নাসিরুদ্দিন বাদশাহ!

কাগজে কলমে তাঁর জন্মদিন ২০ জুলাই। কিন্তু, নাসিরুদ্দিন শাহ নিজেও জানেন না আদৌ এই তারিখে তিনি জন্মেছিলেন কি না। কারণ, স্কুলে ভর্তির জন্য উপযোগী একটা দিন হিসেবে স্রেফ এই তারিখটা দেওয়া হয়েছিল।

কিংবদন্তিতুল্য এই অভিনেতার শৈশবটা এমনই অদ্ভুত। আত্মজীবনী ‘অ্যান্ড দেন ওয়ান ডে’-তে তাঁর প্রথম জীবেনর ব্যাপারে অনেক কিছুই জানা যায়। তিনি আলিগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তখনই তাঁর প্রবেশ ঘটে থিয়েটারের দুনিয়ায়। যদিও, বাবা বলেছিলেন সব ছেড়ে পড়াশোনায় মন দিতে।

মাত্র ১৯ বছর বয়সে মেডিকেল পড়ুয়া এক পাকিস্তানি মেয়েকে বিয়ে করেন তিনি। পারভিন মুরাদ নামের (তিনি মানারা সিকরি নামেও পরিচিত) মেয়েটার বয়স তখন মাত্র ১৫ বছর। কোনো পরিবারই বিয়েতে রাজি ছিল না। কিন্তু এক সন্তানের জন্ম হয়ে যাওয়ায় আর কিছু করারও ছিল না। যদিও একটা সময় তাঁদের আলাদা হয়ে যেতে হয়। পারভিন সন্তান নিয়ে লন্ডন চলে যান। আর নাসিরুদ্দিন দিল্লী এসে যোগ দেন ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় (এনএসডি)।

এরপর নাসিরুদ্দিনের সাথে দেখা হয় রত্না পাঠকের। কিংবদন্তিতুল্য থিয়েটার পরিচালক সত্যদেব দুবের অধীনে তাঁরা একসাথে কাজ করতেন। নাসিরুদ্দিনের মতে, সেটা ছিল প্রথম দেখায় প্রেম। দু’বের সাথে আখের রস খেতে খেতে কি একটা নাটক নিয়ে আলাপ করছিলেন, তখনই তিনি প্রথম দেখেন রত্নাকে। তখন দু’জনে এক সাথে থাকতে শুরু করেন। অবশ্য সে সময় অবধি প্রথম স্ত্রী পারভিনকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ডিভোর্স দেননি নাসিরুদ্দিন।

একবার তাজ হোটেলের অভিজাত এক রেস্তোঁরায় রোম্যান্টিক ডেটে যাওয়ার ইচ্ছা হল দু’জনার। চলেও গেলেন। সেখানে মেন্যু কার্ডটা দু’রকম। পুরুষদের জন্য যেটা থাকে সেটায় দাম উল্লেখ থাকে, আর নারীদের টাতে থাকে না। সেবার ওয়েটার ভুল করে মেন্যু ওলট-পালট করে দিলেন।

ফলে, নাসিরুদ্দিনের হাতে যে মেন্যু সেখানে কোনো খাবারেরই দাম লেখা ছিল না। তিনি মন মত খাবার অর্ডার করতে থাকেন। ওপাশ থেকে রত্না ইশারা করলেও সেদিকে খেয়ালই করেননি নাসিরুদ্দিন। শেষে ওয়েটার অর্ডার নিয়ে যাওয়ার পর তাঁদের হুশ হয়। দু’জনের ব্যাগ ঘেটেঘুটে বের হয় মোটে ৪০০ রুপি। কিন্তু, তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে।

এই জুটির বিয়েটাও ছিল খুব সাদামাটা। কোনো জমকালো আয়োজনে তাঁরা যাননি। রত্নার মায়ের উপস্থিতিতে স্রেফ রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে বিয়ে সেরে ফেলেন তাঁরা। এখন বলিউডে তাঁরা অন্যতম সুখী দম্পতিদের একজন।

নাসিরুদ্দিনের স্বপ্ন ছিল তিনি মহাত্মা গান্ধীর চরিত্রে অভিনয় করবেন। এর জন্য তিনি রিচার্ড অ্যাটেনবরো’র গান্ধীতে অডিশনও দেন। ততদিনে অবশ্য বেন কিংসলিকে চুক্তিবদ্ধ করা হয়ে গেছে। অডিশনটা তাই ছিল স্রেফ একটা লোক দেখানো মার্কেটিং স্টান্ট। এটা করা হয়েছিল যাতে করে পরে কেউ বলতে না পারে যে, কোনো ভারতীয় অভিনেতাকে দিয়ে কেন চেষ্টা করে দেখানো হল না।

যদিও, নাসিরুদ্দিন শাহ পরে গান্ধীর চরিত্র পেয়েছেন। ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া সেই সিনেমাটি হল ‘হে রাম’।

নাসিরুদ্দিন শাহ ভারতের রাষ্ট্রীয় পদক পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণে ভূষিত হয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি তিনবার পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ‘স্পর্শ’ ও ‘পার’-এর জন্য তিনি সেরা অভিনেতা ও ‘ইকবাল’ সিনেমায় সেরা সহ অভিনেতার জন্য তিনি এই পুরস্কার পান।

ফিল্মফেয়ারে তিনি তিনবার সেরা অভিনেতার পুরস্কার জিতেছেন। ছবি তিনটি হল ‘আক্রোশ’, ‘চক্র’  ও ‘মাসুম’। এর বাদে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরিতে আরো ১৫ বার মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি।

পরিচালক হিসেবে নাসিরুদ্দিন শাহ’র অভিষেক হয় ‘ইউ হোতা তোহ ক্যায়া হোতা’ সিনেমা দিয়ে। স্ত্রী রত্নার সাথে সেই সিনেমায় কঙ্কনা সেন শর্মা, ইরফান খান, বোমান ইরানি ও পরেশ রাওয়ালের মত কিংবদন্তিতুল্য অভিনেতারা ছিলেন। ৯/১১  এর টুইন টাওয়ার হামলার সাথে জড়িত চারটি গল্পকে এক করে সিনেমাটা নির্মিত হয়। গুজব আছে, তখনই প্রযোজকদের সাথে নাসিরুদ্দিনের মতের অমিল দেখা যায়।

তাই, আর কখনোই নির্মানে হাত দিতে পারেননি। ক্যারিয়ারের অনেক দুয়ারের মত হয়তো ভবিষ্যতে এই দুয়ারটাও খুলে যাবে। কে জানে, হয়তো অভিনয়ের মত নির্মানেও মাস্টারপিস কিছু দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করবেন তিনি।

 

 

– কইমই অবলম্বনে

https://www.mega888cuci.com