তাঁরা ‘অপরাজেয়’ মেকানিক্স

নভেম্বর, ২০০৫! মেট্রিক্যাল ও অ্যানেক্স নামের দুটি ব্যান্ড থেকে বের হয়ে আসলেন চারজন স্বপ্নবাজ তরুণ। প্রাথমিক লক্ষ্য একটা প্রকল্প দাঁড় করানো। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য প্রত্যেকের বাজানোর দক্ষতাকে আরও শাণিত করা। তবে আশ্চর্যজনকভাবে প্রথম সাক্ষাতেই তাঁদের বাজানোর রসায়নটা এত জমে যায় যে, তাঁরা সবাই একত্র হয়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে ত্রিদিব, তামজিদ, রিয়াজ ও রুশো নামের সেই চার তরুণ গঠন করে ফেলেন একটি ব্যান্ডদল যার নাম দেন তাঁরা মেকানিক্স।

শুরুতেই একজন লিড গিটারিস্টের ঘাটতিতে পড়ে ব্যান্ডটা৷ তবে প্রিজনার্স ব্যান্ডের লিড গিটারিস্ট সৈয়দ ইমরান আহমেদ যোগ দিলে কোনো প্রকার বিলম্ব ছাড়াই পুরোপুরি দাঁড়িয়ে যায় মেকানিক্স৷ তখন বিভিন্ন জনপ্রিয় ইংরেজি গান কাভার করে আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড সংগীতের আঙিনায় বেশ প্রশংসা কুড়ান তাঁরা।

কিন্তু দেশব্যাপী মানুষের কাছে পৌঁছাতে তো একটা সুযোগ দরকার। ব্যান্ড গঠনের দুবছরের মাথায় আসে সে সুযোগ। ২০০৭ সালে ‘ডি রকস্টার’ নামের একটি রিয়্যালিটি শো দেশের উঠতি ব্যান্ডদের নিজেদের সামর্থ্য সকলের সামনে তুলে ধরার মঞ্চ প্রস্তুত করে দেয়। সে মঞ্চে পারফর্ম করে মেকানিক্স৷ শুধু পারফর্ম করে বললে কথাটা ক্লিশে শোনায়। বলা উচিত, রীতিমতো ‘ডি রকস্টার’ এর মঞ্চ কাঁপিয়ে দেয় ঢাকার এই উদীয়মান ব্যান্ডদল।

সেখানে অসামান্য দক্ষতায় জুডাস প্রিস্টের ‘পেইন কিলার’ কাভার করে শ্রোতাদের পাশাপাশি বিচারকদেরও তাক লাগিয়ে দেয় মেকানিক্স৷ পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে বিচারক শাফিন আহমেদ আসন ছেড়ে সরাসরি মঞ্চে ওঠে পড়েন তাঁদের বাহবা জানাতে। আরেক বিচারক এরশাদ জামান তো দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেই ফেলেন যে, আর্টসেলের একজন সদস্য হিসেবে মেকানিক্সকে তিনি আর্টসেলের জন্য ‘হুমকি’ হিসেবে দেখছেন।

আর্টসেলের সাথে মেকানিক্সের সম্পর্কটা অবশ্য অন্যরকম। পেশাদার সম্পর্কের বাইরেও এই দুটি ব্যান্ডের মাঝে রয়েছে প্রবল ভাব-বোঝাপড়া। আর্টসেল সবসময় মেকানিক্সের সদস্যদের অত্যন্ত স্নেহের ছোট ভাই হিসেবে মূল্যায়ন করে আসছে৷ অন্যদিকে বরাবরই আর্টসেলের প্রতি মেকানিক্সের গভীর ভালোবাসা ও শুদ্ধাবোধের দৃষ্টান্ত দেখা যায়৷

এ প্রসঙ্গে ছোট্ট একটা ঘটনা ভাগাভাগি না করলেই নয়। তখন ব্যান্ড ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন আর্টসেলের ড্রামার কাজী সাজ্জাদুল আশেকিন সাজু। ফলে ড্রামারের অভাবে ব্যান্ডটা অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়ে। ঠিক সে সময় প্রিয় ব্যান্ডের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসেন মেকানিক্সের ভোকাল আফতাবুজ্জামান ত্রিদিব। তাঁদের ড্রামার শেখ রিয়াজকে নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি আর্টসেলকে। সেই শেখ রিয়াজ গত সাত বছর ধরে অতিথি যন্ত্রী হিসেবে আর্টসেলের সাথে মঞ্চে বাজিয়ে যাচ্ছেন।

মেকানিক্স সম্পর্কে এবার নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করা যাক৷ ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের সাউন্ডের ভীষণ ভক্ত আমি৷ তাঁদের কম্পোজিশন, সাউন্ড ও প্লেয়িং আমাকে সর্বদা আকৃষ্ট করে, বিমোহিত করে। সেই শুরু থেকে আজ অবধি নিজেদের গানে একটা নিজস্বতা বজায় রেখে আসছে মেকানিক্স। যদিও তাঁদের গানগুলো শুনে একটুও বুঝার উপায় নেই যে, এখন পর্যন্ত কতটা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গিয়েছে ব্যান্ডটি।

গেল পনেরো বছরে বেশ কয়েকবার ভাঙা-গড়ার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে মেকানিক্সকে। ব্যান্ড গড়ার তিন বছরের মাথায় আসে প্রথম ধাক্কা। ২০০৮ সালে ব্যক্তিগত কারণে বাধ্য হয়ে ব্যান্ড ত্যাগ করেন লিড গিটারিস্ট ইমরান। এক মাসের মধ্যে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন জেহিন আহমেদ। ২০১০ এর আগস্টে ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও বেজিস্ট রুশো খান কর্মজীবনে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়লে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে মেকানিক্স। যে কারণে একজন নতুন বেজিস্টের সন্ধান করতে গিয়ে নাদী ওয়ালিদকে খুঁজে পান তাঁরা। তবে ব্যান্ডের সাথে রুশো না থাকলেও একজন বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে যেকোনো সময় যেকোনো দরকারে সবার আগে মেকানিক্সের পাশে ছিলেন তিনি।

রুশোর মতো একই কারণে ২০১১ সালে ব্যান্ড ত্যাগ করেন নাদী ওয়ালিদও। পরের বছর তাঁর জায়গায় ব্যান্ডে সুযোগ পান বেজিস্ট ফয়সাল আহমেদ তানিম (বেজকিং পাভেল)। ২০১৫ সালে নাদী ওয়ালিদ আবারও ব্যান্ডে ফিরে আসেন। কিন্তু সেটা ছিল কেবল দুই বছরের জন্য। কেননা ২০১৭ সালে উচ্চ শিক্ষা নিতে ব্যান্ড ছেড়ে অস্ট্রেলিয়া চলে যান তিনি।

তার পর আসে ২০১৭ সালের ২২ জুলাই। মেকানিক্সের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটি ঘটে সেই দিন। আত্মহত্যা করে অন্ততলোকে পাড়ি জমান তাঁদের লিড গিটারিস্ট জেহিন আহমেদ। ওই সময়টায় অত্যন্ত কঠিন একটা পরিস্থিতি মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল পুরো ব্যান্ডকে। তবে জেহিনকে হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে দ্রুতই নিজেদের গুছিয়ে ফেলে মেকানিক্স। রায়হান ইসলাম শুভ্র ও সাফাত আহমেদ চৌধুরীকে গিটারিস্ট এবং সালেক আহমেদ সিদ্দিককে বেজিস্ট হিসেবে নিয়োগ দেন তাঁরা। কিন্তু মাত্র এক বছরের মধ্যে শুভ্র ও সিদ্দিক ব্যান্ড ত্যাগ করলে আগমন ঘটে গিটারিস্ট সাইফ ইরফান ও বেজিস্ট সৌমিক ইসলামের।

এই যে ঘন ঘন এত পরিবর্তনের পরেও অদ্যাবধি মেকানিক্স যেভাবে তাঁদের নিজস্বতা অটুট রেখেছে তা আসলেই বিস্ময়কর৷ বর্তমানে ব্যান্ডটার ভোকালে আছেন আফতাবুজ্জামান ত্রিদিব, গিটারে সাফাত আহমেদ চৌধুরী ও সাইফ ইরফান, বেজ গিটারে সৌমিক ইসলাম আর ড্রামসে আছেন শেখ রিয়াজ।

২৩ নভেম্বর৷ প্রতি বছরের এ দিনটা অত্যন্ত গুরুত্ববহ মেকানিক্সের জন্য। কারণ ২০০৫ সালের এই দিনেই যে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় এ হেভি মেটাল ব্যান্ডটি। বিগত পনেরো বছর ধরে নিয়তির ভাঙা-গড়ার মিছিলেও একটা বিষয় তাঁরা প্রমাণ করে দিয়েছেন৷ প্রমাণ করেছেন তাঁরা ‘অপরাজেয়’৷ সত্যিই, মেকানিক্স ‘অপরাজেয়’।

https://www.mega888cuci.com