দ্য ফল অব স্টারডম

ব্যর্থতার মত আর কোনোকিছুই এতটা প্রভাবশালী নয়। যখন আমার জীবনের পেছনের দিকে তাকাই তখন চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা হয়, এই ব্যর্থতাগুলোই একটি জীবনকে গড়ে তোলে এবং কালক্রমে সেখান থেকেই একটি পরিপূর্ণ মানুষ সৃষ্টি হয়। ধর্মগ্রন্থে লেখা আছে, ‘আমাকে তোমার ব্যর্থতাগুলো এনে দাও। বনের আগুনে চন্দন কাঠ পুড়লে যেমন সুবাস ছড়ায়, তেমনি ব্যর্থতার সুবাসে একজন মানুষ স্বজাতির প্রতি মমতা ও ভালবাসা অনুভব করেন।

আমি যা বললাম, সেই কথা গুলো অভিনেতা হিসেবে ইমরান জাহিদের অভিষেক সিনেমা ‘মার্ক শিট’-এও বলেছিলাম। এরপরদিন আমি গিয়েছিলাম দিল্লীর তিহার জেলে, প্রতিভাবান কমিক অভিনেতা রাজপাল যাদবের সাথে দেখা করতে। রাজপাল তখন জেলেই বন্দী ছিল।

রাজপাল যাদবের কথা উঠলেই আমার প্রথম যে স্মৃতি মনে আসে সেটা হল হিন্দি থিয়েটারের জায়ান্ট সত্যদেব দুবের সাথে তাঁর করা অডিশনের কথা। অডিশনটা ও আমার জন্যই দিয়েছিল। একটা ছোটখাটো, লাজুক প্রকৃতির ছেলের অভিনয় প্রথমদিনই আমাকে চমকে দিয়েছিল।  তবে, এবার আমি গিয়ে যার সাথে দেখা করলাম তিনি হলেন বলিউডে নিজের বড় স্বপ্নকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে প্রতারকের তকমা পাওয়া একজন।

অনেক আগে ওকে আমি একবার বলেছিলাম, ‘তোমার মধ্যে একজন তুখোড় কমেডিয়ান হওয়ার সব যোগ্যতাই আছে। রাজপাল, অনেক চরিত্র করার পেছনে ছুটবে না, ছুটলে তুমি কোথাও পৌঁছাতে পারবে না। শুধু তোমার কমেডিয়ান পরিচয়ে শক্ত থাকো, অবস্থানটা ঠিকই গড়ে উঠবে।’

মিসৌরিতে বসে এক জ্ঞানী ব্যক্তি একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘শুধু একটা খরগোশকেই ধাওয়া করো। যদি, সেটাকে ধরতে না পারো তাহলে কৌশল পাল্টাও। কিন্তু খরগোশটাকেই পাল্টে ফেলো না।’

রাজপাল অনেকগুলো খরগোশের পেছনে ধাওয়া করেছেন। ও দর্শকদের সত্যিকারের দেশি কমেডির স্বাদ দিতে পেরেছিল। ভুলটা করলো তখনই যখন প্রযোজনায় নামলো, আর নিজেকেই সেই ছবিতে হিরো হিসেবে কাস্ট করলো।

‘সাফল্য ওর মাথাটা খেয়ে ফেলেছিল। বাজে গল্পে অনেক অর্থ ঢেলেছিল। ওর সেটে ১৭ টা ভ্যানিটি ভ্যান থাকতো। ছোটখাটো অভিনয় শিল্পীরাও আলাদা ভ্যান পেতে। ধর্ম প্রোডাকশনের মত বড় হাউজগুলোও এত বিলাসিতা করে না। এই সব কিছুই ওকে বিপদে ফেলেছিল।।’ কথাগুলো বলেছিলেন কমল চন্দ্র। তিনি হলেন কম বাজেটে নির্মিত ‘মার্ক শিট’ ছবির পরিচালক।

রাজপালের সাথে যখন দেখা করার জন্য অপেক্ষা করছিলাম, তখন বলিউডের অনেক স্মৃতিই মনে আসতে লাগলো। গরীব থেকে বিত্তশালী হয়ে উঠে আবারো দারিদ্রতার শিকার হওয়ার অনেক গল্পই তো এখানে আছে।

প্রথমেই মনে হল মিঠুন চক্রবর্তীর কথা। খুবই সাদামাটা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে ও উঠে এসেছিল। মুম্বাইয়ের রাস্তায় ঘুমিয়েছে, কালক্রমে সুপার স্টার হয়েছে। লম্বা সময় লিড রোলে ওর বিস্তর চাহিদা ছিল। পরে ওর সামর্থ্যটা ও ব্যয় করেছিল হোটেল ব্যবসায়। তাই যখন ওর স্টারডম হারিয়ে যাচ্ছিল, তখনও মিঠুন হারিয়ে যায়নি। এককালের সুপার স্টার রাজেশ খান্নাই যেখানে একটা সময় ট্র্যাজিক কেরিক্যাচারে পরিণত হয়েছিল, মিঠুনের পরিণতি তেমন হয়নি। হয়নি কারণ, মিঠুন ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে ভাল একটা ব্যবসা গড়ে তুলতে পেরেছিল।

জ্ঞানীরা বলেন, ‘যখন সব শেষ হয়ে যায়, চলে যাও। মৃত ফুলে পানি দিয়ে কোনো লাভ নেই। কিন্তু হায়! বলিউড তো এমন অসংখ্য মৃত ফুলে পানি ঢালার গল্পে ঠাঁসা। আমি ভুলতে পারি না গুরু দত্তের ছবির ‘চৌভিন কি চাঁদ’  ছবির পরিচালক এম সাদিকের কথা। তাঁকে আমি বান্দ্রার পালি হিলে নিজের বাঙলোতে ফুঁপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে দেখেছি, যখন ঋণের দায়ে তিনি এতটাই জর্জরিত হয়ে পড়েছিলেন যে নিজের বাঙলোটাই নিলামে তুলতে হয়েছিল। এটা হয়েছিল কারণ তিনি একের পর এক উচ্চাকাঙ্খী সিনেমা বানাতে শুরু করেছিলেন।

‘আরে স্যার, আপনি?’ বিধ্বস্ত চেহারার রাজপাল আমার মুখোমুখি হওয়া মাত্রই চমকে উঠলো। আমি ওকে জড়িয়ে ধরলাম। বললাম নিজেকে শুধরে নিতে, ‘এই তিনটা মাস নিজেকে সময় দাও। ভাবো, তুমি আসলে কি ভুল করেছিল। নিজেকে একটা পুনর্জন্ম দাও। সঞ্জয় দতবতকে দেখো। ও তো নিজের অপরাধ জগৎ থেকে পালিয়ে বেড়াতে বেড়াতেই ২০ টা বছর কাটিয়ে ফেললো। কিন্তু, দু’টো বছর জেলে থাকার পরই কি দারুণ ভাবে নিজেকে পাল্টে ফেললো। নতুন করে সব শুরু করলো। অন্ধকারই সঞ্জয়ের ভেতরের সোনালী আলোটাকে বের করে এনেছে। একই ব্যাপার তোমার ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে।’

রাজপালকে রেখে আমি যখন তিহার জেলের গেটে ফিরলাম, তখন বিনোদন জগতের একের পর এক ট্র্যাজেডির গল্প আমাকে আরো ভাবিয়ে তুলেছিল। তারকাদের পতন হল এই আলোর দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন সত্য। সব কিছুরই একটা দাম আছে। এই নিয়ে কেউ অভিযোগ করতে পারে না। আমরা এখানে যত ‍ওপরে উঠি, তত জোরে নিচে পতনের সম্ভাবনাও বাড়ে।

কোনো বিস্ময় নেই যে, এখানে বড় অংশটাই দর্শক, আর ছোট অংশটা পারফরমার। এই দুনিয়ায় হাম্পটি ডাম্পটির মত রাজপালেরও পতন হল। তাঁকেই এখন সব কিছু শুরু থেকে শুরু করতে হবে। আমি জানি, ও পারবে। পিকচার আভি বাকি হ্যায়!

_______________

সিনেব্লিটজ নামের একটি ভারতীয় গণমাধ্যমে কলামটি লিখেছেন বলিউডের খ্যাতিমান চিত্রনির্মাতা মহেশ ভাট।

https://www.mega888cuci.com