ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড

যেকোন গল্পের আদার সাইড থাকে। কেরালায় যে গর্ভবতী হাতীর করুণ মৃত্যু আমাদের সবাইকে নাড়া দিয়েছে, এর বীজ অনেক গভীরে।

কেরালায় আমি কখনো যাইনি তবে ছবিতে দেখেছি, ভীষণ সুন্দর আর সবুজ। যারা গিয়েছে তাদের কাছে গল্প শুনেছি সেখানকার মানুষগুলোও দারুণ আন্তরিক ও মানবিক। কিন্তু সেখানেই বন্যপ্রাণিদের অভিজ্ঞতা কিন্তু অন্যরকম। ভেতরের গল্পটা সারভাইভিংয়ের। সেখানে বন্যপ্রাণী রক্ষা অ্যাক্ট যেমন আছে তেমনি কিভাবে নিজের ফসল রক্ষায় বন্যপ্রাণীদের আইনত হত্যা করা যাবে সেটাও আছে! জ্বি, অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্যি!

বন্যপ্রাণী বনাম মানুষের লড়াইটা এসব অঞ্চলে বহুদিন ধরে চলে আসছে। কখনো সেটা মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং আবার কখনো দুপক্ষই হিংস্র হয়েছে। তবে মানুষের দিক থেকে সেটা বেশিরভাগ সময় নিষ্ঠুর হয়ে আসছিল বন্যপ্রাণীদের প্রতি। অর্থাৎ মানুষ বেড়েছে, তাদের আবাদের জমিও বাড়াতে হয়েছে, তো যেসব জায়গা প্রাণীদের অভয়ারণ্য ছিল সেসব জায়গা কম দামে কিনে চাষাবাদ শুরু করে গরীব কৃষক, যারা তাদের ফসল রক্ষায় জীবন বাজি রাখতেও রাজি। কিন্তু ওখানে সারভাইভ করা প্রাণীগুলো তাহলে কোথায় যাবে? তাই ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড অনিবার্য হয়ে পড়ে।

সবচেয়ে বেশি ফসলের ক্ষতি করতে থাকে বুনো শূকর। সেগুলোর সংখ্যাও অনেক বেশি। কিন্তু বন্যপ্রাণী হত্যা তো আইনত দন্ডনীয়, তবে জঙ্গলের গভীরে আইনের থোড়াই কেয়ার। তারপরও রাজ্য সরকার এই বুনো শূকরের উৎপাত কমাতে একটা অদ্ভূত আইন করে। একজন বনরক্ষী এবং বন্যপ্রাণী রক্ষায় আন্দোলনের সাথে যুক্ত এমন একজন ব্যক্তির সামনে, একটা মাত্র গুলিতে শূকর হত্যা করা যাবে।

এরপর সেটার পোর্স্টমর্টেম হবে, তারপর আগুনে পুড়িয়ে সেটাকে দাহ করা হবে। আর এ সমস্ত নিয়ম মেনে পালন করলে ঐ কৃষকের জন্য থাকবে ৫০০ রুপির প্রণোদনা। এটা পড়তেই তো কেমন জটিল লাগছে, এখন এটার বাস্তবায়ন তো আরো জটিলই হবার কথা। হয়েছেও তাই, ২০১১ সালে প্রণীত এই আইন কাজে লাগানোর ঘটনা ঘটেছে মাত্র একবার তাও গত সপ্তাহে! এর চেয়ে যে ইলেকট্রিকের বেড়া দেয়া অথবা আনারসের মধ্যে বাজি রেখে ফাঁদ পাতা অনেক সহজ আর সস্তা।

কৃষকরাও তাই নিজেদের ফসল রক্ষায় আইনের চোখে এই অবৈধ পথগুলো বেছে নিতে থাকে। ফলও ভালো পায় তারা এতে। মাঝে মাঝে এসবের বিরুদ্ধে পরিবেশবাদীরা সরব হয়েছেন, দু-একদিন বন্ধ থেকেছে এরপর সবকিছু আবার আগের মতো হয়েছে।

আমরা যখন একটা হাতির এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পাচ্ছি সেই একই সময় জানা যাচ্ছে গত মাসে আরো একটা হাতির এমন করুণ পরিণতি ঘটেছে। তাহলে অজানা এমন আরো কতো ঘটনা কতো প্রাণীর সাথে ঘটছে ভাবা যায়! পরিস্থিতি যা দাড়াচ্ছে তাতে ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড লড়াইটা সামনে আরো বাড়বে।

কিন্তু, বন্যপ্রাণীদের হাতে তো তিতুমীরের বাশের কেল্লা অর্থাৎ সেই একই আদিম পন্থা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায়। কিন্তু মানুষের হাতে কত আধুনিক অস্ত্র একবার ভাবুন। এটার পরিণতি জানতে তাই রকেট সায়েন্টিস্ট হবার দরকার নাই। তবে এই পরিণতি ঠেকাতে পারে কেবল এবং কেবল মাত্র রাষ্ট্র। তবে খুব বেশি আশা জাগেনা যখন বছর তিনেক আগের একটা খবরে চোখ বুলাই। সেটা হল বিহারে ফসল রক্ষায় পরিবেশ মন্ত্রীর আদেশেই ৬ দিনে প্রায় দুশোর বেশি দুষ্প্রাপ্য নীলগাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়!

আদার সাইডের কথা বলছিলাম। এই কেরালাতেই অনেকগুলো রিজার্ভ ফরেস্ট আছে। যেগুলো শুধু বন্যপ্রাণীদের অভয়ারণ্য বলা যেতে পারে। এরকমই একটা অভয়ারণ্যে একটা আদিবাসী গোষ্ঠী বহুদিন ধরে ধান, কলা এমনকি আখচাষ করছে সেটাও বন্যপ্রাণীদের কোনরকম ডিস্টার্ব না করেই। শুধু পদ্ধতিটা জানা দরকার। জগতের সকল প্রাণী ভালো থাকুক।

https://www.mega888cuci.com