তরী ভিড়েছিল তীরে, তাঁরা ফেরেননি

১.

চাকরি জীবনের প্রথম অবস্থায় একটা ইংরেজি সিনেমা দেখেছিলাম, সিনেমার নাম সম্ভবত ‘দ্য মিস্ট’। সিনেমাটা দেখার আগ্রহ হয়েছিল স্টিফেন কিং-এর নাম দেখে। উনার একটা উপন্যাসের কাহিনী অবলম্বনে সিনেমাটা বানানো হয়েছিল। স্মৃতির উপর নির্ভর করে ঘটনাটা বলি, একটু ওলট পালট হতে পারে।

কোন এক রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে শহরের সব প্রাণী হঠাৎ করে আকারে অনেক বড় হয়ে যায়। মশা মাছি কিংবা মাকড়সা গুলোও মানুষ ধরে ধরে খেতে থাকে। প্রায় সব মানুষ তাদের আক্রমণে মারা যায়। পুরো শহরটাও কুয়াশায় ঢেকে যায়। কিছু মানুষ একটা সুপার স্টোরে আটকা পড়ে যায়। এদের মাঝে একটা গ্রুপ খুব কষ্ট করে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যায়।

সেই গ্রুপে সিনেমার নায়ক তার সন্তান, একজন নারী, বৃদ্ধ লোক আর আরেকজন বৃদ্ধ মহিলা ছিলেন। কিন্তু সিনেমার শেষ পর্যায়ে তারা বুঝতে পারে সামনে আর যাওয়ার জায়গা নেই। একদল দানবের আওয়াজ পেয়ে বুঝে যায় যে এদের হাতে পড়ার চেয়ে মৃত্যূ অনেক ভালো। একে অপরের দিকে তাকিয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। কিছু করার নেই, আত্মহত্যা করবে।

সবাইকে হত্যা করে নায়ক যখন নিজের মাথায় গুলি করতে যাবে তখন খেয়াল করে গুলি শেষ হয়ে গিয়েছে। বাধ্য হয়ে গাড়ি থেকে বের হয়ে দানবের সামনে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু এসময় দেখতে পায় যাদেরকে দানব ভেবেছিল আসলে সেগুলো দানব নয়, এক দল উদ্ধারকারী আর্মি। আর্মিরা শহরটাকে বাচিয়ে ফেলেছে, রাসায়নিক বিক্রিয়া দূর করে শহরের প্রাণি গুলোকে আবার আগের অবস্থায় নিয়ে এসেছে। অনেক মানুষকে বাচিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদের গাড়িতে করে।

হতাশ নায়ক এখন কি করবে? একবার তার মৃত বাচ্চাটার দিকে তাকায় যাকে একটু আগে সে নিজের হাতে তাকে মেরেছে, আরেকবার নিজের দিকে তাকায়।

এই বেচে থাকার চেয়ে মৃত্যূও অনেক শ্রেয়।

ঘটনাটা কেন বললাম?

একটা সহজ সত্য উপলব্ধি করার জন্য। অনেক কষ্টের রাস্তা সংগ্রাম করে কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌছানোর পর আনন্দটা তখনই হয় যখন আপনার সঙ্গী সাথে থাকে। যুদ্ধ জয়ে আনন্দ অবশ্যই হয়, তবে যুদ্ধে সঙ্গী হারাতে হলে কষ্টটাও হয়। সেই কষ্ট বেড়ে যায় যখন অল্পের জন্য সঙ্গী হারাতে হয়।

এখন মূল প্রসঙ্গে যাই।

২.

১৯৭১ সাল, সময়টা ভয়ংকর, অস্থির একটা সময় চলছে। যুদ্ধের সময় অস্থিরতা স্বাভাবিক, তবে এর পরেও মানুষ প্রকৃতিগত ভাবেই অনিশ্চয়তাকে ভয় পায়।

সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোকও পাচ্ছিল। শুধু নিজের জন্য না, তার সংসারে স্ত্রী কন্যা রয়েছে। তাদের নিয়েও ভয়ে আছে। একটাই সাহস যে পাকিস্তানিরা মুসলমান প্রফেসরদের সহজে মারে না। আর হিন্দু হলে তাদের ছাড়ে না। যুদ্ধের শুরুতেই তার পাশের কোয়ার্টারের হিন্দু লেকচারার পরিবারের সাথে যা করলো সেটা ভাবলে এখনো গা শিউরে উঠে। ছেলেটার বিয়ে হয়েছিল খুব বেশি বছর হয় নি। সন্তানের বয়স সাত মাস। একদিন আর্মির দল এসে বাচ্চাটাকে কোয়ার্টারের সামনে পুকুরে ছুড়ে মারলো। কেন যেন ওরা হিংস্রতা করে খুব আনন্দ পায়। ছেলেটাকে মেরে ফেলে বউটাকে ধরে নিয়ে চলে গেল।

তবে এই ঘটনাগুলো যুদ্ধে খুব স্বাভাবিক। প্রায় ১১ মাস ধরে এগুলো চলছে। আর সম্ভবত বেশি দিন চলবে না। আভাস আসছে পাকিস্তানিরা নতি স্বীকার করবে। এই মূহুর্তে ঘরের দরজায় কে যেন ঠক ঠক করলো। খুলে দেখলো তার এক ছাত্র।

– আপনাকে একটু যেতে হবে স্যার আমাদের সাথে।

– কেন? কি হয়েছে?

– একজন ধরা পড়েছে আর্মিদের কাছে। বলছে সে নাকি আপনার ছাত্র। আপনাকে একটু সনাক্ত করতে হবে।

যেতে ইচ্ছে করছে না, কিন্তু না গিয়েও উপায় নেই। অনিচ্ছা সত্বেও যেতে হলো। কিছুদিন পর তার লাশ পাওয়া গেল রায়ের বাজারের বধ্যভুমিতে।

যুদ্ধের শেষ সময়টাতে এসে এটা আমাদের জন্য খুব দুঃখের একটা ঘটনা। পাকিরা যখনই বুঝতে পেরেছে যে পরাজয় নিশ্চিত তখন খুজে খুজে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করে গিয়েছে। যাতে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও পঙ্গু হয়ে থাকে। এই তালিকায় শুধু সেই প্রফেসর ছিলেন না, শিক্ষাবিদ, আইনজীবি, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, চিকিৎসক – সব শ্রেণীর মানুষই ছিলেন।

তবে পাকি আর রাজাকাররা তাদেরকে শুধু মেরেই ফেলেনি, মারার আগে তাদের প্রতি অমানুষিক নির্যাত্ন করেছিল। বুদ্ধিজীবীদের লাশজুড়ে ছিল আঘাতের চিহ্ন, চোখ, হাত-পা বাঁধা, কারো কারো শরীরে একাধিক গুলি, অনেককে হত্যা করা হয়েছিল ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে। লাশের ক্ষত চিহ্নের কারণে অনেকেই তাঁদের প্রিয়জনের মৃতদেহ শনাক্ত করতে পারেননি। ১৯৭২ সালে জাতীয়ভাবে প্রকাশিত বুদ্ধিজীবী দিবসের সঙ্কলন, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও আন্তর্জাতিক নিউজ ম্যাগাজিন ‘নিউজ উইক’-এর সাংবাদিক নিকোলাস টমালিনের লেখা থেকে জানা যায়, শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা মোট ১ হাজার ৭০ জন।

জাতির সেই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সম্মান দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৪ ডিসেম্বর দিনটাকে শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস নামে ঘোষনা করেছে।

৩.

প্রথমে একটা বিদেশী সিনেমার গল্প বললাম, এরপর বললাম দেশের বুদ্ধিজীবিদের কথা। সম্পর্কটা কি?

কেন যেন যুদ্ধে যারা মারা গিয়েছে তাদের মধ্যে সেই বুদ্ধিজীবিদের জন্যই আমার সবচেয়ে বেশী খারাপ লাগে।

আর মাত্র দুইটা দিন – এই দুইটা দিন বেচে থাকতে পারলেই তারা স্বাধীন বাংলাদেশ দেখতে পারতেন। হয়তো কারো কারো মনে নতুন বাংলাদেশকে নিয়ে পরিকল্পনাও ছিল। ১৪ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বরেও অনেক মানুষ মারা যান। এর মাঝে বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর মারা যান ১৪ ডিসেম্বর।

দুঃখ তাঁদের জন্য, দুঃখ আমাদের ভাগ্যের জন্যেও। তাদের অনুপস্থিতি নিঃসন্দেহে আমাদের দেশকে অন্তত দুই দশক পিছিয়ে দিয়েছে।

দুঃখ সেই সব বুদ্ধিজ়ীবিদের আত্মীয় স্বজনদের জন্যেও। মাত্র দুটো দিনের আক্ষেপ নিশ্চিতভাবেই তাদের কস্টকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। জাতির সেই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলী।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।