স্মৃতিকাতর শৈশব, মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি ও সাহিত্যনির্ভর বাংলা ছবি

১.

আমি বরাবরই মনে করি যে সাহিত্য আর সিনেমা দুটো আলাদা মাধ্যম। গল্প বলার ভাষা কালি ও কলমে যা, সেলুলয়েডে কিন্তু তা না। ক্যামেরার নিজের একটা ভাষা আছে। সামান্য মোবাইলে একটা ছবি তুলুন। আর তারপর দেখুন যেটা দেখলেন, আর তার যে ছবি ক্যামেরা বন্দী করলেন, দুটোই কি এক? অনেক ক্ষেত্রেই তফাৎ পাবেন, আর সেটাই বুঝিয়ে দেয় যে আমরা যে ভাবে দেখি, ক্যামেরা সেভাবে দেখে না।

ফলত, গল্প বলার ক্ষেত্রেও, একই লজিক খাটে। একটা গল্প পড়তে আপনার ভালো লাগছে, অথচ সিনেমার পর্দায় ভালো লাগছেনা বা উলটোটা। একই কারণে। অনেকেই জানেন সত্যজিৎ রায় নিজে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে সিনেমা আর সাহিত্য দুটো সম্পূর্ণ আলাদা মাধ্যম। সুতরাং সেই আলোচনায় বিশদে গিয়ে লাভ নেই।

সপ্তপদী সিনেমাটার নাম হয়তো সবাই জানে। তারাশঙ্করের একই নামের একটা ছোটো গল্প অবলম্বনে সেই বিখ্যাত সিনেমাটা বানিয়েছিলেন অজয় কর। ছবিটা যারা দেখেছেন, তারা জানেন ছবিটি মিলনাত্মক। অর্থাৎ শেষ হয় উত্তম সুচিত্রার মিলমিশ দিয়ে। অথচ আসল গল্পে ছিলো কৃষ্ণেন্দু মানে উত্তম এর সাথে রিনা ব্রাউন মানে সুচিত্রার মিল হয়না। সে তাঁর পুর্ব প্রেমিক বিদেশি ক্লেটন কেই বিয়ে করে।

কিন্তু তৎকালীন বাংলা জনমানসে উত্তম সুচিত্রার সেই রোম্যান্টিক জুটির এইরকম বিয়োগাত্মক পরিণতি হয়তো অন্য রকম ছাপ ফেলতো। তাই পরিচালক অজয় কর সযত্নে ক্লাইম্যাক্স চেঞ্জ করে দিয়েছিলেন যাতে ছবিটি মনগ্রাহী হয়। এখানে বুঝতে হবে, আপনি যখন গল্প পড়ছেন, তখন আপনার মাথায় কিন্তু আপনার প্রিয় নায়ক বা নায়িকারা নেই। আপনি গল্পে ডুবে গেছেন হয়তো লেখনীর মুন্সিয়ানায়। আপনার অবচেতনে হয়তো বিরাজ করছে সাদা কালো হরফে একটা চরিত্র। কিন্তু সিনেমায় তা নয়। সে অনেক বেশি জ্বলন্ত। তার আগুনের আঁচ আপনি হলের সিটে বসে পাবেন যদি দক্ষ পরিচালক সেই চরিত্র চিত্রায়ন করেন।

আপনার মনন সেই পর্দার হিরোর সাথে সাথে নায়িকার সঙ্গে প্রেম করবে বা হয়ত ভিলেনের সাথে মারপিট করবে। সে হারলে আপনি হারের কষ্ট অনুভবও হয়তো করবেন। জিতলে তালিও দেবেন। মোদ্দা কথা, আপনি চাইবেন পর্দায় আপনার হিরো জিতুক। ফিরে পাক তার হৃত গৌরব আর প্রেম। মরাল অফ দা স্টোরি হচ্ছে চলচ্চিত্র অনেক বেশি ইম্প্যাক্টফুল মাধ্যম আপনার উপর। আপনার চিন্তা শক্তি পরিচালিত করতে পারে অনেকাংশেই।

সপ্তপদী সিনেমার একটি দৃশ্য

সেই জন্য আপনি চাননা উত্তম কুমার ট্র্যাজিক হিরো হোক। আর সেজন্যেই অজয় করের সার্থকতা। আর সেজন্যেই হয়তো সপ্তপদী একটি অসামান্য এবং কালজয়ী প্রেমের ছবি হিসেবেই পরিগণিত হয়েছে। তাহলে হয়তো বলবেন ট্র্যাজিক হিরো কে নিয়ে কি ভালো গল্প হয়নি? নিশ্চয়ই হয়েছে। কিন্তু জানতে হবে তো কোন গল্প কোন দর্শকদের জন্য দেখাচ্ছি এবং দেখছি, দুটোই।

শুধু সপ্তপদী নয়, অনেক সিনেমাই সাহিত্যের পাতা থেকে উঠে এসেছে যুগে যুগে কালে কালে। অতীতেও হয়েছে। এখনও হচ্ছে। আগামী দিনেও হবে। কোনও ভুল নেই তাতে। ভুল যেটা সেটা হলো আমাদের চিন্তা ভাবনায়। সপ্তপদী নিয়ে আমাদের মা মাসীদের বা বাবা কাকাদের কোনদিনও বলতে শুনিনি যে ওরিজিনাল গল্পটার থেকে সিনেমাটা ভালো বা খারাপ। কোনও তুল্যমূল্য বিচার তারা কোনদিনও করেনি। হ্যাঁ, কাটা ছেঁড়া হয়েছে। সিনেমাটা নিয়ে। অভিনয় নিয়ে। গান নিয়ে।

মুশকিল হচ্ছে আমরা এখন অনেক বেশি লিটারেট হয়ে উঠেছি সিনেমা নিয়ে! যেই শুনি একটা সিনেমা হবে কোনও সাহিত্য নির্ভর, সাথে সাথে এই আশা নিয়ে বসে যাই যে গল্পটা তো পড়েছি। সিনেমাটা এবার দেখতে হবে, কেমন করে। আর এইটাই হচ্ছে মারাত্মক ভুল, অন্তত আমার চোখে। সিনেমাটাকে সিনেমার মতন করেই দেখুন। কোনও তুলনা আনবেন না প্লিজ। এবার দেখুন ভালো লাগছে না খারাপ লাগছে। তাতে কি হবে, ইনডিপেন্ডেন্টলি একটা সিনেমাকে জাজ করতে পারবেন। কোনও রেফারেন্স না টেনেই। তাতে আমাদের মতো দর্শকদের মঙ্গল। চিত্র পরিচালকদের মঙ্গল। সার্বিক ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির মঙ্গল।

২.

এক যে ছিলো রাজাতেও লিখেছিলাম, গল্প নির্বাচন একটা বড় বিষয় চিত্র পরিচালকদের জন্য। সব গল্প সিনেমা হওয়ার উপযুক্ত নয়। ব্যাক্তিগত ভাবে আমি মনে করি শীর্ষেন্দু বাবুর বেশির ভাগ গল্প নিয়েই সিনেমা বানানো সহজ, কিন্তু ভালো সিনেমা বানানো কঠিন। খেয়াল করে দেখুন, তপন সিনহার ‘আজব গাঁয়ের আজব কথা’ (নবিগঞ্জের দৈত্য) থেকে শুরু করে ঋতূপর্ন ঘোষের ‘হীরের আংটি’, অপর্ণা সেনের ‘গয়নার বাক্স’ এমনকি অনিক দত্তের ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ প্রচুর সিনেমা হয়েছে ওনার লেখা গল্প নিয়ে।

সব নামী পরিচালকেরা কাজ করেছেন। গোয়েন্দা শবর তো আমরা সবাই জানি। ‘পাতালঘর’ বা ‘গোঁসাইবাগানের ভুত’ ও আছে। কিন্তু আমার মতে এগুলোর মধ্যে মাস্টারপিস সিনেমা খুব কমই আছে। এর কারন হলো গল্পের নির্বাচন। বা আরো ভাঙলে গল্পকারের নির্বাচন। শীর্ষেন্দু বাবু নিঃসন্দেহে প্রনম্য, আমি ওনার সব লেখা পরে ওঠার সৌভাগ্য লাভ করতে পারিনি। ইচ্ছা আছে। কিন্তু যত গুলো পড়েছি, সেগুলো বেশিরভাগই ভালো সিনেমা বানানোর উপযুক্ত নয়।

তার সাথে সাথে এটাও ঠিক যে ওনার লেখা কিছু গল্প কে নিয়ে ভালো ছবি বানানোর মুন্সিয়ানা সবার মধ্যে নেই। তাই সেই প্রয়াস মুষ্টিমেয় পরিচালক সফলভাবে করেছেন আর বাকিরা ব্যর্থ হয়েছেন। বরং লীলা মজুমদারের ‘পদি পিসির বর্মি বাক্স’ একটা অনন্য সাধারন রচনা যা সঠিক ভাবে বানাতে পারলে একটা অসম্ভব ভালো সিনেমা হতে পারে, বলেই আমি মনে করি।

মনোজদের অদ্ভুত বাড়ির আবেদন চিরকালীন। গল্পে আমাদের শৈশব রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে আছে। দূরদর্শনে হতো মনে আছে। অনেক গুলো চরিত্রই যদিও এখন মনে নেই, তবুও গল্পটা শুনলেই একটা ইনোসেন্ট ফিলিংস আসে। ছোটবেলা মনে করায়। সেই নিরিখে বলতে গেলে এ ছবির পরিচালক অনিন্দ্য দ্বিতীয় পয়েন্টের সাপেক্ষ্যে কিছুটা উতরে গেছেন, অর্থাৎ একটা মোটামুটি একটা ঠিকঠাক গল্পই বেছেছেন সিনেমা বানানোর জন্য।

কিন্তু, বাধ সাধলো প্রথম পয়েন্টে। সাহিত্য আর সিনেমা অনিন্দ্য এক করে দিতে চাইলেন। চরিত্র গুলো গল্পে যেভাবে এসেছে, সিনেমায় সেভাবেই দেখানোটা খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ইনফ্যাক্ট দেখানো যায়ওনা, সেটা বোধ হয় অনিন্দ্য বোঝেননি। আমরা শৈশব বলতে মজার চরিত্র বুঝি। বরদাচরন বুঝি। ব্রাত্য বসুর ভাঁড়ামো বুঝিনা। আমাদের পরের জেনারেশান শৈশব বলতে ডিজনি চ্যানেল বা কার্টুন নেটওআর্ক বোঝে।

কথা সাহিত্যিক কথাটাই হয়তো জানেনা। তাই আমাদের মতো মিসিং লিঙ্করা যারা রেপুঞ্জেল আর পদি পিসির মাঝখানে পরে আছি আর বাচ্ছা কাচ্ছা নিয়ে সিনেমা দেখতে যাচ্ছি, তখন চিত্র পরিচালকদের বুঝতে হবে যে রুপকথা মানে বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে কিছু স্বপ্নের মুর্তি আঁকা। পরের জেনারেশান বরদাচরন কে দেখেনি। তারা গোয়েন্দা বলতে শার্লক বা নিদেন পক্ষ্যে শাশ্বত-শীর্ষেন্দু-অরিন্দমের দৌলতে শবর কে চেনে। ওই শবরেই আটকে আছে তাদের বাঙালিয়ানা।

সেই জায়গা থেকে একটা আপাদমস্তক বাংলা রুপকথার গল্প বলতে গেলে চরিত্রগুলোকেও আঁকতে হবে সেই ভাবেই যাতে তারা বিশ্বাস্য হয়। মনে রাখতে হবে রুপকথা কিন্তু ভীষণ ভাবে বিশ্বাসের গল্প। যেখানে পাঠক বা দর্শক বিশ্বাস করে দত্তি দানো আছে, আবার গুপ্তধনও আছে। সেখানে সাদা মানে সাদাই, আর কালো মানে কালোই। কোনও ধূসর বর্ন নেই। আমাদের এই জটিলতার যুগে যেখানে শৈশবও ধূসরতায় ঢেকে গেছে, সেখানে সাদামাটা গুপ্তধনের গল্পকে সিনেমার রুপ দেওয়ার জন্য চরিত্র গুলোকেও সেভাবেই সাজানোর দরকার ছিলো।

সেই হিসাবে বলতে গেলে অনিন্দ্য প্রয়াস করেছেন কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন। ব্যাক্তিগত ভাবে অনিন্দ্য আমার পছন্দের পরিচালক। ওপেন টির পরে প্রজাপতি বিস্কুটও আমার বেশ ভালো লেগেছিলো। কিন্তু রুপকথার বাস্তব রুপ দেওয়া নিঃসন্দেহে মুন্সিয়ানার পরিচয় যা এ ছবিতে অবর্তমান। সেটা শেষ দেখেছিলাম ‘রেনবো জেলি’ সিনেমায়।

৩.

গল্প নতুন করে বলার কিছু নেই। সবারই জানা। কিন্তু অনিন্দ্য গল্পটা দাড়ই করাতে পারেননি। স্ক্রিপ্ট অত্যন্ত সাধারণ। রহস্যের বাতাবরণই কখনও তৈরি হয়নি। বিক্ষিপ্ত কিছু টুকরো সিনের সমাহার যেন। কে কেন কোথায় কি করছে কোনও লজিকাল সিকোয়েন্স নেই গল্পে। চরিত্রের কথা বলতে গেলে আবীর কে কন্দর্পনারায়ন এর চরিত্রে জাস্ট বেমানান লেগেছে। রজতাভকেও ভজ বাবুর রোলে একটা ভাঁড় ছাড়া আর কিছু লাগেনি।

সোহাগ সেন পিসিমার চরিত্রে বেশ মন কাড়ে। ওনার যতটুকু করার ছিল স্ক্রিপ্টে, উনি ঠিক ততটাই করেছেন। শিলাজিত ডাকাত সর্দার হিসাবে মানিয়েছে। সৌমিত্র এবং সন্ধ্যা রায় স্বাভাবিক ভাবেই অভিজ্ঞ এবং ঠিকঠাক। মনোজ মিত্র কে সবচেয়ে ভালো লেগেছে ছোট্ট একটা ১০ মিনিটের রোলে। ছবির গান পাতে দেওয়ার মতো লাগেনি আমার। ছবির শেষে কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসলো “ডিমনিটাইজেশান” যেটা হাস্যস্পদ ও একই সাথে বিরক্তিকরও বটে। এটা অনিন্দ্যর একটা বড় খামতি মনে হল। কোথায় কি ঢোকাতে হয়, বুঝতে পারেননি হয়তো। ভেবেছিলেন লোকে হেভি খাবে। খেলাম বটে, তবে ভির্মি!

মোটের উপর, ছবিটি মন্দ নয়। ফ্যামিলি মুভি। বেড সিন বা আইটেম সং নেই। ‘ওগো লুছি’ আছে। অপরাজিতা আড্ডির বাইজি নাচ। কিন্তু সে বড় মিষ্টি। হাল্কা হাসি আছে। কোথাও বা মোটা দাগের, কোথাও বা পরিমিত। সব মিলিয়ে দেখা যায় একবারই। তবে যদি না দেখে থাকেন, জেনে রাখুন কিসসু মিস করেননি। দশে পাঁচ।

https://www.mega888cuci.com