ভারতের সবচেয়ে নোংরা বস্তির সবচেয়ে প্রতিভাবান ছেলেটি

কিংবদন্তিতের ট্র্যাজিক পরিণতি আমরা আগেও দেখেছি। কিন্তু, কাদের খানের পরিণতিটা একটু বেশিই করুণ। ৩০০ টিরও বেশি সিনেমায়  কাজ করা ৮১ বছরের এই প্রৌঢ়ের স্মৃতিশক্তি যখন অনেকটাই হ্রাস পেয়েছিল, তখন তিনি বিদায় নিয়েছেন পৃথিবী থেকে। শেষ বয়সে তাঁর স্মৃতিশক্তি অনেকটাই হ্রাস পেয়েছিল। ২০১৯ সালের শেষ দিন যখন শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন তিনি নিজের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের কিছু প্রায় মনে করতে পারতেন না বললেই চলে।

কথাও বলতে পারেন না আগের মত। একজন শিল্পীর জন্য এর চেয়ে বেদনাদায়ক আর কি বা হতে পারে। খান একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা করেছিলেন যেখানে ধর্ম ও শিল্প নিয়ে পড়ানো হবে। কিন্তু, সেটা স্রেফ স্বপ্ন হয়েই থেকে গেল।

  • দু:সহ প্রথম জীবন: কাবুল থেকে মুম্বাই

অনেকের মত কাদের খানের জীবনের শুরুটাও স্বপ্নের মত ছিল না। তার জন্ম হয় আফগানিস্তানের কাবুলে। খানরা তিন ভাই। আট বছর হওয়ার আগেই বাকি দুই ভাইয়ের মৃত্যু হয়। শোকে পাথর বাবা -মা কাবুল ছেড়ে কাদের খানকে নিয়ে চলে আসেন ভারতে। তাঁদের ঠাঁই হয় মুম্বাইয়ের কামাতিপুরা বস্তিতে। সম্ভবত এটাই ভারতের সবচেয়ে নোংরা বস্তি।

বস্তির জীবনটা সহজ ছিল না মোটেও। স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল স্কুলে ভর্তি হন খান। ছোট বয়স থেকেই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, কিভাবে দারিদ্রতা তাঁর বাবা-মাকে গ্রাস করে ফেলেছে। আর পেরে না উঠে বাবা-মা আলাদা হয়ে যান। খান থাকতেন মায়ের সাথে। বস্তিতে থেকে একজন নারীর জন্য সংসার চালানোটা কতটা কষ্টকর সেটা সম্ভবত বলে না দিলেও চলে।

কাদের খানের বর্তমান অবস্থা

তাই, মা আবার বিয়ে করেন। দুই বছর বয়স থেকেই তাই খানের বাবা দু’জন। তার বায়োলজিক্যাল বাবা তখন স্থানীয় একটা মসজিদে পড়াতেন। খানও সেখানে গিয়ে পড়তেন।

তবে, এত কিছুর পরও দারিদ্র কমলো না। খান এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন যে স্কুল শেষ করে তিনি স্থানীয় কারখানায় শ্রমিকের কাজ শুরু করবেন, বস্তির বাকি শিশুরা যা করে। যখন কাজ খুঁজতে বাড়ি থেকে বের হচ্ছিলেন তখন বাবা তাঁকে আটকান। বলেন, ‘আমি জানি তুমি কোথায় যাচ্ছো। দিন মজুরের কাজ করবে। দিনে তিন রুপি আয় করে, এই অংকটা আজীবন একই থাকবে। কিন্তু, মনে রেখে দারিদ্রতা কাটাতে হলে প্রথমে তোমাকে শিক্ষিত হতে হবে, বিশ্বাস রাখতে হবে তোমার হাতের ওই কলমের ওপর।’

ওতটুকু বয়সেই কথাগুলো মনে গেঁথে গিয়েছিল কাদের খানের। সেই দিন থেকে তিনি নিজের সময় আর সামর্থ্য ব্যয় করেন পড়াশোনায়। নিজের বাবার কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষাটা জীবনে কাজে লাগিয়েছেন। ছড়িয়ে দিয়েছেন নিজের সন্তানদের মধ্যেও। ছেলে সরফরাজ খান সালমান খানের সাথে ‘তেরে নাম’ ও ‘ওয়ান্টেড’-এর মত সিনেমায় কাজ করেছেন। একই সাথে তিনি সফল একজন প্রযোজকও।

  • জীবনের মোড় বদল: মঞ্চ থেকে বড় পর্দা

স্কুল শেষে  কারখানায় নয়, তিনি যোগ দিয়েছিলেন ইউসুফ ইসমাইল কলেজে। এটা ৭০-দশকের শুরুর কথা। সেখান থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা করেন। এরপর এম এ সাবু সিদ্দিক কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। তখন মঞ্চেও কাজ করতেন। তাঁর করা ‘লোকাল ট্রেন’ নাটকটি জাতীয় পর্যায়ের পুরস্কার জয়ের পাশাপাশি তাকে ১৫০০ রুপির পুরস্কারও এনে দেয়। এটাই ছিল কাদের খানের জীবনের মোড় বদলে দেওয়া ঘটনা।

অভিনেতা দিলিপ কুমারও এই নাটকের কথা জানতে পেরে সেটা দেখতে চান।  আর দেখে তিনি এতটাই মুগ্ধ হয়ে যান যে খানকে ‘সাগিনা মাহাতো’ ও ‘বৈরাগ’ এই দু’টি সিনেমার জন্য চুক্তিবদ্ধ করে ফেলেন। একই সময়ে প্রয়াত পরিচালক নরেন্দ্র বেদি, প্রযোজক রমেশ ব্যাল, অভিনেত্রী কামিনি কৌশলের নজরে আসেন তিনি।

নরেন্দ্র বেদির তখন ‘জাওয়ানি দিওয়ানি’ সিনেমার কাজ শুরুর পরিকল্পনা করছিলেন। সেখানেই স্ক্রিপ্ট লেখক হিসেবে যাত্রা শুরু হয় খানের। এটাই ছিল খ্যাতির সিঁড়িতে তাঁর প্রথম পদক্ষেপ। ইন্ডাস্ট্রি জানতে পারে তরুণ ও নতুন একজন লেখকের আবির্ভাব ঘটেছে।

  • ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ: ১৫০০ রুপি থেকে এক নম্বর স্ক্রিপ্ট রাইটার

নিজের লেখা প্রথম সিনেমা ‘জাওয়ানি দিওয়ানি’র জন্য ১৫০০ রুপি পারিশ্রমিক নিয়েছিলেন খান। পরের যে সিনেমায় প্রস্তাব পান তার সাইনিং মানিই ছিল ১০ হাজার রুপি। মনমোহন দেসাইয়ের সাথে দেখা হয়। তখন এই খ্যাতিমান পরিচালক নতুন একটা সিনেমায় হাত দিয়েছিলেন। লেখকদের কাজ নিয়েও বেশ নাখোশ ছিলেন।

তখনই প্রযোজক হাবিব নাদিয়াদওয়ালা খানকে লেখক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন মনমোহনের সাথে। তবে, তাতেই কি আর চিড়ে ভাজে? দেসাই মশাই এত সহজে পটে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি খোঁচা মেরে বলেছিলেন, ‘নতুন লোক দিয়ে তো অনেক দেখলাম। একে কোথা থেকে ধরে নিয়ে আসলে। আচ্ছা লিখতে চাইলে লিখুক। কিন্তু, আমার পছন্দ না হলে কিন্তু স্ক্রিপ্ট ছিড়ে ফেলবো!’

দুই ছেলের সাথে কাদের খান

খান সাহেবও কম না। দেসাই তখন বিখ্যাত। তারপরও তিনি ছেড়ে কথা বলেননি, ‘আচ্ছা স্ক্রিপ্ট না হয় ছিড়লেন। কিন্তু যদি পছন্দ হয়ে যায় তাহলে কি করবেন?’ দেসাই হাসি নিয়ে সাফ জবাব দিলেন, ‘তোমাকে মাথায় নিয়ে নাচবো!’ সেখান থেকে খান ও দেসাইয়ের এক সাথে পথ চলা শুরু।

১৭৪ সালে ‘রোটি’ সিনেমার জন্য মনমোহন দেসাই তাঁকে এক লাখ ২১ হাজার রুপি পারিশ্রমিক দেন। ওই আমলে এটা ছিল আকাশচুম্বি অর্থ। প্রায় একই সময়ে তিনি প্রকাশ মেহরার সাথেও কাজ করা শুরু করেন।

  • নতুন ধারার প্রবর্তনকারী: ‘সবাই আমার দলে’

ওই আমলে বলিউডে এই সময়ের চেয়ে বেশি গ্রুপিং ছিল। প্রকাশ মেহরা আর মনমোহন দেসাই ছিলেন প্রবল প্রতিপক্ষ। ওই সময়ে এই দু’জনের সাথেই কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল কেবল অমিতাভ বচ্চন আর কাদের খানের। একবার কোনো এক বন্ধু খানকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুমি কোন দলের লোক?’ জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কোনো দলের না, ওরা সবাই আমার দলের লোক। দেসাই আর মেহরা – দু’জনের সাথেই হিট সিনেমা উপহার দিয়েছেন খান।

এর মধ্যে আছে ‘শারাবি’, ‘কুলি’, ‘মুকাদ্দার কা সিকান্দার’, ‘লাওয়ারিশ’। এর বাইরে তিনি ‘হিম্মতওয়ালা’, ‘ইনকিলাব’, ‘সাত্যে পে সাত্যা’ ‘ম্যায় খিলাড়ি তু আনাড়ি’র মত সুপারহিট সিনেমার গল্পকার।

অভিনয় ক্যারিয়ারে তিনি ‘মুকাদ্দার কা সিকান্দার’, ‘কুরবানি’, ‘বৈরাগ’, ‘খুন পাসিনা’, ‘আঙ্গার’, ‘হিরো নম্বর ১’ সহ ৩০০-এর বেশি সিনেমায় কাজ করেন। তিনি খুব অল্প কয়েকজন ভারতীয় অভিনেতার একজন যারা কয়েকটি ভিন্ন প্রজন্মের অভিনেতাদের সাথে কাজ করেছেন। সেই ফিরোজ খান, অমিতাভ বচ্চন, জিতেন্দ্র, শক্তি কাপুর থেকে গোবিন্দ, সালমান খান, সাইফ আলী খান, জনি লিভার – সবাই ছিলেন কাদের খানের সহ অভিনেতা।

সিনেমায় লেখালিখি ও অভিনয়ের জন্য খান জিতেছেন ১৩ টি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। ২০১৩ সালে তাকে সাহিত্য শিরোমনি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ভারতীয় মুসলিমদের ক্ষমতায়নে তাঁর অবদানের শেষ নেই। তাই তাকে আমেরিকান ফেডারেশন অব মুসলিম ফ্রম ইন্ডিয়াও সম্মানিত করেছে। তাঁর বড় ছেলে সরফরাজ খান ‘কাল কে কালাকার ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার কোম্পানি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান খুলেছিলেন। সেখানে খান নিজেও জড়িত ছিলেন।

  • ক্যারিয়ারের পালাবদল: ভিলেন থেকে কমেডিয়ান

মজার ব্যাপার হল অভিনয় জীবনের শুরুতে তিনি ছিলেন ভিলেন। কালক্রমে তিনি ইতিবাচক ও কমিক চরিত্রে কাজ করা শুরু করেন। দক্ষিণে তাঁর করা ‘হিম্মতওয়ালা’ তাকে একদম শীর্ষস্থান এনে দেয়। এখানে প্রথমবারের মত ভারতের ইতিহাসে সিনেমার পোস্টারের পুরোটা হাজির হন কোনো কমিক অভিনেতা। মূল অভিনেতারা পড়ে যান পেছনে।

ভিলেন থেকে কাদের খানের কমেডিয়ান বনে যাওয়ার গল্পটা বেশ মজার। একবার তাঁর বাচ্চারা স্কুল থেকে বেদম মার খেয়ে আসলো। কাদের খান দেখে অবাক। জানতে চাইলেন, কিভাবে এই হাল হল। কাঁদো কাদো গলায় বাচ্চারা বললো, ক্লাসমেটরা বলেছে, ‘তোমার বাবা তো পর্দায় এত বাহাদুরী দেখায়। সব সময় মারামারি করে। আর তোমরা! দেখো তোমাদের এবার কি হাল করি!’

এই ঘটনাটা বাবার মনে প্রভাব ফেলে। তিনি চাননি, তাঁর কাজের প্রভাবটা সন্তানদের ব্যক্তিগত জীবনের ওপর পরুক। তাই তিনি নিজের খোলস পাল্টে ফেলেন। আর এখন কে না জানে যে তিনি হলেন বলিউডের ইতিহাসের অন্যতম সেরা আইকনিক কমিক পারফরমারদের একজন। যা হয়, ভালর জন্যই তো হয়!

– বলিউড বাবল অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।