চির সাথী পথ চলার

নায়িকা ‘ম্যাটেরিয়াল’ বলতে যা বুঝায়, ঠিক পূর্ণাঙ্গ নায়িকা – তিনি তাই। তিনি যেন এলেন, দেখলেন, জয় করলেন। হিন্দী ছবির রিমেকে তিনি ছাড়িয়ে গেলেন মূল ছবির নায়িকাকে (জুহি চাওলা), হয়ে উঠলেন এ দেশের জাতীয় ‘ক্রাশ’; বুকের ভেতর ‘দোলা’।

আমাদের গল্পের নায়িকার শুরু হয়েছিল ২৫ বছর আগে, ঠিক ঠিক ২৫ বছর।  সময়ের হিসেবে ২৫ বছর, মানে রজত জয়ন্তী। আজ তার চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের রজত জয়ন্তী। পাঠক, তাঁর নাম বোধহয় ধরে ফেলেছেন; হুমম, আমি বলছি কেয়ামত কন্যা মৌসুমীর কথা।

তার শুরুটা হয়েছিল বিনোদন ম্যাগাজিনে পাঠকের ভোটে ফটো সুন্দরী হয়ে। যে সময়টায় তার শুরু তখন এদেশে স্যাটেলাইট চ্যানেল কিংবা ইন্টারনেটের প্রচলন ছিল কল্পনার অতীত। তিনি ডাকসাইটে সব অভিনেত্রীর পাশে এসে নিজের মেধার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটালেন কাজের মাধ্যমে। আফসোস, এতগুলো বছর পরেও তার মতো মুখশ্রীর কোন অভিনেত্রীকে পেল না বাংলাদেশ।

জীবনানন্দ দাসের মতো করে বলতে হয় –

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,

মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য

বিশিষ্ট পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান রত্ন চিনতে ভুল করেননি। তিনি তার চলচ্চিত্রের জন্য যোগ্য নায়িকাকেই কাস্ট করেছিলেন, সঙ্গে ‘ইমন’ ওরফে সালমান শাহকে। তার নির্মাণ বাংলা চলচ্চিত্রে নাঈম-শাবনাজের পর উপহার দেয় নতুন দুটি মুখ, যারা কিনা মাতিয়ে রেখেছিলেন দর্শকদের, তাদের সৌন্দর্য, অভিনয় ও স্মার্টনেস দিয়ে। দুর্ভাগ্য আমাদের, মাত্র চার ছবির জুটি ছিল মৌসুমী – সালমান শাহ; নিয়তি তাদের মাত্র ‘চারে’ সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘স্নেহ’ ও ‘দেন-মোহর’ – এই হলো এ জুটির বাকি তিনটি ছবি।

চঞ্চল মাহমুদের ক্যামেরার লেন্স তুলে ধরেছিল মৌসুমীর সৌন্দর্য, প্রথমবার। তার বাবার সমর্থন, দুই বোনের সহযোগীতায় তিনি মিডিয়া আসতে পেরেছিলেন। পরবর্তীতে অনেকেই তাকে সমর্থন দিয়েছেন প্রয়োজনে, সাহস জুগিয়েছেন পথচলায়।

চলচ্চিত্র, টিভি মিডিয়া কিংবা প্রিন্ট মিডিয়া সর্বত্রই তার জয় জয়কার; একদম শুরু থেকেই, যারা সে সময়ের দর্শক তারা জানে মৌসুমী কেমন ছিলেন। নব্বইয়ের দশক হতে বর্তমান, তিনি এখনো ব্যস্ততায় সময় কাটান। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি নাটক, বিজ্ঞাপনে তিনি স্বমহিমায় উজ্জ্বল।

মৌসুমী এমন একজন অভিনেত্রী যার ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ছবিটিই ছিল তার নামে। তিনি সেখানে প্লেব্যাকও করেছিলেন। প্রথম ছবি দিয়ে যিনি বাজীমাত করেন তিনিই তো এমন সম্মান পাবেন, তাই ই হয়েছিল। তার নামেই ছবি চলতো, নায়ক ছিল গৌণ। মানুষ বলতো মৌসুমীর ছবি, নায়ক তো পরের কথা।

মৌসুমীর নায়ক হিসেবে অনেকেই এসেছেন। উল্লেখযোগ্য হলেন সালমান শাহ, মান্না, ওমর সানী, ফেরদৌস, শাকিল খান প্রমুখ। এছাড়াও তিনি শাকিব খান, রিয়াজ প্রমুখের বিপরীতে কাজ করেছেন। তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ী মৌসুমী ‘মেঘলা আকাশ’ ছবিতে কাজ করেন নারগিস আখতারের সঙ্গে, ছবিটি প্রশংসিত হয় ব্যাপকভাবে। তেমনি ‘মাতৃত্ব’ ছবিটিও অন্য এক মৌসুমীকে পরিচয় করিয়ে দেয় দর্শকের সামনে।

মৌসুমী পরিচালনাও করেছেন, তার প্রথম পরিচালিত ছবি ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’। ছবিতে তার কাস্টিং ছিল বেশ উঁচুদরের। নায়ক রাজ রাজ্জাক, ববিতা, ফেরদৌসকে নিয়ে তিনি ছবিটি নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীতে ‘মেহেরনিগার’ দিয়ে তিনি আবার পরিচালনায় নাম লেখান।

মৌসুমী নানান ধরনের চরিত্রে কাজ করেছেন। শহরের বড়লোকের আদুরে কন্যা, শ্রমজীবি নারী কিংবা গাঁয়ের বধূ; সব চরিত্রে মৌসুমী মানিয়ে যান অবলীলায়। গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে মৌসুমী – ফেরদৌস জুটির ‘খায়রুন সুন্দরী’ তো ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র।

দর্শক মৌসুমীকে অনেক নামে ডেকে থাকে, অধিকাংশের ড্রিম গার্ল হলেও মৌসুমীকে প্রিয়দর্শিনী নামে ডাকতেই পছন্দ করে তার ভক্তরা। সে নামে তার ফ্যান ক্লাবও রয়েছে ফেইসবুকে। কেউ কেউ তাকে মহারাণী বলে সম্বোধন করে, মৌসুমী কারো জন্য প্রিন্সেস কিংবা কারো জন্য শুধুই মৌসুমী। সকল সম্বোধনে লুকিয়ে রয়েছে গভীর মমতা, পরম ভালোবাসা।

ব্যক্তিজীবনে অনেকটা দ্রুত বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলেন এ অদ্বিতীয়া অভিনেত্রী। চলচ্চিত্রে অভিষেকের তিন বছরের মাথায় পর্দার নায়ককে জীবনের নায়কের স্থান দিয়েছিলেন তিনি। এত ভালোবাসার মানুষকে হঠিয়ে সবার প্রিয় মৌসুমীকে জয় করেছেন যিনি সেই ওমর সানীকে শ্রদ্ধা জানাতেই হয়, দেশের বাকি মানুষ মৌসুমীর মন জয় করতে না পারলেও তিনি পেরেছেন। মৌসুমী – ওমর সানী পরিবারে দুই সন্তান; ফারদিন ও ফাইজা। তাদের নিয়ে মৌসুমীর পরিবার, ছোট্ট সুখের সংসার।

শুরু করেছিলাম রজত জয়ন্তী দিয়ে, মৌসুমীর চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের রজত জয়ন্তী। পুরো পঁচিশ বছর সমান ভালোবাসা নিয়ে ক্যারিয়ার চালিয়ে যাওয়া সবার পক্ষে সম্ভব হয়না। মৌসুমী পেরেছেন। ঠিক শুরুর মতো তার প্রতি মানুষের ভালোবাসা, সম্মান আজো বিদ্যমান। পঁচিশ বছর পূর্বের গ্ল্যামার এখনো আছে, বয়স তাকে ছুঁতে পারেনি; সময় তাকে অভিজ্ঞ করেছে। এ অভিজ্ঞতা মৌসুমীকে করেছে সমৃদ্ধ, আমাদের দিয়েছে মৌসুমী বছর; সারা বছর জুড়েই তো মৌসুমীর উপস্থিতি – ক্যারিয়ারকে এতগুলো বছর সমানতালে চালিয়ে নেয়ার রেকর্ড আর ক’জনার আছে?

মৌসুমীকে দেখলে একটি গানের কথা মনে পড়ে, পঁচিশ বছরের পুরনো গান নতুনের মতোই ঝলমলে।

ও আমার বন্ধু গো

চির সাথী পথ চলার

তোমারই জন্য গড়েছি আমি

মঞ্জিল ভালোবাসার।

https://www.mega888cuci.com