আমি ক্লাসিকের মানুষ: মোস্তফা তানিম

দু’দশক ধরে লিখে যাচ্ছেন, তবে ঝোঁকটা সাইন্স ফিকশনের দিকেই বেশি। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত এগারোটি বইয়ের মধ্যে ছয়টিই সাইন্স ফিকশন। বলছি, লেখক মোস্তফা তানিমের কথা। বুয়েট থেকে পড়ালেখা শেষ করে পাড়ি জমিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। বর্তমানে একটি মার্কিন আইটি কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় আছেন।

এবারের বইমেলায় সময় প্রকাশনী থেকে তাঁর ‘ভুল স্বর্গ’ এবং ‘পরিযায়ী’ নামের দুটি সায়েন্স ফিকশন আসছে। বই দুটো নিয়েই কথা বলতে তিনি অলিগলি.কমের মুখোমুখি হয়েছেন।

এবারের বইমেলায়, আপনার নতুন দুটো সায়েন্স ফিকশন ‘ভুল স্বর্গ’ এবং ‘পরিযায়ী’ আসছে। উপন্যাস দুটো সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন।

– দু’টোই বেশ ভিন্ন স্বাদের সায়েন্স ফিকশন। গল্পের অনেক্ষণ পর্যন্ত সায়েন্স ফিকশান হিসাবে ধরতে পারা যাবে না। একে আমি বলি ‘সামাজিক সায়েন্স ফিকশন’। এই ঘরানার বেশ কিছু গল্প আমি লিখেছি এবং আরো লিখবো বলে আশা করি। যেখানে সমাজ এবং জীবন প্রধান। বিজ্ঞান অলক্ষ্যে এসে কল্পনা এবং চমকের সীমাবদ্ধ দেয়ালগুলি ভেঙে দিয়ে পাঠককে অভাবনীয় এক নতুন দিগন্তে নিয়ে যায়।

‘ভুল স্বর্গ’ উপন্যাসটিতে মানুষের ‘পক্ষপাত’ বা ‘বায়াস’ মেশিন দিয়ে পাল্টে দিয়ে অদ্ভুত সব কান্ড ঘটানো হয়। মূল চরিত্র স্বর্গ নামের ঢাকা শহরের এক শিক্ষিত গৃহবধূ। শ্বশুর বাড়িতে নানান সমস্যায় সে দিশেহারা। মাথা ব্যাথার কারণে এমআরআই করাতে গিয়ে তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। অদ্ভুদ সব ব্যাপার ঘটতে থাকে। তার জীবনে অচেনা নতুন চরিত্রদের আগমন হয়। কঠিন সব সিদ্ধান্ত তাকেই সম্পূর্ণ একা নিতে হয়।

এই উপন্যাসের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের মধ্যে যে বায়াস থাকে, তাকে বিভিন্নভাবে তুলে আনা এবং ব্যবচ্ছেদ করে দেখানো।

‘পরিযায়ী’ বইটিতে চারটি মজার গল্প থাকছে, তার মধ্যে দীর্ঘতম গল্পটির নাম পরিযায়ী।

এই গল্পে একঝাঁক হাঁস মঙ্গোলিয়া থেকে হাকালুকি হাওরে উড়ে আসে। এই সুদীর্ঘ যাত্রায় তারা নানান আশ্চর্য ঘটনা ঘটাতে থাকে। আমেরিকা সহ অনেক দেশ তাদেরকে স্যাটেলাইট দিয়ে অনুসরণ করতে থাকে। এমনকি তাদেরকে বুদ্ধিমান প্রাণী বলেই মনে হয়।

অন্যদিকে শাহীন নামে ভার্সিটির এক মেধাবী ছাত্র নিজের উদ্ভাবিত সস্তা প্রযুক্তিতে এই অতিথি পাখির ঝাঁকটির উপর একটা পরীক্ষা চালায়। পরিশেষে শাহীন যা দেখে, যা জানতে পারে, তা কল্পনাকেও হার মানাবে।

একটা কথা বলা দরকার, সামান্য হলেও যেন পাঠকের মনে প্রকৃতি এবং পাখি সম্পর্কে কৌতূহল ও ভালোবাসা জন্মায়, সেটাও ‘পরিযায়ী’ গল্পটি লেখার পিছনে আমার একধরণের অনুপ্রেরণা।

একই বইমেলায় দুটো বই, একজন লেখকের জন্য এটা কতটা চ্যালেঞ্জিং?

একই সঙ্গে একাধিক উপন্যাস লেখা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং বটে। সব কাজের পরে মানুষের কতটুকুই বা সময় থাকে। তবে এক বছর দীর্ঘ সময়। একের পর এক দুটো বড় গল্প বা উপন্যাস লেখার জন্যে যথেষ্ট।

লেখার গতি বলে একটা বিষয় আছে। সেটা লেখক থেকে লেখকে ভিন্ন। আবার একই লেখক কোনও গল্প চটচট করে লিখতে পারছেন, আবার কোনও গল্পে দিনের পর দিন এগুতে পারছেন না, তাও হয়। কোনও কারণে গতি স্থিমিত হয়ে পড়লে, সেটাতে বসে না থেকে অন্য গল্প শুরু করা যেতে পারে। আসলে চর্চা চালিয়ে গেলেই সব সহজ হতে থাকে।

তবে বছরে একটা, দু’টো, তিনটা উপন্যাস লিখে ফেলাটা কোনও কাজের কথা নয়। কাজের কথা হল ভাল কিছু লিখা। তাতে এক মাস সময় লাগুক, অথবা পাঁচ বছরই সময় লাগুক, কিছু যায় আসে না।

লেখার জনরা হিসেবে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীকেই বেছে নিলেন কেন?

আমি অন্য জনরাতেও লিখেছি, এবং আরো লিখবো বলে আশা রাখি। যেমন -আমার প্রকাশিত ভ্ৰমণ কাহিনী, রম্য রচনা কয়েকটি শিশু কিশোর উপন্যাস রয়েছে। তবে সায়েন্স ফিকশানের প্রতি আমার বিশেষ দুর্বলতা। এই জনরায় আমার মনোযোগও এখন বেশী।

তার প্রথম কারণ হলো, আমি নিজে সায়েন্স ফিকশনের একজন মুগ্ধ পাঠক। জুল ভার্ন থেকে শুরু করে আসিমভ, সত্যজিৎ রায় থেকে জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশন আমাকে খুব টানে।

তারপর আছে বিজ্ঞান ও লিখন শৈলীর সমন্বয়। সেদিক থেকে বলতে গেলে সায়েন্স ফিকশন লেখার জন্যে আমি খুব ভালো ক্যান্ডিডেট।

বিজ্ঞানের ভিত্তি, যেখানে সময় এবং স্থানের গঠনের তন্তু বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে ‘ভার্চুয়াল রিয়ালিটি’ এবং ‘অগমেন্টেড রিয়ালিটি’র যন্ত্র আবিষ্কার হয়, মানুষের জিনের সঙ্গে তার স্বভাব চরিত্রের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়, সেখানে আমার প্রভূত আকর্ষণ। সেই বিষয়গুলি আমি প্রায় ছোটবেলা থেকে পড়ে এসেছি, বুঝতে চেষ্টা করেছি। আমার কাছে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান নিজেই একটা ফিকশন, যা কল্পনাকে হার মানায়। তার সঙ্গে লেখকের কল্পনা যোগ করলে সেটা সত্যি অবিশ্বাস্য রকমের উপভোগ্য হতে পারে। যেমন ‘ইনসেপশন’ নামের সায়েন্স ফিকশানটি।

সায়েন্স ফিকশানে জগতের দেয়ালগুলোকে উন্মুক্ত করে দিয়ে অনেক নতুন মাত্রা আনা যায়। কল্পনা শক্তিকে চূড়ান্ত উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এসব বিষয়ে লেখকের স্বাধীনতা অনেক বেশী।

আরও একটা কারণে এই জনরাটিতে আমার মনোযোগ বেশি। সেটা হলো, মানুষ এবং সমাজের বিজ্ঞান সচেতন হওয়া একান্ত জরুরী। বিজ্ঞান মনষ্কতার অভাবেই কিছু মানুষ আজ গ্লোবাল ওয়ার্মিংকে বানোয়াট মনে করে। তাদের ভুল নীতির ফলে মনুষ্য জাতি এবং পুরো পৃথিবীটাই ধ্বংসের সম্মুখীন হয়ে যেতে পারে। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সেই মানুষদের অনেকেই হয়তো জীবনে একটিও সায়েন্স ফিকশন পড়েন নি। পড়লে এ হাল হতো না।

আপনার লেখার মাঝে কোন বিষয়গুলো বেশি প্রাধান্য পায় ?

বিষয় নির্বাচনে আমি সবসময়ে মৌলিক হতে চাই। বিষয়ের কোনো ধরাবাঁধা গন্ডিও আমার নেই। সমাজ, মানুষের চরিত্র, একে অন্যের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক, এগুলোকেও উপভোগ্য করে সায়েন্স ফিকশানে নিয়ে আসতে চাই।

সায়েন্স ফিকশান কয়েক প্রকারের হতে পারে। হার্ড সায়েন্স ফিকশন- যেখানে প্রতিষ্ঠিত সূত্রের বাইরে লেখক যাবেন না, যেমন আলোর চেয়ে দ্রুত গতিতে যাওয়া চলবে না। ধরুণ অদৃশ্য মানুষ গল্পটি, সেখানে সায়েন্সএ একটা ফাঁক আছে। মানুষকে দেখতে হলে চোখের রেটিনায় আলো বাঁধা পেতে হবে, তবেই দেখার সংবেদন সৃষ্টি হবে।

যদি আলো চোখের ওপাশে চলে যায় তবে মানুষটি কিছু দেখতে পাবে না। কাজেই অদৃশ্য মানুষ, যার রেটিনাও স্বচ্ছ, সে নিজে কিছুই দেখতে পাবে না। সত্যজিৎ রায়ের কথা বলেছিলাম, তিনিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হার্ড সায়েন্স ফিকশন লিখেননি। সফট সায়েন্স ফিকশনে সূত্র মানতে হয় না। নিমেষে এক গ্যালাক্সী থেকে আরেক গ্যালাক্সীতে চলে যাচ্ছে। ম্যাটার ট্রান্সফার হচ্ছে। এমনকি টাইম ট্রাভেলও সফট সায়েন্স ফিকশনের মধ্যেই পড়ে।

আমি হার্ড সায়েন্স ফিকশনের পক্ষপাতি। সায়েন্স ফিকশন যেন নিজেই অবৈজ্ঞানিক না হয়ে পড়ে। তথ্যে যেন ভুল না থাকে, সেটাই আমার লক্ষ্য। বিষয়টি সহজ নয়। তাই আমি ইচ্ছা হলেই লিখতে পারি না।

মানুষের প্রকৃতি প্ৰদত্ত সীমাবদ্ধতা ও তা অতিক্রমের উপায় বা সম্ভাবনা, প্রকৃতির নিয়মের বৈচিত্র এবং সৌন্দর্য, অজানা রহস্য ও তার বিস্ময়কর সমাধান, এ সবই আমার সায়েন্স ফিকশানের বিষয়বস্তু।

বই মেলার সবথেকে আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো লেখকের সঙ্গে পাঠকের আড্ডা। সুদূর এই আমেরিকায় বসে ব্যাপারটি কতখানি অনুভব করেন?

সেতো বটেই। দুঃখের বিষয় হলো, প্রবাস জীবনে প্রবেশ করার কারণে পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ অনেক কম। যখন দেশে ছিলাম, সে বহু বছর আগের কথা, তখন কথা হতো, অনেক ভালো লাগতো। ভালো ফিডব্যাক পেতাম। এখন তা হচ্ছে না। আমার মনে হয়, গত দুই দশকে এই লেখক/পাঠক যোগাযোগটা বেড়েছে এবং অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। যেটা থেকে বঞ্চিত থেকে গেলাম। তবে ভবিষ্যতে চেষ্টা থাকবে দূরত্ব কমিয়ে আনার, পাঠকের কাছে যাওয়ার।

শেষ কবে বই মেলায় গিয়েছিলেন?

শেষ বই মেলায় গিয়েছি ১৯৯৬ তে। হ্যা, দু’দশকেরও বেশি সময় আগে। তারপর দেশে বহুবার গিয়েছি, কিন্তু মেলার সময় যাওয়া হয়ে উঠেনি।

শুনেছি অনেক পরিবর্তন হয়েছে। টিভিতেও দেখতে পাই, কিন্তু নিজ চোখে দেখা হয়নি।

সমকালীন লেখকদের মাঝে কার লেখা সবচেয়ে পছন্দের?

আমি ক্লাসিকের মানুষ। সাম্প্রতিক কালের লেখা যে খুব পড়েছি তাও নয়। মাত্র সেদিন শহীদুল জহিরের ডলু নদীর হওয়া ও অন্যান্য গল্প বইটি পড়লাম, অসম্ভব ভালো লেগেছে। তাঁর নামও সেদিনই প্রথম শুনেছি। এই গল্পগুলি আমাকে রীতিমত বিচলিত করেছে। ভাষা, উপস্থাপনা, আঙ্গিক, বিষয়বস্তু, সবকিছুই অনন্য সাধারণ।

বাংলায় সায়েন্স ফিকশন লেখকের কথা বলতে হলে মুহম্মদ জাফর ইকবালের নামই বলতে হবে। আমার প্রিয় লেখক। শুনেছি অনেক নতুন সায়েন্স ফিকশন লেখক আছেন। তবে পড়া হয়নি, তাই জানা নেই।

লেখালেখি নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ ভাবনা…

– লেখালেখিতে আরো মনোনিবেশ করার ইচ্ছা রাখি। একদিন একটা অনেক ভালো কিছু লিখে ফেলতে পারবো বলেই আমার বিশ্বাস। আর এই বিশ্বাসটাই আমার লেখালেখির ভবিষ্যৎ ভাবনা।

https://www.mega888cuci.com