কিছু কাজ করেছেন। এর মধ্যে আছে হুমায়ূনের প্রথম নাটক ‘প্রথম প্রহর’।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের উপস্থাপনায় করা ‘সপ্তপর্ণা’ কিংবা ফজলে লোহানীর ‘যদি কিছু মনে না করেন’ – সব কিছুর আইডিয়ায় এসেছে এই নওয়াজিশ আলী খানের কাছ থেকে। এর সুবাদে ১৯৭৫ সালে তিনি সেরা প্রযোজকের জাতীয় পুরস্কার পান।

দেশের বাইরেও তিনি সম্মানিত হয়েছেন। তার ‘জননী’ খোদ যুক্তরাজ্যের মেরিট সার্টিফিকেট পায়। কোরিয়ান ব্রডকাস্টিং নেটওয়ার্ক ‘বর্ণালী’ অনুষ্ঠানের ‘কাজের গান’ এপিসোডকে মেরিট সার্টিফিকেট দিয়ে সম্মানিত করে। এর বাইরে তিনি ছিলেন লেখক ও নির্মাতা। বিটিভিতে তার নির্মিত ‘সালামত দাতাং’ নাটকে তিনি অভিনয়ে নিয়ে আসেন প্রয়াত মেয়র আনিসুর হককে।

তিনি প্রেক্ষাপট পুরস্কার (১৯৮৮), বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সোসাইটি পুরস্কার (১৯৯৫), শের-ই-বাংলা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯২), ঢাকা ইয়থ ফাউন্ডেশন পুরস্কার (১৯৯৫), কালোধ্বনি স্বাধীনতা স্বর্ণপদক (১৯৯৫), নিপা স্বর্ণপদক (২০০০), ন্যাশনাল পার্সোনালিটি পুরস্কার (১৯৯৫), টেনাসিনাস পুরস্কার (১৯৯৬), টিডিএফ আজীবন সম্মাননা পুরস্কার (২০০৪), এ-ওয়ান টেলিমিডিয়া অ্যান্ড সিল্ক লাইন ইন্ডিপেন্ডেন্স পুরস্কার (২০০৫), একটেল নাট্যসভা পুরস্কার, বিপ্লবী দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ স্মৃতি পুরস্কার (২০০৫), মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত স্মৃতি পুরস্কার  (২০০৮) ও বিজয় বার্তা সম্মাননা পুরস্কার (২০১৭) পেয়েছেন। নওয়াজীশ আলী খানের কর্মময় জীবনের ওপর ‘টেলিভিশনে অর্ধশতাব্দী’ নামের একটি বইও লেখা হয়েছে।

নওয়াজিশ আলী খান সাদামাটা মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়েছে। একদিন মিডিয়া বিশেষজ্ঞ বনে যাবেন, কখনো ভাবেননি। ছোটবেলায় রেডিওতে শো আর গ্রাফাফোনে রেকর্ডিং শোনার মধ্যেই আটকে ছিল তাঁর শৈশব। ওই সময় নদীর ধারে বসে আব্বাসউদ্দিনের গান শুনতে ভালবাসতেন। বাবা মোহাম্মদ মাজেদ আলী খা আর মা জুবাইদা খানম। বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার লোহালিয়া গ্রামে জন্ম ও বেড়ে ওঠা।

উচ্চ শিক্ষার জন্য পাড়ি জমান করাচিতে। ১৯৬৬ সালের কথা। তখন করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তিনি।  ডন পত্রিকায় টেলিভিশন প্রযোজক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখলেন। বন্ধুদের জোরাজুরিতে আবেদন করে ফেললেন।

এরপর তিন দফা সাক্ষাৎকার হল। চাকরি নিশ্চিত হল। এরপর শুরু দুই দফা ট্রেনিং। লাহোরের তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষ করে গেলেন রাওয়ালপিন্ডি। সেখানে চাককলায় ইসলামাবাদ টেলিভিশন কেন্দ্রে অবস্থিত সেন্ট্রাল টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ শেষ করে তাঁর পোস্টিং হল করাচিতে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আফগানিস্তান ও ভারত হয়ে দেশে ফেরেন তিনি। দায়িত্ব নেন বিটিভির। বাকিটা তো ইতিহাস।

https://www.mega888cuci.com