দুবাই ফেরত শ্রমিকের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার হওয়ার গল্প

দুবাইয়ের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন সালাউদ্দীন শাকিল। কাজটা ছিল কঠিন ও বেদনাদায়ক। প্রতিদিন ভোর চারটায় অন্য শ্রমিকদের সাথে তাকে কাজে বেরিয়ে যেতে হত। খাবার নিতে হতো পলিথিনের ব্যাগে করে, কারণ প্লেটে করে মরুভূমিতে খাওয়া কঠিন হতো; কখনো কখনো ৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় নিয়ে যাওয়া খাবার নষ্ট হয়ে যেত, তখন উপোষ থাকতে হতো।

গল্পটি এক দশকেরও অল্পসময় আগের কথা। খুব দ্রুতই তার জীবনে পরিবর্তন এসেছে। গত সপ্তায় তার ডেব্যু হয়েছে বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে।

রাজশাহীর শহীদ কামরুজ্জামান স্টেডিয়ামের ট্রেনিং সেশন শেষে সেন্ট্রাল জোনের সতীর্থদের সঙ্গে সেদিন অতীতের দিনগুলোর কথা বলছিলেন শাকিল। আগের ম্যাচেই দুটো উইকেট পেয়েছেন এ বাঁহাতি পেসার, যার একটি ছিল জাতীয় দলের ওপেনার ইমরুল কায়েসের উইকেট। শাকিলের স্বপ্নের মতো একটি দিন ছিল যখন তার অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ নতুন বল তার হাতে তুলে দিয়ে আবু হায়দার রনির সঙ্গে বোলিং শুরু করতে পাঠালেন।

শাকিল বলেন, ‘এটি আমার জন্য একটা বিশেষ জীবন, রিয়াদ ভাইকে টিভিতে দেখেছিলাম। এখন তিনি আমার সাথে সুন্দরভাবে কথা বলছেন, আমার ক্যাপ্টেন তিনি। আমার জন্য এটা অবিশ্বাস্য একটা ব্যাপার।’

২৮টি বসন্ত পার করা শাকিলে ইতোমধ্যেই নজর পড়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিদের। এ বছরের শুরুতে ফতুল্লা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে নেট বোলার শাকিলকে দেখে আগ্রহী হন কোচ মিজানুর রহমান। তিনি প্রাইম দোলেশ্বরের হয়ে পাঁচটি লিস্ট-এ ম্যাচ খেলার সুযোগ করে দেন শাকিলকে। তারপরই সেন্ট্রাল জোনের জন্য তাকে রেকমেন্ড করেন এ কোচ। শাকিল কয়েক বছর নিচের সারির লিগে খেললেও প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে আগমনটাই তার জন্য বড়সড় ব্রেক।

অভিবাসী শ্রমিকদের জীবনের রূঢ় বাস্তবতার সঙ্গে প্রফেশনাল ক্রিকেটারদের উত্থান-পতনের আকাশ পাতাল তফাৎ। মধ্যপ্রাচ্যে যারা ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে যেতে পারে তারা সমস্যায় না পড়লেও বাকিদের প্রতারিত হতে হয় পদে পদে। শাকিল এক্ষেত্রে সৌভাগ্যবান। তার ওয়ার্ক পারমিট ছিল, কোম্পানিও সঠিক ছিল। তবে তার কাজটি বেশ কঠিন ছিল। প্রায় চার বছর দুবাই শহরের বাইরে মরূভূমিতে তাকে কাজ করতে যেতে হত।

শাকিল বলেন, ‘আমি ওয়েল্ডিং করতে পারতাম কিন্তু আমাকে স্টিল স্ট্রাকচার বানানোর কাজ করতে হত মরূভূমির মাঝে। এটা অনেক কঠিন কাজ ছিল, আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতাম যেন আমাকে এখান থেকে মুক্ত করেন। কাজটা আসলেই খুব কষ্টকর ছিল। আমার সকল বন্ধুরা মেট্রিক (২০০৬) পরীক্ষা দিতে বসলো আর আমি কাজ করতে চলে গেলাম দেশের বাইরে। এটা মেনে নেয়া ছাড়া কোন উপায় আমার ছিল না, আমাদের পারিবারিক অবস্থা তেমন ভাল ছিল না।’

মুন্সিগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শৈশবে টেপ-টেনিস বল দিয়ে ক্রিকেট খেলে বেড়াত শাকিল। মধ্যপ্রাচ্যে জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমিয়ে শৈশবের লালিত স্বপ্ন ক্রিকেটার হওয়াকে প্রায় ভুলেই যায় সে।

চার বছর মধ্যপ্রাচ্যে (সংযুক্ত আরব আমিরাত) কাজ করার পর শাকিলের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে পড়ে। কোম্পানি তাকে ছুটি দিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, শাকিল যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো তখন। এতদিন ব্যাট-বলের বাইরে থাকা শাকিল দেশে এসেই আবার ক্রিকেটে মেতে উঠলো। বছর দুয়েক পর ২০১২ সালের দিকে এক বন্ধুর মাধ্যমে কোচ গোলাম রসুলের সঙ্গে আলাপ হয় তার। কোচ নারায়নগঞ্জে কোচিং করাতেন। তিনি শাকিলকে খেলার জন্য তৃতীয় বিভাগে সুযোগ করে দেন। পরবর্তীতে তিনি পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয় ও প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে খেলার সুযোগ পেয়ে যান।

‘আমার মনে পড়ে সবাই আমাকে দেখে হাসাহাসি করছিল যখন ২০১৪ সালে আমি ক্লাব ট্রায়াল দিতে গেলাম তখন,’ বলেন শাকিল। ‘আমার কিছুই ছিলনা। বন্ধু মেহরাব হোসেন জোসি আমাকে বোলিং বুট, ব্যাট দিয়েছিল। ও তাদের অনুরোধ করেছিল যেন আমাকে যাচাই করার জন্য একটি নেট সেশনে সুযোগ দেয়। তারা দিয়েছিল, সৌভাগ্যবশত আমি ভালো করেছিলাম।’ যোগ করেন তিনি।

কোচ মিজানুর রহমান, যিনি অনুর্ধ্ব-১৯ দলের দায়িত্বে ছিলেন ২০১৬ বিশ্বকাপের সময় তিনি শাকিলের শারিরীক গড়ন ও পেস দেখে বেশ মুগ্ধ। তিনি জানান,‘শাকিল নারায়নগঞ্জের ফতুল্লায় প্রাইম দোলেশ্বরের নেট বোলার হিসাবে এসেছিল। তার শারীরিক গড়ন ও পেস দারুণ, এখনো সে অ্যাকুরেট নয়; তবে আমার বিশ্বাস শাকিলই বাংলাদেশের ভবিষ্যত। আমি তার অতীত জানি, সে পরিশ্রম করতে পারে। সে যখন প্রাইম দোলেশ্বরে এসেছিল তখন বেশ নার্ভাস ছিল। এমনটি হওয়া স্বাভাবিক, কারণ এ জগতে সে নতুন। আমাদের কোচদের কাজই এটা, বিভিন্ন প্রতিভা খুঁজে বের করা। আমি বিশ্বাস করি যদি তাকে সঠিক উপায়ে পরিচর্যা করা হয় তাহলে সে ভাল করতে পারবে।’

সেন্ট্রাল জোনের ম্যানেজার মিল্টন আহমেদ জানান কোচ মিজানুর রহমান তাকে অনুরোধ করেছিলেন শাকিলকে যাচাই করার জন্য যখন বিসিএল শুরু হলো ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগের পর।

মিল্টন বলেন, ‘আমরা তাকে রাজশাহী নিয়ে এসেছিলাম নেট বোলার হিসাবে, এখানকার পিচে ঘাস আছে তাই ভেবেছিলাম নেটে তার পেস কাজে লাগবে। কিন্তু দেখা গেল তার পেস ও ইনসুইং ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের ভোগাচ্ছে। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম তাকে সুযোগ দিয়ে দেখাই যায়।

গত সপ্তাহে শাকিলকে ঘাসের পিচে বোলিং করতে দেখে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমনও বেশ উচ্ছ্বসিত। মরুর বুকে তপ্ত রোদে প্রতিদিন ১৪-১৬ ঘন্টা কাজ করা শাকিলের জন্য এটা বিশেষ কিছু।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থার ২০১৫ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা যায় বাংলাদেশ প্রায় ৮ দশমিক ৮ মিলিয়ন শ্রমিককে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠিয়েছে ১৯৭৬ থেকে এপ্রিল ২০১৪ সালের মধ্যে। এদের একটি অংশ দেশে ফেরত আসে প্রতিবছর। যারা শারিরীক ও মানসিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়ে।

শাকিল সেক্ষেত্রে নিজেকে ভাগ্যবান বলতেই পারেন, তিনি শ্রমিক থেকে বাংলাদেশের প্রফেশনাল ক্রিকেটার হতে পেরেছেন। তিনি সবার চেয়ে ব্যতিক্রম, কারণ তিনিই দেশের প্রথম পেশাদার ক্রিকেটার যার এমন নির্মম অতীত রয়েছে। শাকিল আমাদের অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারেন, জীবনের কঠোরতা থেকে মুক্তি শুধু নয় ক্রিকেট জীবনকে করতে পারে সমৃদ্ধ, দেখিয়ে দিতে পারে জীবনের নতুন মানে।

– ইএসপিএন ক্রিকইনফো অবলম্বনে

https://www.mega888cuci.com